জরায়ুর মুখে ক্যানসার প্রতিরোধে সচেতনতা
সহবাসে বা মেনোপজের পর হঠাৎ রক্তক্ষরণ মানেই যে জরায়ুর মুখে ক্যানসার, বিষয়টি এমন নয়।
বাংলাদেশের সামগ্রিক নারী স্বাস্থ্যের জন্য প্রধান ও মারাত্মক চিকিৎসাগত জটিলতা হল জরায়ুর মুখের ক্যানসার, যা দেশের ক্যানসার আক্রান্ত নারীদের মৃত্যুর কারণ হিসেবে দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করছে।
জরায়ুর নিচের অংশ যা জরায়ুকে যোনিপথ বা ‘ভ্যাজাইনা’র সঙ্গে যুক্ত রাখে, তাকে ‘সার্ভিক্স’ বলা হয়। আর এই অংশের কোষগুলোর অনিয়ন্ত্রিত অবক্ষয়ই হল জরায়ুর মুখে ক্যানসার।
আক্রান্ত ব্যক্তির প্রাথমিক অবস্থায় কোনও বাহ্যিক লক্ষণ প্রকাশ না পাওয়ায় অনেকেই একে সাধারণ হরমোনাল সমস্যা মনে করে অবহেলা করেন, যা বিপজ্জনক।
ক্যানসারের এই সুপ্ত বিষয় সময়মতো সনাক্ত না করলে, শরীরের অন্যান্য সংবেদনশীল অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে রোগীর জীবনকে স্থায়ীভাবে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়।
ঢাকার মিরপুরের আলোক হেলথকেয়ারের গাইনি, প্রসূতি এবং স্ত্রীরোগ ক্যানসার ও ল্যাপারোস্কোপিক সার্জন ডা. পবিনা আফরোজ পারভীন এই ক্যানসারের হরমোনাল কারণ, ঝুঁকি, উপসর্গ এবং অস্ত্রোপচারহীন আধুনিক চিকিৎসা বিকল্পসমূহ বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
হওয়ার কারণ
ডা. পবিনা আফরোজ পারভীন জানান, জরায়ু মুখের ক্যানসারের প্রায় ৯৯.৯ শতাংশ জন্যই দায়ী ‘হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস’ বা ‘এইচপিভি’। এই ভাইরাসের বহু প্রকারভেদ থাকলেও এইচপিভি ১৬ এবং ১৮ নম্বর স্ট্রেইন দুটিকে চিকিৎসাগতভাবে বেশি সংক্রামক ও ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
এছাড়া ৬, ১১, ৩১, ৩৩, ৪৫, ৫২ ও ৫৮ নম্বর স্ট্রেইনগুলোও কোষে সংক্রমণ ঘটাতে পারে।
সাধারণত নারী-পুরুষের অনিরাপদ যৌনমিলনের মাধ্যমে এই ক্ষতিকর ভাইরাস ছড়ায় এবং জরায়ু মুখের কোষের ডিএনএ পরিবর্তন করে ক্যানসারের দিকে ধাবিত করে।
সঠিক চিকিৎসাগত মূল্যায়ন ও ৩টি সম্ভাব্য ভিন্ন ধরন
স্ত্রীরোগ বিজ্ঞানের তথ্যানুসারে, অনিয়মিত রক্তক্ষরণ বা তলপেটে ব্যথা হলেই সেটিকে ক্যানসার বলে চূড়ান্ত রায় দেওয়া যায় না।
প্রকৃত রোগ নির্ণয়ের আগে নিচে উল্লেখিত ৩টি ভিন্ন সম্ভাবনার কথা মাথায় রাখা বাধ্যতামূলক।
জরায়ুর পলিপ বা ফাইব্রয়েড: জরায়ুর দেয়ালে বা জরায়ু মুখে হওয়া এক ধরনের ‘বেনাইন’ বা ‘অহিংস মাংসপিণ্ড’, যা ক্যানসার ছাড়াই সহবাসের পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও কোমর ব্যথা তৈরি করে।
পেলভিক ইনফ্লেমেটরি ডিজিজ (পিআইডি): নারী প্রজননতন্ত্রের মারাত্মক ব্যাক্টেরিয়াল ইনফেকশন বা সুক্ষ্ম প্রদাহ, যার ফলে তলপেটে তীব্র ব্যথা ও দুর্গন্ধযুক্ত সাদা স্রাব নির্গত হতে পারে।
অ্যান্ডোমেট্রিওসিস: হরমোনের ভারসাম্যের তারতম্যের কারণে জরায়ুর ভেতরের আবরণটি বাইরে বৃদ্ধি পাওয়া, যা মাসিকের সময় তীব্র যন্ত্রণাদায়ক কোমর ও পেটে ব্যথার সৃষ্টি করে।
