১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

দুর্গম রুমায় হামের প্রকোপ, ৭ খুমি শিশুর মৃত্যু

দুর্গত এলাকায় স্বাস্থ্য বিভাগের একটি দল গেছে, যারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত সেখানে থাকবে।

দুর্গম রুমায় হামের প্রকোপ, ৭ খুমি শিশুর মৃত্যু
রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে সোমবার দুপুরে হামের উপসর্গের চার রোগীকে বান্দরবান সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। অ্যাম্বুলেন্স না থাকায় তারা একটি গাড়ি ভাড়া করেন রওনা হন।

বিডিনিউজ২৪

উসিথোয়াই মারমা. বান্দরবান প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 27 Jul 2026, 10:37 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:44 PM

বান্দরবানের রুমায় হঠাৎ করে হামের প্রকোপ বেড়েছে। এ রোগের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ার মধ্যে গত ১৫ দিনে সাত খুমি শিশুর মৃত্যুর তথ্য দিয়েছেন স্থানীয়রা।

হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া এসব শিশু রুমা সদর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের লেতং পাড়ার বাসিন্দা। তাদের মধ্যে ছয় শিশুই একে অপরের আত্মীয়।

শিশুরা হল- শৈলুং খুমির মেয়ে পলি এং খুমি (৭), শৈলুং খুমির ছেলে পও এং খুমির ছেলে প্রেটেম এং খুমি (৭) এবং ফ্রেলেং খুমি (৯), শৈলুং খুমির মেজো মেয়ে নাংক্য খুমির ছেলে খ্রেটেম এং খুমি (১৩), শৈলুং খুমির বড় ভাই আলম খুমির ছেলে ফ্রেলে এং খুমি (৯), শৈলুং খুমির ছোট ভাই আম্যাক খুমির মেয়ে খ্রেপা খুমি (১৩)।

আরেক শিশু হল- একই পাড়ার সাংনে খুমির ছেলে শইফ্রুা খুমী (১৩)।

বান্দরবান সদর হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে আসা রোগী। 

বান্দরবান সদর হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে আসা রোগী।

এদের মধ্যে ফ্রেলং খুমিকে রোববার বিকালে রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করার সময় পথে তার মারা যাওয়ার তথ্য দেন লেতং পাড়ার বাসিন্দা অংসাই খুমি।

তিনি বলেন, পাড়ার শৈলুং খুমির পরিবারেরই ছয়জন মারা গেছে। আরেকজন অন্য পরিবারের।

“এদের মধ্যে দুই শিশু হাসপাতালে নিয়ে আসার পথে মারা যায়। একজন হাসপাতালে আসার পর মারা যায়। আর বাকিরা হামের লক্ষণ নিয়ে অসুস্থ হয়ে পাড়াতেই মারা যায়। এখন হামের লক্ষণ দেখা দিলে কষ্ট করে হলেও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসে লোকেরা।”

অংসাই খুমির দেওয়া তথ্য মতে, লেতং পাড়া সদর ইউনিয়নে হলেও দুর্গম। সেখানে ২৮টির মত খুমি পরিবার রয়েছে। বগালেকের সাত কিলোমিটার এলাকা থেকে দুই ঘণ্টা পায়ে হেঁটে যেতে হয় সেখানে।

বান্দরবান সদর হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীর সঙ্গে বাবা-মা।

বান্দরবান সদর হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীর সঙ্গে বাবা-মা।

লক্ষণ দেখেই চিকিৎসা! 

সোমবার রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় হামের উপসর্গে আক্রান্ত রোগীদের আলাদা ওয়ার্ডের আইসোলেশন কক্ষে রাখা হয়েছে। আক্রান্ত শিশুদের কারও স্যালাইন চলছে, কারও অভিভাবকরা সেবা করছেন। এর মধ্যে কেউ কেউ হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে নতুন ভর্তি হতে আসছে।

বগালেকের নিচে ফাইনন পাড়া থেকে আসা পারিং ম্রো নামে একজন অভিভাবক বলেন, তার সাত বছর বয়সি মেয়ের কয়েক দিন ধরে গলা, পেটে ও মুখে ব্যাথা শুরু হয়। এমনকি জিহ্বাতেও ব্যাথা করে। রোববার সকালে হাসপাতালে নিয়ে এসে ভর্তি করা হয়। এখন আগের চাইতে ভালো হচ্ছে।

