Published : 08 Jul 2026, 07:11 PM
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে নানান পরিবর্তন আসে। রূপ সচেতন সমাজে বয়স চল্লিশের কোঠায় পৌঁছালে কেবল মাথায় দু-একটা পাকা চুল উঁকি দেওয়াকেই বার্ধক্যের লক্ষণ মনে করা হয়।
তবে চল্লিশের পর নারীর চুলে যে আরও কত রকমের পরিবর্তন আসতে পারে, তা অনেকেই জানেন না।
বিশেষ করে নারীদের যখন মেনোপজ বা স্থায়ীভাবে পিরিয়ড বন্ধ হওয়ার সময় ঘনিয়ে আসে, তখন হরমোনের ওঠানামার কারণে চুলের স্বাস্থ্য ও গঠনে বড় ধরনের ওলটপালট ঘটে।
চল্লিশের পর চুলের ৫টি বড় পরিবর্তন ও কারণ
যত্নের কৌশলের আগে জেনে নেওয়া যাক, চুলে কী কী পরিবর্তন ঘটতে পারে।
সিঁথি চওড়া হওয়া এবং চুল পাতলা হয়ে যাওয়া
সেল্ফ ডটকমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের টেলিহেলথ প্ল্যাটফর্ম ‘হার্স’-এর প্রধান মেডিকেল কর্মকর্তা ও বোর্ড-প্রত্যায়িত স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জেসিকা শেফার্ড বলেন, মেনোপজের আগের সময়টাকে বলা হয় পেরিমেনোপজ। এই পর্যায়ে শরীরে এস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা দ্রুত কমতে থাকে, যা চুল গজানোর মূল চাবিকাঠি।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইউসিএলএ হেলথ’-এর চুল পড়া ও ‘স্কাল্প ডিসঅর্ডার’ বিশেষজ্ঞ ডা. ক্যারোলিন গোহ একই প্রতিবেদনে ব্যাখ্যা করেন, “শরীরে এস্ট্রোজেন কমে গেলে টেস্টোস্টেরন হরমোনের প্রভাব বেড়ে যায়। ফলে চুলের ফলিকল বা গোড়াগুলো নতুন চুল গজানোর চেয়ে বিশ্রামের পর্যায়ে বেশি চলে যায়।”
ম্যানহাটন ডার্মাটোলজি অ্যান্ড কসমেটিক সার্জারির চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ডেন্ডি এঞ্জেলম্যান বলেন, “সাধারণ মানুষের দিনে ৫০ থেকে ১০০টি চুল পড়া স্বাভাবিক। তবে চল্লিশের পর যদি মাথার তালু বা সিঁথি বেশি চওড়া দেখায়, তবে বুঝতে হবে, হরমোন ও বয়সের কারণেই হচ্ছে।
চুলের গোড়া ছোট হয়ে যাওয়া
টেস্টোস্টেরনের আধিক্যের কারণে চুলের ফলিকল বা গোড়াগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংকুচিত বা আকারে ছোট হয়ে যায়।
ডা. এঞ্জেলম্যানের মতে, “ফলিকল ছোট হয়ে গেলে সেখান থেকে যে নতুন চুল গজায়, তা আগের চেয়ে অনেক বেশি সূক্ষ্ম, পাতলা ও দুর্বল হয়।”
চুল শুষ্ক ও খসখসে হয়ে যাওয়া
নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি ল্যাঙ্গোন-এর চুল ও স্কাল্প বিশেষজ্ঞ ডা. ক্রিস্টিন লো সিকো বলেন, “বছরের পর বছর ধরে চুলে রং করা, রাসায়নিক পণ্য ব্যবহার এবং হিট স্টাইলিংয়ের কারণে চল্লিশের কোঠায় এসে, চুল স্বাভাবিক সহনশীলতা হারিয়ে ফেলে রুক্ষ ও ভঙ্গুর হয়ে যায়।”
ডা. গোহ আরও যোগ করেন, “বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্কাল্প বা মাথার ত্বক প্রাকৃতিক তেল বা সিবাম উৎপাদন কমিয়ে দেয়, যার ফলে চুল সাহারা মরুভূমির মতো শুষ্ক দেখায়।”
চুলের উজ্জ্বলতা বা লাবণ্য হারানো
মাথার ত্বকে প্রাকৃতিক তেলের ঘাটতি থাকার কারণে সেই তেল চুলের গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। ফলে স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা হারিয়ে নিস্তেজ ও কালচে দেখাতে শুরু করে চুল।
দ্রুত চুল পেকে যাওয়া
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চুলের ফলিকলে থাকা মেলানোসাইট (রঞ্জক উৎপাদনকারী কোষ) সচলতা হারায় এবং মেলানিন তৈরি কমিয়ে দেয়।
ডা. গোহ এবং ড. শেফার্ডের মতে, “জিনগত কারণ ছাড়াও চল্লিশের কোঠায় এসে ক্যারিয়ার, সন্তান বা বয়োবৃদ্ধ বাবা-মায়ের যত্ন নেওয়ার যে মানসিক চাপ বা স্ট্রেস তৈরি হয়, তাও চুল পাকার প্রক্রিয়াকে অনেক দ্রুত বাড়িয়ে দেয়।”
চুলের যত্নে ৫টি পরামর্শ
চল্লিশোর্ধ্ব বয়সে চুলের এসব সমস্যা সামলাতে ও দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষায় কিছু রুটিন পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়েছেন, এই বিশেজ্ঞরা।
কম শ্যাম্পু ও মাইল্ড ক্লিনজার: চুল অতিরিক্ত শুষ্ক মনে হলে ঘন ঘন শ্যাম্পু করা বন্ধ করতে হবে।
ডা. গোহ-এর মতে, “সালফেট-মুক্ত কোমল ও আর্দ্রতা রক্ষাকারী শ্যাম্পু ব্যবহার করা উচিত, যা চুলের ভেতরের আর্দ্রতা কেড়ে নেবে না।”
কেরাটিন ও অ্যামিনো অ্যাসিডের ব্যবহার: ভঙ্গুর ও দুর্বল চুলকে শক্তিশালী করতে কেরাটিন সমৃদ্ধ ডিপ কন্ডিশনার ব্যবহারের পরামর্শ দেন, ডা. শেফার্ড।
এছাড়া অ্যামিনো অ্যাসিড ও উদ্ভিজ্জ প্রোটিন সমৃদ্ধ হেয়ার মাস্ক, চুলের ঘনত্ব বজায় রাখতে ভালো কাজ করে।
তাপ ও রাসায়নিক স্টাইলিং কমানো: সোজা করা, কার্ল বা কোঁকড়া করা বা ব্লো-ড্রাই করার মতো তাপীয় যন্ত্রের ব্যবহার যতটা সম্ভব কমিয়ে আনতে হবে। আর একান্তই ব্যবহার করতে হলে ভালো মানের ‘হিট প্রোটেক্ট্যান্ট’ সেরাম ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক।
বার্ষিক শারীরিক পরীক্ষা: ডা. লো সিকো মনে করিয়ে দেন, “অনেক সময় থাইরয়েডের সমস্যা, ডায়াবেটিস কিংবা শরীরে আয়রন, ভিটামিন ডি, জিঙ্ক এবং বায়োটিনের ঘাটতির কারণেও চুল পড়তে পারে।”
তাই নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শে সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার প্রয়োজন পড়তে পারে।
চিকিৎসকের দ্রুত শরণাপন্ন হওয়া: যদি চুল পড়ার হার অতিরিক্ত হয়, তবে ঘরে বসে না থেকে দ্রুত একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
ডা. শেফার্ডের মতে, “চিকিৎসকের পরামর্শে মিনোক্সিডিল বা স্পিরোনোল্যাকটোন-এর মতো ওষুধ অথবা ‘ইন-অফিস প্লাজমা থেরাপি’ চুলের ফলিকলকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে।
আসল বিষয় হল
এই বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চুলের এই পরিবর্তনগুলো অত্যন্ত স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক নিয়ম। সেজন্য জন্য দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়ার কিছু নেই। সঠিক রুটিন আর একটু বাড়তি যত্নই পারে চল্লিশের পরেও চুলকে প্রাণবন্ত ও সুন্দর রাখতে।
আরও পড়ুন
চুলের জন্য প্রতিদিনের ছোট যত্ন