মারধরকে ‘প্রতিরোধ’ দাবি আম্মারের, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার ‘হুমকি’ রাকসু ভিপির
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাকসু কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তারা এই অভিযোগ করেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনায় ‘রাকসু ও ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে’ সংবাদ প্রকাশের অভিযোগ তুলেছেন রাকসুর ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ। তিনি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ‘হুমকি দিয়েছেন’।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাকসু কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই অভিযোগ করেন। এ সময় তার পাশে রাকসুর সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন আম্মার ছিলেন।
মোস্তাকুর রহমান জাহিদের দাবি, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম সংঘর্ষের ঘটনাকে ‘একপাক্ষিকভাবে’ প্রচার করেছে এবং ‘ছাত্রলীগের পক্ষে’ উপস্থাপন করেছে।
সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আপনারা সংবাদে যেসব শব্দ ব্যবহার করছেন, সেগুলোর বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নেব। গতকাল অনেকেই এমনভাবে সংবাদ প্রকাশ করেছেন, যাতে ছাত্রলীগকে ডিফেন্ড করা হয়েছে। এখানে উপস্থিত সাংবাদিকদের মধ্যে যারা এ ধরনের সংবাদ করেছেন, আমরা সেগুলো সংগ্রহ করছি এবং তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেব।”
রাকসু ভিপি বলেন, “আপনারা বলছেন, আমরা হামলা করেছি। এটা কীভাবে হামলা হয়? তারা হামলা করেছে, আমরা ‘প্রতিরোধ’ করেছি। ‘প্রতিরোধ’ শব্দটি ব্যবহার করতে আপনাদের এত সংকোচ কেন? ছাত্রলীগের প্রতি এত মায়াকান্না কেন? সাংবাদিকদের এই ভূমিকার বিরুদ্ধে আমরা পদক্ষেপ নেব।”
সংবাদ সম্মেলনে এ প্রসঙ্গে সালাউদ্দিন আম্মার বলেন, “আমরা যেটাকে প্রতিরোধ বলছি, সেটিকে আপনারা প্রতিরোধ হিসেবে দেখতে পারছেন না কেন? গত দুই বছর ধরে আমরা ছাত্রলীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, আওয়ামী লীগপন্থি শিক্ষক এবং সংশ্লিষ্টদের বিচারের দাবি জানিয়ে আসছি।
“এই ঘটনার জন্য যারা দায়ী, তাদের বিরুদ্ধেও আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানাব। আমার বিশ্বাস, আগের ঘটনাগুলোর বিচার সময়মত হলে আজকের এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হত না।”
ঘটনায় নিজেদের ‘ভুক্তভোগী’ দাবি রাকসুর
এদিকে সোমবার ক্যাম্পাসে মারামারির ঘটনায় নিজেদেরকে ‘ভুক্তভোগী’ দাবি করেছেন রাকসু ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ এবং জিএস সালাউদ্দিন আম্মার।
মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, “গতকালের ঘটনার কেন্দ্রীয় যে ব্যক্তিকে নিয়ে আগে মানববন্ধন হয়েছিল, তাকে আবার ছাত্রলীগ মারধর করেছে- এ বিষয়টি পরিষ্কার করা প্রয়োজন। আমাদের বিজ্ঞপ্তিতে আমরা স্পষ্টভাবে বলেছি, ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত হিসেবে অভিযুক্ত হচ্ছেন আনাস। পাশাপাশি, আনাসের সঙ্গে ছাত্রদলের যেসব নেতাকর্মী হামলায় অংশ নিয়েছেন, তাদের সবার বিচারও আমরা দাবি করেছি। অর্থাৎ, আনাস ছাত্রলীগের সঙ্গে জড়িত এবং তার সঙ্গে ছাত্রদলের কিছু ব্যক্তি মিলে এই হামলা চালিয়েছে- এ বিষয়টিই আমরা স্পষ্ট করতে চাই।”
জিএস সালাউদ্দিন আম্মার ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, “আমরা পুলিশ প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে সব ধরনের প্রমাণ দেখিয়ে বলেছিলাম, প্রয়োজন হলে অজ্ঞাত মামলায় হলেও তাকে গ্রেপ্তার করা হোক। কিন্তু তা করা হয়নি। আমরা প্রশ্ন করেছি, ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের একজন শিক্ষার্থী এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন অবস্থান করছে। ইতিহাস বিভাগের একজন শিক্ষার্থীর অনার্স শেষ হতে সর্বোচ্চ সাড়ে পাঁচ বছর লাগার কথা। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া যায়নি।”
তিনি বলেন, “প্রক্টর স্যার আমাদের বলেছিলেন, সবাই তার শিক্ষার্থী, তাই তিনি কিছু করতে পারবেন না। পরে তিনি আমাদের একটি কক্ষে অপেক্ষা করতে বলেন। কিছুক্ষণ পর দেখি আনাসও নেই, পুলিশও নেই। পরে জানতে পারি, তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।”
এরপরের ঘটনার বর্ণনায় আম্মার বলেন, “আমরা রাকসু ভবনে যাওয়ার পর সাতজন সেখানে আসে। একজন ভিডিও ধারণ করছিল আর ছয়জন অতর্কিত হামলা চালায়। কেউ আমাকে মারধর করেছে, কেউ অস্ত্র তাক করেছে, কেউ আবার পুরো ঘটনাটি ভিডিও করেছে। আমার মনে হয়েছে, উদ্দেশ্য ছিল শুধু শারীরিকভাবে আঘাত করা নয়; সামাজিকভাবেও আমাকে হেয় করা এবং একটি নির্দিষ্ট বয়ান তৈরি করা।
