Published : 01 Sep 2025, 11:17 PM
‘ট্র্যায়াম্ফালিজম’। শক্ত ভাবের চর্বি সরিয়ে বাংলায় অনুবাদ করলে অর্থ হতে পারে ‘আস্ফালনবাদ’। ট্র্যায়াম্ফালিজম বা ‘আস্ফালনবাদ’ অভিধানের অন্যান্য সাধারণ পরিভাষার মতো একটি পরিভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে বসনিয়ায় জন্ম নেওয়া অস্ট্রেলিয়ান গবেষক হারিঝ হালিলোভিচ এই পরিভাষাটি প্রথম বসনিয়ায় ‘গণহত্যা অস্বীকার’ (জেনোসাইড ডিনায়েল)-এর সংস্কৃতি বর্ণনা করতে ব্যবহার করেন।
পরে ২০২১ সালে হালিলোভিচের সহকর্মী হিকমেত কারসিচ আরেকজন গবেষকের সঙ্গে মিলে ট্র্যায়াম্ফালিজম ধারণার ওপর ‘বসনিয়ান জেনোসাইড অ্যান্ড ট্র্যাম্ফালিজম: অরিজিন্স, ইমপ্যাক্ট অ্যান্ড প্রিভেনশন’ নামে একটি বই সম্পাদনা করেন। সোভিয়েত যুগের যুগোস্লাভিয়ায় সংঘটিত মানব ইতিহাসের অন্যতম ঘৃণ্য ওই গণহত্যাকে কেন্দ্র করে কীভাবে ওই দেশে ‘আস্ফালনবাদ’ জন্ম নেয় সেটি বর্ণনা করেন।
আস্ফালনবাদের বর্ণনা করতে গিয়ে হিকমেত কারসিচ বলেন, “২০ মার্চ ২০১৯। এই দিনে ১৯৯২-৯৫ সালে সংঘটিত গণহত্যার অন্যতম নেতা রাদোভান কারাদিচকে হেগভিত্তিক আই সি টি ওয়াই ৪০ বছরের সাজা বাড়িয়ে যাবজ্জীবন করে। ওই যুদ্ধকালীন সময়ে তিনি সার্ব ফোর্সের সুপ্রিম কমান্ডার ছিলেন। কারাদিচের দণ্ডিত অপরাধের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অপরাধ ছিল—[জাতিগত] গণহত্যা, নিপীড়ন, নির্মূল, নির্বাসন ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা। কিন্তু আদালতের রায় এবং আদালতে উপস্থাপিত অগণন অকাঠ্য তথ্য-উপাত্ত থাকা সত্ত্বেও বসনিয়া ও সার্বিয়ায় বসবাসরত সার্ব জাতীয়তাবাদীরা এই রায়কে প্রত্যখ্যান করেন (পৃ. ১২০)।” এই ‘জেনোসাইড ডিনায়েল সংস্কৃতিকে হালিলোভিচ ‘আস্ফালনবাদ’ বলে আখ্যায়িত করেন। কারসিচ তার বইয়েও একই কথা বলেন। তিনি আদালতকর্তৃক সাব্যস্ত দোষীকে মহান করার এই প্রক্রিকেই ‘আস্ফালনবাদ’ বলে ব্যাখ্যা করেন।
কারসিচ তার বইয়ের অন্য এক অংশে উল্লেখ করেন, “তাদের [সার্বদের] কাছে কারাদিচ একজন ‘নায়ক’। এই রায়ের তিন বছর আগে ২০ মার্চ ২০১৬ সালে—যেদিন আদালত কারাদিচকে ৪০ বছরের সাজা দেয় তখন সেই সময়ে বসনিয়ার সার্ব অধ্যুষিত আর এস অঞ্চলের রাষ্ট্রপতি মিলোরাদ দোদিক সারাজেবোর কাছে পালে নামক স্থানে লোকদেখানো একটি ছাত্রাবাস উদ্বোধন করেন এবং সেটিকে দণ্ডিত ওই রাদোভান কারাদিচের নামে নামকরণ করেন (পৃ. ১২১)।”
উল্লেখ্য, সাড়ে তিন বছরের এই জাতিগত নিধনের লক্ষ্যে পরিচালিত ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ডে প্রায় ১০০,০০০ মানুষ নিহত হন। “১৯৯৫ সালের জুলাইয়ে বসনিয়ার কাছের শহর স্রেব্রেনিকাতেই সার্বিয়ান সেনাবাহিনী ৭,০০০ জনকে হত্যা করে। এদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ ফাতিমা মুহিচ নামে যাকে হত্যা করা হয় তার বয়স ছিল মাত্র দুই দিন (২০২১, পৃ. ৩৬)।”
এখন ১৯৭১ সালে বর্বর পাকিস্তান কর্তৃক বাঙালিদের ওপর সংঘটিত গণহত্যা ও পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত আলবদর, আল-শামসসহ অন্যান্য গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডকে এই তত্ত্বের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করা যাক। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় কারসিচ ও হালিলোভিচ আস্ফালনবাদের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে যেন বাংলাদেশের কথাই বলছেন। কারণ পাকিস্তানের নৃশংস সেনাবাহিনীর সহযোগী এদেশের ‘সার্ব ফোর্স’-এর মতো বর্বর গোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে বাংলাদেশে মানব ইতিহাসের অন্যতম হত্যাকাণ্ড চালায়। পাকিস্তানের এই চরম বর্বরতার বিরুদ্ধে জন-আন্দোলন গড়ে এই দেশের বীর মুক্তিযোদ্ধারা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন দেশের সূচনা করেন।