গালেঙ্গ্যা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের রুংরই পাড়ার বাসিন্দা পালে ম্রো বলেন, চঙি ম্রো (১০) ও কাইংপা ম্রো (১২) নামে দুই ছেলেমেয়ের পাঁচ দিন ধরে জ্বর। শরীরে লালচে দাগও আছে। ঘরে রেখে প্যারাসিটামল খাওয়ানো হয়েছে। ভালো   হচ্ছে না দেখে রোববার দুজনকে একসঙ্গে হাসপাতালে ভর্তি করেছেন।

বান্দরবান সদর হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীদের সেবা দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।

বান্দরবান সদর হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীদের সেবা দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।

খুলাইন পাড়ার বাসিন্দা লংশৈ খুমি বলেন, ১২ বছর বয়সি তার ছেলে ঢাকার গাজীপুরে একটা হোস্টেলে থেকে লেখাপড়া করে। গত সপ্তাহে হামের লক্ষণ নিয়ে গ্রামের বাড়িতে চলে আসে। গ্রামে বিভিন্ন বনজ ওষুধ খেয়েও ভালো হচ্ছে না। পরে হাসপাতালে এনে ভর্তি করেছেন।

তবে হামের উপসর্গ নিয়ে আগে থেকে ভর্তি হওয়া কিছু রোগী সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরছে। অনেককে ভালো হয়ে ঘরে যাওয়ার জন্য বিছানা গুছিয়ে প্রস্তুতি নিতে গেছে দেখা গেছে।

হাসপাতালে পাইন্দু ইউনিয়ন থেকে আসা হামের উপসর্গের রোগীদের তদারকি করছেন মংক্যচিং মারমা এক ব্যক্তি। ঠিকমত সেবাযত্ন দেওয়া হচ্ছে কিনা নার্স-চিকিসকদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিচ্ছিন তিনি।

মংক্যচিং মারমা বলেন, “রোগীদের অধিকাংশ অভিভাবক কখন কী করতে হবে জানেন না। কিছু প্রয়োজন হলে নার্স-চিকিৎসকদের বলতে পারছেন না। সে কারণে নিজ উদ্যোগে এসে তাদেরকে সহযোগিতা দিচ্ছি। নিয়াক্ষ্যং পাড়া থেকে ছয়জন হাম উপসর্গের রোগী ভর্তি হয়েছে। সুস্থ হয়ে পাঁচজন ঘরে ফিরেছে। আজকে একজন রিলিজ পেয়েছে।”

তবে হাম রোগীদের মধ্যে যাদের অবস্থা মুমূর্ষ তাদেরকে বান্দরবান সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সোমবার দুপুর ১২টার দিকে একসঙ্গে চার শিশুকে জেলা শহরের সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। অ্যাম্বুলেন্স না থাকায় জিপ গাড়ি ভাড়া করে নিয়ে যেতে দেখা গেছে।

হামের উপসর্গে আক্রান্ত মেয়েকে নিয়ে রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক খুমি মা।

হামের উপসর্গে আক্রান্ত মেয়েকে নিয়ে রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক খুমি মা।

উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের ভ্যাকসিনেটর উথোয়াই সিং মারমা বলেন, “স্বাস্থ্য কর্মকর্তার নির্দেশে কয়েক দিন আগে লেতং খুমি পাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি ঘরেই শিশুদের মধ্যে হামের উপসর্গ রয়েছে। অনেক পরিবার আধুনিক চিকিৎসার পরিবর্তে গাছ-গাছালি ও ভেষজ উপায়ে চিকিৎসা করানোর চেষ্টা করছে।

“আমরা ৩০ থেকে ৩৫ জন এক থেকে ছয় বছর বয়সি শিশুকে হামের টিকা দিয়েছি। টিকাদানের সময় তিনজন শিশুকে সংকটাপন্ন অবস্থায় দেখতে পেয়ে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিই। পরে হাসপাতালে আনার পথে একজন শিশুর মৃত্যু হয়।”

