Published : 28 Jul 2026, 10:40 PM
বাংলাদেশের অর্থনীতির পূর্বাভাস ‘স্থিতিশীল’ থেকে ‘নেতিবাচক’ করেছে আন্তর্জাতিক ঋণমান কোম্পানি এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল।
তবে দেশটির দীর্ঘমেয়াদী ঋণমান ‘বি প্লাস’ এবং স্বল্পমেয়াদি ঋণমান ‘বি’ বহাল রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি সোমবার তাদের এমন পূর্বাভাস দিয়েছে, যাতে দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
এর আগে চলতি বছরের ১৪ মে আরেক মার্কিন ঋণমান প্রতিষ্ঠান ফিচ রেটিংস বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পূর্বাভাস ‘স্থিতিশীল’ থেকে ‘নেতিবাচক’ করেছিল।
এসঅ্যান্ডপি তাদের সবশেষ প্রতিবেদনে বলেছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি চ্যালেঞ্জিং সময় অতিক্রম করছে। এর অন্যতম কারণ ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা। পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতির ঝুঁকিও অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে কয়েকটি পরামর্শ দিয়ে বলেছে, এটি নির্ভর করবে রেমিটেন্স শক্তিশালী থাকা, রপ্তানি আয়ের প্রধান পণ্য তৈরি পোশাক খাতের পুনরুদ্ধার এবং বহুপাক্ষিক ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক সম্পৃক্ততা বজায় রাখা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংক খাতের দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধজনিত অনিশ্চয়তা, জ্বালানিবাজারের অস্থিরতা ও বৈদেশিক খাতের ঝুঁকির কারণে আগামী এক থেকে দেড় বছর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি আরও কমে যেতে পারে। এসব কারণে পূর্বাভাস ‘নেতিবাচক’ করা হয়েছে।
এসঅ্যান্ডপি বলেছে, আগামী তিন বছর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি (জিডিপি প্রবৃদ্ধি) গড়ে সাড়ে ৪ শতাংশের কাছাকাছি থাকতে পারে। দুর্বল ব্যাংক খাত, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা ও তৈরি পোশাক রপ্তানির অনিশ্চিত পরিস্থিতির কারণে প্রবৃদ্ধির গতি সীমিত থাকবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন আইএমএফ কর্মসূচির মাধ্যমে রাজস্ব ও ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ত্বরান্বিত হলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরও শক্তিশালী হতে পারে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিপিএম৬ হিসাবে ৬ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার বেড়ে ৩২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে প্রবাসী আয় প্রায় ১৯ শতাংশ বেড়েছে।
“তবে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে দুর্বলতা ও উচ্চ জ্বালানি ব্যয়ের কারণে আগামী কয়েক বছরে চলতি হিসাবের ঘাটতি বাড়তে পারে।”
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা এখনো জিডিপির ৮ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে; আর্থিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে এটি বড় বাধা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংস্কার, ই-ট্যাক্স ব্যবস্থা সম্প্রসারণ ও কর প্রশাসনের উন্নতির উদ্যোগ নেওয়া হলেও এর সুফল পেতে সময় লাগবে।
ব্যাংকিং খাত সম্পর্কে এসঅ্যান্ডপি বলেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ও ইসলামি ব্যাংকগুলোতে মূলধনঘাটতি এবং অতিরিক্ত খেলাপি ঋণ অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৪০ শতাংশ। এসব ব্যাংকের পুনর্মূলধনীকরণে অনেক সময় লাগবে।
আগামী দুই থেকে তিন বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হারে উল্লেখযোগ্য গতি আসবে, এমন সম্ভাবনা দেখছে না এসঅ্যান্ডপি। সে কারণে দেশের দীর্ঘমেয়াদী প্রবৃদ্ধি একই পর্যায়ের মাথাপিছু আয়ের দেশগুলোর সমপর্যায়ে নেমে এলে বাংলাদেশের ঋণমান আরও কমানো হতে পারে।
মার্কিন ঋণমান কোম্পানিটি বলছে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক সংকটের অভিঘাত থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি। এর মধ্যে ব্যাংক খাতের দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করছে। কয়েকটি ব্যাংকের সম্পদের নিম্নমান ও খেলাপি ঋণের সমস্যা কাটিয়ে উঠতে ব্যাপক পুনর্গঠন কার্যক্রম চলছে।
“এর ইতিবাচক প্রভাব এখনো স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে না।”
একই সময়ে জ্বালানির অস্থিরতার কারণে মূল্যস্ফীতি এখনো ঊর্ধ্বমুখী। জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়ায় মানুষের ব্যয় করার সক্ষমতা কমে গেছে। ফলে ব্যক্তির ভোগ ব্যয় প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। ক্রয় চাহিদা না বাড়ায় অভ্যন্তরীণ ভোগভিত্তিক যে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা, তাতে গতি আসছে না।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পূর্বাভাস ‘স্থিতিশীল’ থেকে ‘নেতিবাচক’ করল ফিচ