Published : 18 May 2026, 06:36 PM
কারিনা কায়সারের আকস্মিক মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, তা এক কথায় শিউরে ওঠার মতো। একজন মানুষের—তিনি যে মতাদর্শেরই হন না কেন—মৃত্যুতে উল্লাস করা এবং কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা সমাজের গভীর নৈতিক ও মানসিক অবক্ষয়ের কথাই জানান দেয়। কারিনা যখন সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে তখন থেকে যা শুরু হয়েছে, তাকে শুধু রাজনৈতিক কাদা-ছোড়াছুড়ির মতো একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে, যদি সমাজতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করি, তাহলে বুঝতে পারব যে কারো মৃত্যুতে উল্লাস করার এই ধরণটি বাংলাদেশে আজকের নয়। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই সংস্কৃতি দীর্ঘমেয়াদে সমাজের কাঠামোগত এবং মানসিক স্তরে মারাত্মক ক্ষতি সাধন করেছে। মনে রাখা প্রয়োজন, সমাজ বদলায় এটা যেমন সত্যি, তেমনি সব বদলই হঠাৎ করে হয় না—সেটাও ভীষণ সত্যি।
নির্মোহভাবে যদি একজন সমাজবিজ্ঞানী এবং মনস্তাত্ত্বিকে দৃষ্টিতে এই পরশ্রীকাতরতা, অন্যের বিপদে আনন্দিত হওয়ার সংস্কৃতিটার শিকড় কত গভীরে এবং এ ধরনের আচরণের বিষবৃক্ষগুলো কত ভয়াবহ শাখা-প্রশাখা মেলেছে, তা নিয়ে আলোচনা করি, তার একটা পূর্ণ ধারণা পাওয়া যাবে।
১৯৭১ সালে দেশকে স্বাধীন করার চেতনায় দেশের আবালবৃদ্ধবনিতা খালি হাতে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। একটা স্বাধীন দেশের আশায় তখন এদেশের সাধারণ মানুষ ছিল ঐক্যবদ্ধ। কিন্তু পরবর্তীকালে এদেশেরই যারা মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে ছিল এবং যারা সরাসরি পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সাহায্য করেছিল, এদেশের মানুষকে হত্যা করেছিল, নির্মম, নিষ্ঠুর অত্যাচার, খুন, ধর্ষণ, লুটপাট করেছিল—তাদেরকে কেন্দ্র করে বিভেদরেখাটা বড় হয়। আমার জানা মতে, জামায়াতে ইসলামীর নেতা গোলাম আযম আর চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়ের মতো খুব কম মানুষই—যারা স্বাধীনতার ঘোর বিরোধী—তারা যুদ্ধের পরে দেশ ছেড়ে গিয়েছিল। যদিও গোলাম আযম পরে দেশে ফিরে এসেছিলেন।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই এই স্বাধীনতার পক্ষ ও বিপক্ষ গোষ্ঠীর মধ্যে বিভক্তি দানা বাঁধতে শুরু করে। ’৭৫-এর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে সামাজিক কাঠামোয় এক ধরনের নিষ্ঠুরতা এবং মেরুকরণের (Social Polarization) সংস্কৃতি চালু হয়ে যায়।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এই ধরনের ভয়ংকর, নৃশংস ঘটনা, রাজনৈতিক বিভাজন এবং আদর্শের লড়াই সমাজে তীব্র মেরুকরণ সৃষ্টি করে। একটা সমাজ যখন ‘আমরা’ বনাম ‘ওরা’—এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়, তখন সাধারণ সামাজিক মূল্যবোধগুলো ভেঙে পড়ে। অন্যকে হেয় করার এই ধরন সমাজে একটি ‘টক্সিক কালচার’ বা বিষাক্ত সংস্কৃতির জন্ম দেয়, যেখানে ধীরে ধীরে পরমতসহিষ্ণুতা পুরোপুরি ধূলিসাৎ হয়ে যায়।
১৯৭৫ সালে তাই ঘটেছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করার পর অনেকেই জান্তব উল্লাস করেছিল। খুব আনন্দিত হয়েছিল, মিষ্টি বিতরণ করা হয়েছিল। সেই থেকে শুরু। এর পর এদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর পালাবদল ছিল ঘটনাবহুল। হত্যা ও প্রতিহিংসার রাজনীতি চলে আসছে গত ৫০ বছর ধরে। শুধু তাই নয়, ভয়ংকরভাবে চলেছে ক্ষমতার অপব্যবহার।
মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই ধরনকে বলা যেতে পারে অমানবিকীকরণ (Dehumanization)। মনস্তত্ত্বের ভাষায় এই অমানবিকীকরণকে বলা হয় অন্যকে মানুষ হিসেবে গণ্য না করার প্রবণতা। যখন কোনো মানুষ বা গোষ্ঠী অন্য কাউকে নিজের চেয়ে আলাদা বা ‘শত্রু’ মনে করে, তখন ধীরে ধীরে তার প্রতি সহানুভূতি বিলুপ্ত হয়ে যায়। একজন মানুষের মৃত্যুর মতো চরম বেদনার মুহূর্তও তখন আর সহানুভূতি জাগায় না, বরং আনন্দের খোরাক হয়।
অন্যদিকে একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি হলো পারস্পরিক আস্থা, শ্রদ্ধা এবং সামাজিক পুঁজি (Social Capital)। যখন সমাজে একে অপরকে হেয় করার এবং অন্যের পতনে আনন্দ পাওয়ার প্রবণতা ডালপালা মেলে, তখন মানুষের প্রতি মানুষের মৌলিক বিশ্বাস ও নিরাপত্তা বোধ হারিয়ে যায়। সমাজ তখন একটি হিংস্র ও অনিরাপদ জঙ্গলে পরিণত হয়। তার প্রমাণ—গত পঞ্চাশ বছর ধরে যে আস্থার সংকট চলছিল, তার ধারাবাহিকতায় বর্তমানে আমরা নাগরিক জঙ্গলে বসবাস করছি। এই আরণ্যক সমাজ-মানসে যে পরিবর্তন এসেছে, সেরকম পরিস্থিতিকে বলা যেতে পারে স্যাডিজম এবং সহমর্মিতার বিলুপ্তি (Sadism and Lack of Empathy)।
গত দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর ধরে এই যে সামাজিক অবক্ষয়, তার পালে নতুন করে হাওয়া লাগিয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি। আমাদের দেশের একটা প্রজন্ম বড় হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তিকে সঙ্গে নিয়েই। এই প্রযুক্তি-নির্ভর শিক্ষায় তারা দেশাত্মবোধ, দেশের প্রকৃত ইতিহাস, ঐতিহ্য জানুক না জানুক, অন্যের যন্ত্রণায় আনন্দ-উল্লাস করতে শিখেছে ঢের বেশি।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, অন্যের মৃত্যু বা যন্ত্রণায় আনন্দ পাওয়া এক ধরনের সামষ্টিক মানসিক বিকৃতি বা ‘Schadenfreude’। ইন্টারনেট এবং সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম মানুষকে এমন এক ইকো চেম্বারে বন্দি করে ফেলেছে, যেখানে একদল নিজের মতের বাইরের মানুষকে আর ‘মানুষ’ বলে মনে করছে না। এর ফলে বর্তমানে আমাদের সমাজে সহমর্মিতা বা ‘Empathy’ শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। কারিনা কায়সার তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। যারা কারিনার বিরুদ্ধ মত ও পথের, তারা মেয়েটির মৃত্যুতে উল্লাস করছে। আরেক দল মানুষ তার পক্ষ নিয়ে সহমর্মিতা দেখাতে ঝাঁপিয়ে পড়ছে, কিন্তু তাদেরও নিজের মতের বাইরে অন্য কারো মৃত্যুতে কিছু আসছে-যাচ্ছে না।
শুধু তাই নয়, ঘৃণার সংস্কৃতির সমালোচনা করতে এসেও কেউ কেউ ঘৃণাকেই উসকে দিচ্ছেন। তারা ভুলে গেছেন, কোনো এক পক্ষকে অনুশোচনাহীন বলে ভৎর্সনা করে ঘৃণাকে রোধ করা যায় না। ঘৃণার সংস্কৃতি রুখতে হলে সমালোচনার ভাষা হতে হয় অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নিরাময়মূলক। ফলে সমালোচনাকারীরা একটি চরম ক্ষতকে সামনে এনেছেন ঠিকই, কিন্তু যে ভাষায় এবং যে উদাহরণ দিয়ে তা উপস্থাপন করা হচ্ছে, তা অপরাধীদের অনুতপ্ত করার চেয়ে সমাজকে আরও বেশি বিভক্ত করতে পারে। ঘৃণার বিপরীতে পাল্টা সামাজিক নমনীয়তা বা সহমর্মিতা তৈরি করতে না পারলে, এই ধরনের একপেশে সমালোচনা কেবল ঘৃণার আগুনে আরও খানিকটা ঘি ঢালার কাজই করে।
চব্বিশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর এমনটা ঘটেই চলেছে এবং বাংলাদেশের সামাজিক অবস্থায় এসেছে এক ভয়ংকর পরিবর্তন। সমাজ-মনোবিজ্ঞানীদের ভাষায় যেটিকে বলা হচ্ছে—নোংরামির স্বাভাবিকীকরণ বা Normalization of Toxicity। যখন সমাজের বড় একটা অংশ নিয়মিত নোংরা ও কুরুচিপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করে এবং তা দেখে বাকিরা চুপ থাকে, তখন এই অপসংস্কৃতিটি সমাজে ‘স্বাভাবিক’ হয়ে ওঠে। তরুণ প্রজন্ম যখন দেখছে যে কাউকে গালি দেওয়া, মৃত মানুষকে নিয়ে ট্রল করা বা হেয় করা খুব সাধারণ বিষয়, তখন তারাও এটিকে স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে গ্রহণ করছে। চব্বিশের আগে বাস্তব জীবনে, ব্যক্তিগত পর্যায়ে এরকম নোংরা ভাষার প্রয়োগ খুব কমই দেখা গেছে। এমনকি রাজনীতিতেও এত নোংরা ভাষা, কদর্যপূর্ণ ইঙ্গিত এমন মহামারীর মতো ব্যবহার করতে দেখা যায়নি আগে।
যদিও এই গালিগালাজ, কুরুচিপূর্ণ ভাষার ব্যবহার করার নীরব বিপ্লব বেশ কিছু বছর আগে থেকেই আমাদের টেলিভিশনে প্রচারিত নাটক-সিনেমার বদৌলতে ঘটে গেছে। ওটিটি প্ল্যাটফর্ম এসে ভাষা বিপর্যয়ের ষোলকলা পূর্ণ করেছে। নানা কুরুচিপূর্ণ ও নোংরা ভাষা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী এবং তার ভাই-বেরাদারদের মাধ্যমে আমাদের বেডরুমে পৌঁছে গিয়েছিল। চব্বিশ শুধু তারই প্রতিফলন বাস্তবে ঘরে ঘরে ফলিয়েছে। এখন গালি, কুরুচিপূর্ণ ভাষা—এর সঙ্গে তাকে শুইয়ে দেওয়া এখন figure of speech অথবা Rhetorical Device। কাকে বা কার প্রতি এসব ব্যবহার করা হবে, সেখানে ছোট-বড়, নারী-পুরুষ, দায়িত্ববান-দায়িত্বজ্ঞানহীন কারো কোনো ভেদ নেই।
একটা সমাজে রাজনৈতিক আদর্শের লড়াইয়ের চেয়ে ইগো এবং ক্ষমতার লড়াই চরম হলে এবং জনমানসের নৈতিক অবক্ষয় ঘটলে দীর্ঘমেয়াদি যে ক্ষত তৈরি হয়, তার কয়েকটি উদাহরণ দিই।
কিছুদিন আগেও নোংরা কথা এবং কুরুচিপূর্ণ ট্রল ডিজিটাল স্ক্রিনে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন তা বাস্তব জীবনে শারীরিক সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। কারণ নোংরা ভাষা মানুষের ভেতরে থাকা অপরাধবোধ ও সহানুভূতির দেয়ালটি ভেঙে দেয়। আর এ কারণেই চালু হয়েছে মব-সংস্কৃতি। এই ধরনের গণ-বুলিং বা ট্রলিং এবং মবের সংস্কৃতি সমাজের সাধারণ মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ভয়ংকর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। সমাজে এক ধরনের প্রচণ্ড ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, যেখানে মানুষ নিজের স্বাধীন মতামত প্রকাশ করতে ভয় পাচ্ছে এবং হতাশা, বিষণ্নতা এবং মারাত্মক সব মানসিক অসুস্থতা বেড়েই চলেছে।
অন্যদিকে কোনো বিষয়ে দ্বিমত থাকতেই পারে, কিন্তু সুস্থ সমালোচনা বা বিতর্কের জায়গা যখন গালিগালাজ আর চরিত্রহননে পরিণত হয়, তখন সমাজে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা বন্ধ হয়ে যায়।
বিরোধীপক্ষের কারো করুণ মৃত্যুতে এই ধরনের কুরুচিপূর্ণ উল্লাস কোনো সাময়িক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়; এটি মূলত একটি পচনশীল সামাজিক মানসিকতার লক্ষণ। আইন ও সুবিচার নিশ্চিত করে হয়তো অপরাধ কমানো যাবে, কিন্তু এই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক অবক্ষয় রুখতে প্রয়োজন পারিবারিক শিক্ষা, সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে সচেতনতা বৃদ্ধি। নয়তো এই কুৎসিত প্রবণতা পুরো সমাজকেই আরো বেশি গভীর অন্ধকার ও নিষ্ঠুরতার দিকে ঠেলে দেবে।