হাম নিশ্চিতের পরীক্ষার ব্যাপারে জানতে চাইলে ভ্যাকসিনেটর উথোয়াই সিং মারমা বলেন, “এমন কিছু তো দেখিনি। রোগীর শরীরের লক্ষণ ধরেই তো চিকিৎসা হচ্ছে।”  

রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দেওয়া তথ্য মতে, চলতি বছরের ৬ জুন থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে প্রায় ১০০ শিশু চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে ২২ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বান্দরবান সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র নিয়েছে ৬৫ জন। বর্তমানে ১৩ শিশু হাসপাতালে ভর্তি আছে।

রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) আব্দুল্লাহ আল হাসান বলেন, শনিবার সকালে স্থানীয়দের মাধ্যমে দুর্গম লেতং খুমি পাড়ায় হামের উপসর্গ নিয়ে দুই শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরপরই দুজন স্বাস্থ্যকর্মী ও একজন ভ্যাকসিনেটরকে সেখানে পাঠানো হয়। তারা পাড়ায় গিয়ে অসুস্থ শিশুদের খোঁজ নেন এবং এক থেকে পাঁচ বছর বয়সি শিশুদের হামের টিকা দেন। 

“স্বাস্থ্যকর্মীরা সেখানে গিয়ে তিন শিশুকে মুমূর্ষু অবস্থায় দেখতে পান এবং দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। পরে স্বজনরা পাহাড়ি দুর্গম পথ হেঁটে শিশুদের হাসপাতালে নিয়ে আসার সময় ছয় বছর বয়সি প্রেটেম এং খুমি নামে এক শিশু মারা যায়।”

ভৌগোলিক সুবিধার কারণে রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার হামের উপসর্গের রোগীরাও এখানে এসে ভর্তি হয়। সেই চাপও সামলাতে হয় বলে জানান চিকিৎসক।

রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হামের উপসর্গের রোগীদের আইসোলেশন ওয়ার্ড।

রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হামের উপসর্গের রোগীদের আইসোলেশন ওয়ার্ড।

রুমায় হঠাৎ হামের প্রকোপ কেন

ইউএইচএফপিও আব্দুল্লাহ আল হাসান বলেন, “দুর্গম এলাকার খুমি ও ম্রোদের মধ্যে টিকা নেওয়ার আগ্রহ নেই। টিকাদান কর্মসূচি চলাকালে খবর দেওয়া হলেও তারা আসেনি। তারপরও বিভিন্ন কৌশলে তাদেরকে টিকার আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা করি। এখন চোখের সামনে শিশুরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে দেখে টিকা নিচ্ছে। অসুস্থ হলে হাসপাতালমুখী হচ্ছে।

“আরেকটা কারণ হল, বাইরে থেকে অনেকেই লেখাপড়া করে। তারা আক্রান্ত হয়ে ঘরে এসে নিরবে বসে থাকে। এতে যারা টিকার আওতায় আসেনি তারাও আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। হাসপাতালে এসে সময়মত চিকিৎসা নেয়নি। তাদের থেকে এভাবে দ্রুত ছড়িয়েছে। পরে বেশি সিরিয়াস হওয়ায় এখন আক্রান্ত হলে হাসপাতালে এসে চিকিৎসা নিচ্ছে।”

তাছাড়া টিকা নেওয়ার পরও ১৫ শতাংশ আক্রান্ত হতে পারে। তবে প্রাণহানির ঝু্ঁকি কম এবং তারা দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতে পারে, যোগ করেন তিনি।

হামের মোকাবিলায় এক সপ্তাহের টিকাদানের কর্মসূচি হাতে নেওয়ার তথ্য দিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, উপজেলা প্রশাসন, সেনা ও বিজিবি এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরে সঙ্গে সমন্বয় করে এটা পরিচালনা করা হবে। কোন কোন এলাকায় টিকা নেয়নি বা বাদ পড়ে থাকতে পারে সেই এলাকা চিহ্নিত করে টিকাদান কর্মসূচি চলবে। যাতে কোনো শিশু বাদ না পড়ে।