ঝুঁকির কারণ ও ছদ্মবেশী উপসর্গ
ডা. পবিনা আফরোজ পারভীন, ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে একাধারে বেশ কয়েকটি প্রধান ঝুঁকির কারণ সনাক্ত করেছেন, যার সঙ্গে উপসর্গগুলোর মিল রয়েছে।
ঝুঁকির প্রধান কারণ: কম বয়সে বিয়ে হওয়া, অল্প বয়সে সন্তান ধারণ, ৩ বা তার অধিক বাচ্চা হওয়া, ধুমপান করা, দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং ৫ বছরের বেশি সময় ধরে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি বা পিল সেবন করা।
এছাড়া কোনো ধরনের ‘প্রিলিমিনারি স্ক্রিনিং’ না করা এবং একাধিক যৌনসঙ্গী থাকা ক্যানসারের দহন বাড়িয়ে দেয়।
উপসর্গ: অনিয়মিত মাসিক, সহবাসের সময় বা পরে রক্তক্ষরণ হওয়া, মেনোপজ বা স্থায়ীভাবে পিরিয়ড বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পুনরায় ব্লিডিং হওয়া, দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব যাওয়া, তলপেটে দীর্ঘমেয়াদী ব্যথা, ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ হওয়া এবং কোমর ব্যথা।
ক্যানসার নিরাময়ের ৪টি আধুনিক চিকিৎসা বিকল্প
জরায়ু মুখের ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়ে নির্ণয়ের জন্য ‘প্যাপ টেস্ট’, কোলপোস্কোপি ও বায়োপসি এবং ক্যানসার কতটুকু ছড়িয়েছে তা দেখতে ‘এমআরআই’ ও ‘পেট-সিটি স্ক্যান’ করার নিয়ম রয়েছে।
রোগ নির্ণয়ের পর চিকিৎসকেরা ৪টি প্রধান সমন্বিত চিকিৎসা বিকল্পের নির্দেশিকা দিয়ে থাকেন।
বিকল্প ১ (সার্জারি বা অস্ত্রোপচার): ক্যানসার যদি একদম প্রাথমিক ধাপে থাকে, তবে ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারির মাধ্যমে জরায়ুর আক্রান্ত অংশ কেটে ফেলে রোগীকে সুস্থ করা সম্ভব।
বিকল্প ২ (রেডিওথেরাপির বর্ম): উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এক্স-রে রশ্মির সাহায্যে ক্যানসার কোষের ভেতরের প্রজনন ক্ষমতা চিরতরে অবশ করে দেওয়া।
বিকল্প ৩ (কেমোথেরাপির কড়া ডোজ): বিশেষ রাসায়নিক ওষুধের কড়া ডোজ রক্তনালীর মাধ্যমে প্রয়োগ করে ক্যানসার কোষের বিস্তারকে পুরোপুরি স্তব্ধ করা।
বিকল্প ৪ (ইমিউনোথেরাপি ও টার্গেটেড থেরাপী): আধুনিক অনকোলজির লেটেস্ট নির্দেশিকা অনুযায়ী শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বাড়িয়ে, ক্যানসার কোষকে সুনির্দিষ্টভাবে ধ্বংস করার পদ্ধতি।
ক্যানসার প্রতিরোধে রক্ষাকবচ
ডা. পবিনা আফরোজ পারভীন বলেন, “সচেতনতা ও সঠিক ভ্যাক্সিনেইশন বা টিকার মাধ্যমে এই ক্যানসার প্রতিরোধ করা সম্ভব। এজন্য নির্দিষ্ট বয়সের মেয়েদের এইচপিভি ভ্যাক্সিনেইশন নেওয়া এবং বিবাহিত নারীদের প্রতি ৩ থেকে ৫ বছর পর পর নিয়মিত গাইনোকোলজিক্যাল স্ক্রিনিং করা বাধ্যতামূলক।”
নিরাপদ যৌন অভ্যাস, ধূমপান পুরোপুরি বর্জন এবং একটি সুষম জীবনধারা পালন করলে নারীদের জরায়ু সুস্থ রাখা সম্ভাব।