“জুলাই আন্দোলনে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ভূমিকা রেখেছেন। তাই ছাত্রলীগের প্রশ্নে কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। হামলার পরপরই আমরা প্রক্টর অফিসে যাই। তখন হামলাকারীরা কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির পাশে অবস্থান করছিল। আপনারা যে ভিডিও দেখাচ্ছেন, সেখানে শুধু আমাদের অংশটি দেখানো হয়েছে। কিন্তু সেখানে ২০-২৫ জন দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের তখন আটকানো না হলে তারা পালিয়ে যেত।”
তিনি দাবি করেন, “এই পুরো ঘটনায় ২০-২৫ মিনিট সময় লেগেছে। আমি তখন নোটিশ দেওয়ারও সুযোগ পাইনি। পরে ভিডিও প্রকাশ হওয়ার পর সবাই বিষয়টি জানতে পারে। এই সময়জুড়ে আমরা প্রশাসনকে বারবার বলেছি হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করতে। কিন্তু তারা তা করেনি।”
সংবাদ সম্মেলনে রাকসুর পক্ষ থেকে ছয় দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- নারী শিক্ষার্থীকে প্রাণনাশের হুমকির ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, রাকসু ভবনে হামলা ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় জড়িতদের গ্রেপ্তার ও বিচার, দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ তদন্ত, ক্যাম্পাসে সন্ত্রাস ও রাজনৈতিক পরিচয়ের অপব্যবহার বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অতীতে নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত ও ছাত্রলীগ-সংশ্লিষ্টদের বিচার নিশ্চিত করা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, সোমবার সকালে এক নারী শিক্ষার্থীকে হেনস্তার একটি ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর দপ্তরে ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট ছাত্রকে নিয়ে বৈঠকে বসেন প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান। এ সময় রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মার ও এজিএস সালমান সাব্বির দপ্তরে উপস্থিত হন।
পরে তারা দুজন রোববার রাতে প্রক্টরের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগে আনাসকে প্রক্টর দপ্তরে ডাকেন। আনাস উপস্থিত হলে দুই পক্ষের কথা কাটাকাটির মাঝেই আনাসকে চড়-থাপ্পড় দেন জিএস ও এজিএস। এ সময় তাকে ‘ছাত্রলীগ কর্মী’ আখ্যা দিয়ে গ্রেপ্তারের দাবিও তোলেন রাকসুর এই দুই নেতা। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকায় প্রক্টর আনাসকে ছেড়ে দেন।
তবে ছাড়া পাওয়ার পর আনাস তার কয়েকজন সঙ্গীকে নিয়ে রাকসু কার্যালয়ে হামলা করেন বলে দাবি করেন জিএস সালাউদ্দিন আম্মার।
পরে রাকসু এবং ছাত্র শিবির নেতারা তাদের ধাওয়া করলে তারা কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে আশ্রয় নেন। এ সময় রাকসুর জিএস আম্মার, এজিএস সালমান সাব্বির, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক নাজমুস শাকিব, বিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক ইমরান লস্কর, সিনেট ছাত্র প্রতিনিধি ফাহিম রেজা ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র শিবিরের সাধারণ সম্পাদক হাফেজ মেহেদী হাসানের নেতৃত্বে তাদের উপর হামলা করা হয়। এ সময় রিডিং রুমে অবস্থান করা শিক্ষার্থীরা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তাদেরকেও হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরে লাইব্রেরির পরিচালক এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আনাস ও তার সঙ্গী দুইজনকে উদ্ধার করে অ্যাম্বুলেন্সে তুলে দিতে গেলে জিএস আম্মারের নেতৃত্বে তাদের নামিয়ে ফের মারধর করা হয়।
রাতে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতহাস বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. আনাস এবং সংস্কৃত বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসানকে ‘ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের’ আগের একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
এদিকে তিন শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
ঘটনার দিন সোমবার রাতে প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. রেজাউল করিমকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রশাসন। মঙ্গলবার কমিটির সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
আরও পড়ুন:
