‘হামের টিকা নিলে হয়ত পরিবারের ছয় শিশুকে হারাতে হত না’, আক্ষেপ শৈলুং খুমির
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, যা উদ্বেগজনক; বলছে জেলা প্রশাসন।
বান্দরবানের রুমা সদর ইউনিয়নের দুর্গম লেতং পাড়ার বাসিন্দা শৈলুং খুমির এক মেয়ে হামের উপসর্গ নিয়ে গ্রামের বাড়িতে মারা যাওয়ার পর আরও তিন ছেলেমেয়েকে তিনি হাসপাতালে ভর্তি করেছেন। এখন তারা বান্দরবান সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে।
গত ১৫ দিনে শৈলুং খুমি তার মেয়ে ছাড়াও পরিবারের আরও পাঁচ শিশুকে একই কারণে হারিয়েছেন। ফলে তার চোখেমুখে এখন ভয় আর আতঙ্ক। তিনি সারাদিন তিন ছেলেমেয়ের পাশে বসে থাকেন, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সেবা দেন।
পরিবারের যে ছয় শিশুকে শৈলুং খুমি হারিয়েছেন, তারা হল- মেয়ে পলি এং খুমি (৭), শৈলুং খুমির ছেলে পও এং খুমির ছেলে প্রেটেম এং খুমি (৭) এবং ফ্রেলেং খুমি (৯), শৈলুং খুমির মেজো মেয়ে নাংক্য খুমির ছেলে খ্রেটেম এং খুমি (১৩), শৈলুং খুমির বড় ভাই আলম খুমির ছেলে ফ্রেলে এং খুমি (৯), শৈলুং খুমির ছোট ভাই আম্যাক খুমির মেয়ে খ্রেপা খুমি (১৩)।
এ ছাড়াও একই পাড়ার সাংনে খুমির ছেলে শইফ্রুা খুমিও (১৩) একই কারণে মারা গেছে।
লেতং পাড়ার বাসিন্দারা বলছেন, এদের মধ্যে দুই শিশু হাসপাতালে নিয়ে আসার পথে মারা যায়। একজন হাসপাতালে আসার পর মারা যায়। আর বাকিরা হামের লক্ষণ নিয়ে অসুস্থ হয়ে পাড়াতেই মারা যায়।
ফলে এখন হামের লক্ষণ দেখা দিলে কষ্ট করে হলেও দুর্গম পাড়া থেকে শিশুদের অভিভাবকরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসছেন। তাদের মধ্যে কাউকে কাউকে বান্দরবান সদর হাসপাতালে এবং পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করছেন চিকিৎসকরা।
মঙ্গলবার দুপুরে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, রোগীর আধিক্যের কারণে বিছানা না পেয়ে মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছে শৈলুং খুমির বড় মেয়ে নাংক্য খুমি (২৮)। তার নাকে অক্সিজেনের পাইপ দেওয়া।
পাশে উপরে একটি বিছানায় শুয়ে আছে তার আরও দুই ছেলে প্রেঙা এং খুমি (৩) ও পওলং এং খুমি (৭)।
বিছানায় রাখা এক ছেলেকে সেবা দেওয়ার পর বড় মেয়ের নাকের লাগানো অক্সিজেন পাইপ ঠিক করে দিচ্ছেন শৈলুং খুমি। ৫৪ বছরের এই নারী বলছিলেন, তাদের পরিবারের কোনো সন্তান কখনও কোনো টিকা নেয়নি। হামের টিকাও তারা নেয়নি।
কেন নেয়নি জানতে চাইলে শৈলুং খুমি বলেন, “কয়েক দিন আগে স্বাস্থ্যবিভাগের টিকাদান কর্মীরা আসলে সবাই হামে আক্রান্ত ছিল। এ জন্য টিকা আর দেয়নি তারা।”
এর আগের বছরগুলোতে ছেলেমেয়েদের কেন হামের টিকা দেওয়া হয়নি জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ভয়ের কারণে টিকা দেওয়া হয়নি। তখন আমাদের কেউ কেউ বলাবলি করত, টিকা নিলে বাচ্চারা ব্যাথা পাবে। তাদের কষ্ট হবে। টিকা নিলে নাকি জ্বর হয়। মূলত এরকম ভয়ের কারণে টিকা দেওয়া হয়নি।”
শৈলুং খুমি আক্ষেপ করে বলছিলেন, “তবে আগের দিনে কেউ কেউ রুমা বাজারে এসে টিকা নিয়েছিল। এখন আমাকে লোকজন বলছে, টিকা নিলে হয়ত ছেলেমেয়েদের হাম হত না। হলেও এরকম বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখে পড়তে হত না। আমরা হয়ত ছয়জনকে হারাতাম না। এখন তো কিছু করার নাই আর।”
এ সময় শৈলুং খুমির পাশে লেতং পাড়ার আরেক বাসিন্দা লইসাইং খুমি (১৮) দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার হাতে একটা প্রেসক্রিপশন। নার্সদের কাছ থেকে তিনি কিছু একটা বুঝে নিচ্ছিলেন।
লইসাইং খুমি বলছিলেন, তিনি শৈলুং খুমিদের আত্মীয়। রুমা উপজাতীয় আবাসিক বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে পড়েন। সোমবার রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে যে তিন খুমি শিশু ও এক ম্রো শিশুকে জেলা সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে, তিনি তাদের সঙ্গে এসেছে দেখভাল করার জন্য।
