Published : 17 Jun 2026, 06:12 PM
মুখের ত্বকের জেদি কালো দাগ বা ‘হাইপারপিগমেন্টেইশন’ দূর হওয়া বেশ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত এই দাগগুলো হালকা হতে অন্তত এক মাস থেকে সর্বোচ্চ তিন মাস পর্যন্ত সময় লেগে যায়।
যখন ত্বকে অতিরিক্ত মেলানিন বা পিগমেন্ট তৈরি হয়, তখনই এই কালো, লালচে বা বেগুনি রংয়ের দাগগুলো দৃশ্যমান হয়।
রোদ থেকে সুরক্ষা না নেওয়া, গর্ভাবস্থায় হরমোনের পরিবর্তন কিংবা ব্রণ খোঁটার ফলে ত্বকের ভেতরে যে প্রদাহ তৈরি হয়— তা থেকেই মেলানিনের উৎপাদন বাড়ে।
জীবনধারা ও স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট ‘সেলফ ডটকম’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে মার্কিন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা এমন ৬টি ভুলের কথা তুলে ধরেছেন, যা হয়ত অজান্তেই প্রতিদিন করা হচ্ছে।
একসঙ্গে একাধিক ত্বক উজ্জ্বল করার উপাদান ব্যবহার
ত্বকের দাগ দূর করে উজ্জ্বলতা বাড়াতে ভিটামিন-সি, রেটিনল বা কেমিক্যাল এক্সফোলিয়েটর (গ্লাইকোলিক বা স্যালিসিলিক অ্যাসিড) দারুণ কাজ করে। তবে দ্রুত ফলাফল পাওয়ার আশায় এই সবগুলো কড়া উপাদান একসঙ্গে ত্বকে মাখলে হিতে বিপরীত হয়।
আমেরিকার নিউ অরলিন্সের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মামিনা তুরেগানো বলেন, "একসঙ্গে অনেক শক্তিশালী উপাদান ব্যবহার করলে, ত্বক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও লালচে হয়ে যায়। যা ক্যানসারের মতো ঝুঁকি না বাড়ালেও ত্বকের কালো দাগকে আরও স্থায়ী করে তোলে।"
করণীয়: সব উপাদান একসঙ্গে না মেখে একটি উপাদান বেছে নিয়ে অন্তত দুই সপ্তাহ ব্যবহার করে দেখতে হবে, ত্বক কেমন প্রতিক্রিয়া দেখায়। চাইলে ভিটামিন-সি সকালে এবং রেটিনল রাতে ব্যবহার করা যেতে পারে।
ব্রণের মূল চিকিৎসা আগে না করা
অনেকেরই মুখে ব্রণ থাকা অবস্থাতেই, কেবল ব্রণের পরের কালো দাগ দূর করার পেছনে ছোটেন।
ড. তুরেগানো বলছেন, “এটি বড় ভুল। কারণ যতক্ষণ ত্বকে সক্রিয় ব্রণ থাকবে, অতিরিক্ত তেল আর ব্যাকটেরিয়ার কারণে ত্বকের ভেতরের প্রদাহ চলতেই থাকবে। আর নতুন নতুন মেলানিন তৈরি হতেই থাকবে। ফলে পুরানো দাগ দূর হতে না হতেই নতুন দাগের জন্ম হবে।
করণীয়: আগে ব্রণের মূল চিকিৎসা করতে হবে। এর জন্য রেটিনল, নায়াসিনামাইড কিংবা গ্লাইকোলিক অ্যাসিড ব্যবহার করা যেতে পারে, যা ব্রণ এবং দাগ— দুটির ওপরেই একসঙ্গে কাজ করে।
সানস্ক্রিন ব্যবহারে অবহেলা করা
নিউ ইয়র্ক সিটির চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ব্রেন্ডন ক্যাম্প বলেন, "অনেকেই মনে করেন সানস্ক্রিন শুধু রোদে পোড়া থেকে বাঁচায়। তবে যারা মুখের কালো দাগ নিয়ে ভুগছেন, তাদের জন্য সানস্ক্রিন ব্যবহার করা জরুরি।”