পরবর্তীকালে বাংলাদেশ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে শাস্তি দিতে না পারলেও, তাদের এদেশীয় সহযোগীদের আন্তর্জাতিক মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করে। কিন্তু দণ্ডিত এই সহযোগীদের মিত্র পাকিস্তানের যুদ্ধ-পরবর্তী কার্যকলাপ এবং বাংলাদেশের স্থানীয় মিত্রদের মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যা-সংক্রান্ত ৫৫ বছরের কার্যক্রম যেন হালিলোভিচের ‘আস্ফালনবাদ’ তত্ত্বের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। মুক্তিযুদ্ধের মতো অকাট্য সত্যকে অস্বীকার, অপমান এবং মুক্তিযোদ্ধাদের হেনস্তার মাধ্যমে এই ‘আস্ফালনবাদ’ উদ্ভূত হয়েছে। বিগত আধা-শতকে ‘আস্ফালনবাদ’ দুই পর্বে বিকাশ লাভ করে।
প্রথম পর্বের কেন্দ্র ছিল পাকিস্তান, যেখানে তারা যুদ্ধে বাঙালিদের হত্যাকারীদের ‘বীর’ হিসেবে চিত্রিত করে। এই নৃশংসতায় ভূমিকা রাখার জন্য তাদের শাস্তির পরিবর্তে পারিতোষিক ও পদোন্নতি দিয়ে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত করে সম্মানিত করা হয়। উল্লেখযোগ্য নামগুলোর মধ্যে রয়েছে জুলফিকার আলী ভুট্টো, লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান এবং রাও ফরমান আলী। ভুট্টোকে পরে পাকিস্তানের চিফ এক্সিকিউটিভ করা হয়; ২৫ মার্চের ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মূল হোতা টিক্কা খানকে চিফ অব আর্মি স্টাফ এবং রাও ফরমান আলীকে রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দিয়ে সম্মানিত করা হয়।
আস্ফালনবাদের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয় বাংলাদেশে। দ্বিতীয় পর্বেও যেন ওই একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। এই পর্ব শুরু হয় বসনিয়ার সার্ব ফোর্সের মতো আল-বদর, আল-শামস বা অন্যান্য নৃশংস সহযোগী ‘ফোর্স’-এর নেতৃত্বদানকারী রাদোভান কারাদিচের মতো নেতৃত্বকে রাজনৈতিক পুনর্বাসনের মাধ্যমে। স্বাধীনতা যুদ্ধকে অস্বীকার এবং জাতি হিসেবে বাংলাদেশের উত্থানকে বিদেশী ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করে আস্ফালনবাদের শক্ত ভিত তৈরি করা হয়। হালিলোভিচের তাত্ত্বিক ভিত্তিতে বর্তমান সময়কে বাংলাদেশের আস্ফালনবাদের চূড়া হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। প্রতিনিয়ত মুক্তিযোদ্ধাদের হেয় ও হেনস্তা করা, মুক্তিযুদ্ধকে একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে দাঁড় করানো প্রবল প্রচেষ্টা এবং যারা ১৯৭১ সালে হীন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত তাদের মহিমান্বিত করার মাধ্যমে হালিলোভিচের তাত্ত্বিক ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করা হয়।
গবেষক ফয়সাল শাহরিয়ার রাতুল ২০২৪ সালে ট্রায়াম্ফালিজম নিয়ে একটি অনবদ্য গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। ‘ট্রিভিয়ালিজিং অ্যাট্রোসিটিজ: এক্সামিনিং দ্য ফেনোমেনন অব জেনোসাইড ডিনায়াল ইন বাংলাদেশ অ্যান্ড ট্রায়াম্ফালিজম অব পারপেট্রেটরস’ প্রবন্ধে তিনি হিকমেত কারসিচের আস্ফালনবাদ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি তার প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, হিকমেত কারসিচ ২০২১ সালে প্রকাশিত তার ‘ট্রায়াম্ফালিজম: দ্য ফাইনাল স্টেজ অব দ্য বসনিয়ান জেনোসাইড’ নামক ওই গবেষণায় বসনিয়ায় আস্ফালনবাদের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য উম্মোচন করেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো বাংলাদেশে আস্ফালনবাদের বিবর্তনের ক্ষেত্রে যেন হুবহু একই বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য অনুসরণ করছে।
গবেষক রাতুল এই বৈশিষ্ট্যকে চার ভাগে ভাগ করেছেন।
প্রথমত, এই প্রক্রিয়ার শুরুতে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের ‘নায়ক’ হিসেবে দেখানো হয়। তারা যে ঘৃণ্য কাজ করেছে সেটি সঠিক ছিল বলে ‘ন্যায্যতা’ প্রদান করা হয়। এভাবেই মানবতাবিরোধী অপরাধীদের ধীরে ধীরে মূলধারায় পুনর্বাসিত করা হয়। আমরা যদি এই বৈশিষ্ট্যের আলোকে বাংলাদেশে এই ধরনের কার্যক্রমকে বিশ্লেষণ করি তাহলে সেগুলো আস্ফালনবাদের এই বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে হুবহু সামঞ্জস্য লক্ষ্য করা যায়।
দ্বিতীয়ত তিনি উল্লেখ করেন, এই ধরনের অপরাধে সাজাপ্রাপ্তদের দণ্ডকে অন্যায় বলে প্রচার করে তাদের মুক্তিকে উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপন করা হয়। যেমনটি করা হয়েছিল বসনিয়ায় গণহত্যার সঙ্গে জড়িত বিলজানা প্লাভিচের ক্ষেত্রে। যাকে তার মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আই সি টি ওয়াই ১১ বছরের সাজা প্রদান করে। ছয় বছরের সাজা শেষে তার পূর্বমুক্তির পর বেলগ্রেডে নামলে সার্ব নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের সরকারি গণমাধ্যমে তাকে নিরাপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তাকে রাতারাতি জাতীয় সেলিব্রেটিতে পরিণত করা হয়। নতুন বয়ানের মাধ্যমে তাকে সাধু বা পীরের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সম্প্রতি বাংলাদেশেও আমরা এমন একাধিক ঘটনার সাক্ষী হয়েছি।
তৃতীয়ত, মূলধারায় একসময় এই যুদ্ধাপরাধীদের অবস্থান ও চলাফেরা স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। বীরদর্পে তারা সমাজে প্রভাব বিস্তার করতে থাকেন। বাংলাদেশেও আমরা একই প্রক্রিয়া দেখেছি।
চতুর্থত, ইতিহাস মুছে ফেলা, স্মৃতি লুট এবং স্মৃতি স্তম্ভ তৈরি করে গণহত্যাকে উদযাপন করার প্রচেষ্টা দেখা যায়। বেছে বেছে যেখানে গণহত্যার স্মৃতি রয়েছে সেখানেই তারা গণহত্যাকে উদযাপনের স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করে। কারসিচ বসনিয়ায় ইতিহাস মুছে ফেলার একটি প্রচেষ্টার উল্লেখ করে বলেন, বর্তমান বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার একটি ছোট্ট শহর ‘প্রিজেদর’। এখানেই ছিল কুখ্যাত ‘ওমার্স্কা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প’। খনিজ সম্পদ খোঁড়ার অজুহাতে সেখানে খনন করে ওই কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের চিহ্ন মুছে দেওয়া হয়।
কারসিচ বসনিয়ার গণহত্যাকে কেন্দ্র করে ট্রায়াম্ফালিজমের যে বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন পড়লে মনে হয় যেন তিনি বাংলাদেশের কথাই বলেছেন। কারণ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যা অস্বীকারের রাজনীতিতে উপরোক্ত একই বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়। তাই বলা যায়, শুধু বসনিয়া বা বাংলাদেশ নয়, ইতিহাসে গণহত্যাকেন্দ্রিক ‘ট্র্যায়াম্ফালিজম’ মূলত একই বৈশিষ্ট্য অনুসরণ করে। এই কারণেই হালিলোভিচের তত্ত্ব বৈশ্বিক স্বীকৃতি লাভ করেছে। তিনি এই তত্ত্বের মাধ্যমে গণহত্যা অস্বীকার করার সংস্কৃতির বৈশ্বিক সংজ্ঞায়ন করতে সক্ষম হয়েছেন।