লইসাইং খুমি বলে, “পরিবার সদস্যদের কাছ থেকে শুনেছি, আমিও শিশু বয়সে হামের কোনো টিকা পাইনি। ভয়ে হয়ত বাবা-মা টিকা নিতে দেয়নি। এখন পাড়ার শিশুদের পরিস্থিতি দেখে টিকা নেওয়ার ব্যাপারে সবার ভয়টা কেটে গেছে।”
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা পরিষদের সদস্য ও স্বাস্থ্যবিভাগের আহ্বায়ক চিকিৎসক সানাইপ্রু ত্রিপুরা বলেন, “পরিস্থিতি জানার পর রোববার দুর্গত এলাকায় স্বাস্থ্য বিভাগের দল পাঠানো হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত তারা সেখানে অবস্থান করবেন।
“রুমা উপজেলা কমপ্লেক্সে অ্যাম্বুলেন্স এবং খাবারের ব্যাপারে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানকে অবহিত করা হয়েছে। উনি ঢাকায় আছেন। এসেই যত দ্রুত সম্ভব ব্যবস্থা নেবেন।”
হাম নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগ
বান্দরবানে হামের প্রাদুর্ভাব এবং আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে সোমবার রাতে চিঠি দিয়েছেন জেলা প্রশাসক মো. সামিউল ফেরদৌস।
চিঠিতে বলা হয়, ২৭ জুলাই রুমা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তার কাছ থেকে একাধিক শিশুর গুরুতর অসুস্থ হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে রুমা উপজেলার লিয়ামতং পাড়ার চার বছর বয়সী এক শিশুকে প্রথমে রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে বান্দরবান সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
“তবে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সদর হাসপাতালে কোনো অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যায়নি। পরে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে চট্টগ্রাম থেকে অ্যাম্বুলেন্স এনে শিশুটিকে চিকিৎসার জন্য পাঠানো সম্ভব হয়।”
চিঠিতে বলা হয়, বর্তমানে বান্দরবান সদর হাসপাতালে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হাম আক্রান্ত ২৫ জন রোগী ভর্তি রয়েছে এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, যা উদ্বেগজনক।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— হামে আক্রান্ত শিশু ও অন্যান্য রোগীদের পৃথক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা; শিশুদের প্রয়োজনীয় অক্সিজেন, ভেন্টিলেশন ও অন্যান্য জরুরী সার্ভিসগুলো নিশ্চিত করা; চিকিৎসক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর প্রয়োজনীয় সংখ্যা বৃদ্ধি করা; উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি হাম প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা ও উপকরণ নিশ্চিত করা; উপজেলা থেকে জেলা এবং জেলা থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বা উন্নত চিকিৎসাকেন্দ্রে রোগী পরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স (প্রয়োজনে সামরিক অ্যাম্বুলেন্সসহ) প্রস্তুত রাখা; পরিষদের পক্ষ থেকে সার্বিক সেবা নিশ্চিত, মনিটরিং ও সহযোগিতা করার জন্য সদস্য, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সাময়িক দায়িত্ব প্রদান করা এবং ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের অবকাঠামো দ্রুত সচল করার উদ্যোগ গ্রহণ করা
ছয়টি অ্যাম্বুলেন্স, অকেজো তিনটি
জেলা শহরে বিভিন্ন দুর্যোগ ও জরুরি পরিস্থিতি এবং সাধারণ রোগীদের পরিবহনের জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ছয়টি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। তার মধ্যে বান্দরবান সদর হাসপাতালে দুটি, জেলা পরিষদে দুটি, ফায়ার সার্ভিস ও পৌরসভায় একটি করে। কিন্তু তিনটি অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া বাকি তিনটি অকেজো বলে জানান এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা।