কারণ সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি ত্বকের মেলানিন উৎপাদন বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ফলে সাধারণ লালচে বা বাদামি দাগগুলো আরও গাঢ় ও জেদি কালো রং ধারণ করে।
করণীয়: প্রতিদিন অন্তত এসপিএফ ৩০ যুক্ত ব্রড-স্পেকট্রাম সানস্ক্রিন ব্যবহার করতে হবে। আর ঘরের বাইরে থাকলে বা ঘেমে গেলে প্রতি দুই ঘণ্টা পর পর, আবার ত্বকে লাগাতে হেব।
জিঙ্ক অক্সাইড বা টাইটানিয়াম ডাইঅক্সাইড যুক্ত সানস্ক্রিন এক্ষেত্রে সেরা।
অতিরিক্ত গরম পানির ভাপ বা ওম নেওয়া
ডা. ব্রেন্ডন ক্যাম্পের মতে, শুধু সূর্যের আলোই নয়, অতিরিক্ত উত্তাপও ত্বকের ক্ষতি করে। যারা খুব গরম পানিতে দীর্ঘক্ষণ গোসল করেন বা নিয়মিত স্টিম বাথ নেন, তাদের ত্বকে দীর্ঘমেয়াদি মৃদু প্রদাহ তৈরি হয়। এই উত্তাপের কারণে ত্বকের মেলানোসাইট কোষগুলো উত্তেজিত হয়ে বেশি পিগমেন্ট তৈরি করে, যা কালো দাগকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
করণীয়: গরম পানিতে গোসল পুরোপুরি ছাড়তে হবে না, তবে অতিরিক্ত গরম পানিতে ৩০ মিনিটের মতো দীর্ঘক্ষণ গা ভেজানো বা প্রতিদিন স্টিম নেওয়া বন্ধ করতে হবে।
ভুল নিয়মে বা অতিরিক্ত স্ক্রাবিং করা
অনেকে ভাবেন দানাদার ফেইসওয়াশ বা স্ক্রাব দিয়ে জোরে জোরে ঘষলে বোধহয় মুখের কালো দাগ ঘষে তুলে ফেলা যাবে।
ডা. তুরেগানো বলেন, “এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল এবং বিপজ্জনক। চালের গুঁড়া, লবণ বা খসখসে দানাযুক্ত ‘ফিজিক্যাল স্ক্রাব’ দিয়ে ঘষলে সংবেদনশীল ত্বকে ‘মাইক্রোট্রমা’ বা ক্ষুদ্র ক্ষত তৈরি হয়, যা ত্বককে আরও কালচে করে দেয়।
করণীয়: ‘ফিজিক্যাল’ খসখসে স্ক্রাব এড়িয়ে চলতে হবে। কেমিক্যাল এক্সফোলিয়েটর (যেমন- এএইচএ অথবা বিএইচএ) ব্যবহার করলেও, সেটা সপ্তাহে মাত্র এক বা দুইবারের বেশি ব্যবহার করবেন না।
দাগের ধরন না চেনা
সব দাগ এক নয়। ব্রণ বা আঘাতের পর ত্বকে দু’ধরনের দাগ হয়:
পিআইএইচ বা পোস্ট-ইনফ্ল্যামেটরি হাইপারপিগমেন্টেইশন: এগুলো আসলে কালচে বা বাদামি দাগ, যা মেলানিনের কারণে হয়। এর জন্য ভিটামিন-সি, কোজিক অ্যাসিড বা ‘লিকোরিস রুট এক্সট্রাক্ট’ ভালো কাজ করে।
পিআইই বা পোস্ট-ইনফ্ল্যামেটরি ইরিথিমা: এগুলো মূলত লালচে, গোলাপি বা বেগুনি দাগ, যা ত্বকের নিচের ক্ষতিগ্রস্ত রক্তনালীর কারণে হয়। এর জন্য কড়া উপাদানের বদলে ত্বক শান্ত করার উপাদান, যেমন নায়াসিনামাইড, অ্যাজেলাইক অ্যাসিড বা সিকা ব্যবহার করতে হবে।
করণীয়: মুখের দাগটি কালো নাকি লালচে তা খেয়াল করতে হবে। আর সেই অনুযায়ী সঠিক উপাদানটি বেছে নিলে, দ্রুত ত্বক উজ্জ্বল হবে।
আরও পড়ুন
ঠোঁটে কালচে দাগ হওয়ার ভিন্ন কারণ ও প্রতিকার