চল্লিশোর্ধ্ব নারীদের রোগ হওয়ার আগেই প্রতিরোধ করা জরুরি
নিয়মিত পরীক্ষায় জটিল রোগে পড়ার আগেই সাবধান হওয়া যায়।
নারীরা ঘর-সংসার, চাকরি, সন্তান লালন-পালন— সবকিছু একসঙ্গে সামলান। এই ব্যস্ততায় নিজের স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়াতে প্রায়ই পিছিয়ে পড়েন তারা।
তবে চল্লিশ পার হওয়ার পর দেহে হরমোনের পরিবর্তন শুরু হয়, মেনোপজের দিকে এগোতে থাকে। এ সময় ইস্ট্রোজেন কমে যাওয়াতে হাড়ের ক্ষয়, হৃদরোগের ঝুঁকি, স্তন-জরায়ু ক্যান্সারের আশঙ্কা বাড়ে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক চিকিৎসক ডা. আফসানা হক নয়ন বলেন, “চল্লিশোর্ধ্ব নারীদের রোগ হওয়ার আগেই প্রতিরোধ করা জরুরি। নিয়মিত স্ক্রিনিং করে প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে চিকিৎসা সহজ হয়, জটিলতা কমে।”
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসপিএসটিএফ এবং মায়ো ক্লিনিকের নির্দেশনা অনুসারে এই বয়সে কিছু পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্তন ক্যান্সার স্ক্রিনিং: ম্যামোগ্রাম ও আলট্রাসাউন্ড
ইউএসপিএসটিএফ-এর সুপারিশ হল, ৪০ থেকে ৭৪ বছরের নারীদের প্রতি দুই বছর অন্তর ম্যামোগ্রাম করা। যদি পরিবারে স্তন ক্যান্সারের ইতিহাস থাকে বা ঝুঁকি বেশি, তাহলে বছরে একবার এবং আলট্রাসাউন্ডও করতে হতে পারে।
ম্যামোগ্রামে ছোট ছোট টিউমার ধরা পড়ে যা হাতে অনুভব হয় না।
জরায়ু-মুখ ক্যান্সার স্ক্রিনিং: প্যাপ স্মিয়ার ও এইচপিভি টেস্ট
জরায়ু-মুখ ক্যান্সার (সার্ভিকাল ক্যান্সার) প্রতিরোধযোগ্য। ৩০ থেকে ৬৫ বছরের নারীদের প্যাপ টেস্ট প্রতি তিন বছর অন্তর বা এইচপিভি কো-টেস্টিং প্রতি পাঁচ বছর অন্তর করা উচিত।
চল্লিশের পরও এই নিয়ম চলতে থাকে যতক্ষণ না ৬৫ বছরে পৌঁছে পূর্বের টেস্ট নেগেটিভ থাকে।
বাংলাদেশে এইচপিভি ভ্যাকসিন না নেওয়া নারীদের জন্য এই স্ক্রিনিং আরও জরুরি। প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে সহজ চিকিৎসায় সেরে যায়।
হাড়ের ঘনত্ব পরীক্ষা: বিএমডি বা ডেক্সা স্ক্যান
মেনোপজের পর ইস্ট্রোজেন কমে হাড় দুর্বল হয়— ‘অস্টিওপরোসিস’ বা হাড় ভঙ্গুর রোগ হয়। এতে ‘হিপ ফ্র্যাকচার’, মেরুদণ্ডের সমস্যা বাড়ে।
পঁয়ষট্টির পর সব নারীর বিএমডি করা উচিত। তবে ঝুঁকি থাকলে (যেমন- অকাল মেনোপজ, ধূমপান, কম ওজন, স্টেরয়েড খাওয়া) ৫০-৬০ বছর থেকেই শুরু করা যায়।
রক্তে ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি’ মাত্রা পরখ করুন। রোজ ১৫ থেকে ২০ মিনিট সূর্যের আলো, ক্যালসিয়াম-সমৃদ্ধ খাবার (দুধ, দই, ছোট মাছ) খাওয়া উপকারী।
হৃদযন্ত্র ও ডায়াবেটিস স্ক্রিনিং: রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, ব্লাড সুগার
মেনোপজের পর নারীর হৃদরোগের ঝুঁকি পুরুষের সমান হয়ে যায়। রক্তচাপ বছরে অন্তত একবার পরীক্ষা করাতে হবে। লিপিড প্রোফাইল (কোলেস্টেরল, ট্রাইগ্লিসারাইড) প্রতি চার থেকে ছয় বছর অন্তর পরীক্ষা করা হয়।
ডায়াবেটিসের জন্য ‘ফাস্টিং ব্লাড সুগার’ পরখ করা জরুরি।
ওজন বাড়া, কোমরের মেদ বাড়া— এগুলো হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ার সংকেত। নিয়মিত হাঁটা, সুষম খাবার গ্রহণের পাশাপাশি ধূমপানের অভ্যাস থাকলে ত্যাগ করতে হবে।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা
পেটের আলট্রাসাউন্ড: জরায়ু, ওভারি বা ডিম্বাশয়, লিভার বা যকৃৎ, কিডনি বা বৃক্ক পরীক্ষা করা।
থাইরয়েড ফাংশন টেস্ট: নারীদের ‘হাইপো-থাইরয়েডিজম’ বেশি হয়।
কোলন ক্যান্সার স্ক্রিনিং: ৪৫ থেক ৫০ থেকে ‘ফেকাল অকাল্ট ব্লাড টেস্ট’ বা কোলোনোস্কোপি।
চোখ, দাঁত, ত্বক পরীক্ষা: বয়সের সঙ্গে এগুলোরও যত্ন নিন।
যেভাবে শুরু করবেন
ডা. নয়ন বলেন, “প্রতি বছর একবার ফ্যামিলি ডাক্তার বা গাইনোকলজিস্টের কাছে যান। পরিবারের ইতিহাস বলুন। লাইফস্টাইল ঠিক রাখুন— সুষম খাবার, ব্যায়াম, সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুম, স্ট্রেস কমানোর চেষ্টা করুন।”
মেনোপজের লক্ষণ (গরম লাগা, মুড সুইং, ওজন বাড়া) দেখলে হরমোন থেরাপি নিয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলতে হবে।
আরও পড়ুন