সদর হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স বিষয়ে জানতে আবাসিক মেডিকেল (আরএমও) কর্মকর্তা তৌহিদুল আনোয়ারকে মোবাইলে বার বার ফোন করা হলেও সংযোগ পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া জেলা সিভিল সার্জন শাহীন হোসাইন চৌধুরীকে মোবাইলে একাধিকবার ফোন করা হলে তিনিও ধরেননি।
তবে জেলা সদর হাসপাতালে একজন কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সদর হাসপাতালে যে দুটো অ্যাম্বুলেন্স আছে সেটা নামেমাত্র। কোনো রকমে ব্যবহার করা যায়। এটা পুরোপুরি সচল বলা যায় না। আবার অচলও বলা যায় না।”
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ও পৌর প্রশাসক এস এম মঞ্জুরুল হক বলেন, পৌরসভার একটা অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। সেটা অনেক বছর ধরে অকেজো পড়ে আছে। নতুন অ্যাম্বুলেন্স কেনার জন্য গত বছর নভেম্বরে স্থানীয় সরকার বিভাগে চিঠি দিয়েছি। এখনও অনুমতি পাওয়া যায়নি। অনুমোদন পেলে কেনা হবে।
অ্যাম্বুলেন্স বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে জেলা পরিষদের প্রশাসনিক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা জুড়িমং মারমা বলেন, জেলা পরিষদে দুটি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। একটা পুরোপুরি সচল। সবসময় ব্যবহার করা হয়। আরেকটি সমস্যা করছে। এখন গ্যারেজে কাজ চলছে। শুক্রবারও রুমা থেকে চট্টগ্রামে একজন রোগীকে নিয়ে গেছে। তবে নিয়ম হল তেলের খরচ ব্যববহারকারীদের বহন করতে হয়।
“যারা একেবারে গরিব কিংবা অসহায় তারা পরিষদের চেয়ারম্যানকে অবহিত করে বিনা খরচেও ব্যবহার করতে পারে। মূলত জনসাধারণকে মানবিক সহায়তার জন্য দুটি অ্যাম্বুলেন্সটি রাখা হয়েছে।”
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অ্যাম্বুলেন্স চেয়ে না পাওয়ায় চিঠি দেওয়ার প্রসঙ্গে জেলা পরিষদের এই কর্মকর্তা বলেন, “কেউ ফোন করলে কাউকে অ্যাম্বুলেন্স দেওয়া হয়নি এরকম কখনও ঘটেনি। অ্যাম্বুলেন্স রাখা হয়েছে রোগীদের সেবা দেওয়ার জন্য। উনারা কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে জানি না। অন্তুত এ বিষয়ে আমাকে কেউ ফোন দেননি।
“দিনে কতবার জেলা পরিষদের অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে রোগী নিয়ে যায় তার হিসাব নাই। কখনো রাত তিনটা, সাড়ে তিনটা পর্যন্ত অ্যাম্বুলেন্স চেয়ে ফোন আসে। কখনও সদর হাসপাতাল, কখনও ইমানুয়েল কিংবা হিল ভিউ ক্লিনিক থেকে সবসময় অ্যাম্বুলেন্সের জন্য ফোন আসে। অ্যাম্বুলেন্স ফ্রি থাকলে যে কোনো রোগী এটি ব্যবহার করতে পারে।”
নিজেদের অ্যাম্বুলেন্স বিষয়ে বান্দরবান ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক আবদুল মান্নান আনসারী বলেন, “আমাদের অ্যাম্বুলেন্সটি নষ্ট। এমনি পড়ে আছে। কোনো একটি দুর্ঘটনা হলে জরুরি প্রয়োজনে কোনো রকমে কেরানিহাট পর্যন্ত (বান্দরবান-চট্টগ্রাম সড়কে কেরানিহাটের দূরত্ব ২২ কিলো) যেতে পারে। অথবা বান্দরবান সদর হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারে। কোনো আলো বাতাস ঢুকে না। এই অ্যাম্বুলেন্সে করে চট্টগ্রামে নিয়ে গেলে রোগী নিজেও আধমরা হয়ে যাবে। যার কারণে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া এটা ব্যবহার করা হয় না।
“অনেক সময় হঠাৎ করে গভীর রাতে একজন ডেলিভারি রোগীর জন্য ফোন করে বসে। অথবা কোনো রোগীকে কাছের কোথাও পৌঁছে দিয়ে আসতে হবে। মানবিক কাজের জন্য শুধু তখনই আমাদের অ্যাম্বুলেন্সটি ব্যবহার করা হয়। কর্তৃপক্ষকে জানানো আছে। ঠিক করে দেওয়া হবে বলে আশ্বস্ত করেছেন তারা।”
আরও পড়ুন:
