রাত জাগলে নারীদের হরমোনের ভারসাম্যে যে প্রভাব পড়ে
রাতা জাগা কারও জন্যই ভালো অভ্যাস না। তবে নারীদের ক্ষেত্রে ক্ষতিকর প্রভাব বেশি।
দীর্ঘদিন রাত জাগা এবং দিনের বেলা ঘুমানোর অভ্যাস, শরীরের স্বাভাবিক ছন্দ বা ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ ব্যাহত করতে পারে।
এর প্রভাব পড়তে পারে হরমোনের ভারসাম্য, মাসিক, প্রজনন ক্ষমতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর।
দীর্ঘদিন রাত জাগা এবং দিনের বেলা ঘুমানোর অভ্যাস, শরীরের স্বাভাবিক ছন্দ বা ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ ব্যাহত করতে পারে।
এর প্রভাব পড়তে পারে হরমোনের ভারসাম্য, মাসিক, প্রজনন ক্ষমতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর।
শরীরের স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত
মানবদেহ দিন-রাতের সঙ্গে মিল রেখে একটি নির্দিষ্ট ছন্দে কাজ করে। রাতে কাজ করা ও দিনের বেলা ঘুমানোর কারণে এই ছন্দে পরিবর্তন আসে।
এতে মেলাটোনিন, কর্টিসল, ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরনের মতো গুরুত্বপূর্ণ হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
রাতে দীর্ঘ সময় কৃত্রিম আলোর মধ্যে থাকলেও মেলাটোনিনের নিঃসরণ কমে যেতে পারে। ফলে ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দসহ শরীরের বিভিন্ন হরমোনের কার্যক্রমে পরিবর্তন আসতে পারে।
মাসিকের সমস্যা হতে পারে
যেসব নারী দীর্ঘদিন রাতের শিফটে কাজ করেন, বা রাত জাগেন তাদের মাসিকের অনিয়ম দেখা দিতে পারে। কারও মাসিক আগে বা পরে হতে পারে, কারও রক্তপাতের পরিমাণে পরিবর্তন আসতে পারে। কখনও সাময়িকভাবে মাসিক বন্ধও হয়ে যেতে পারে।
হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হলে আরও কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে। যেমন—
মাসিকের সময় বেশি ব্যথা
দীর্ঘদিন রক্তপাত হওয়া
ত্বকে ব্রণ বা কালচে দাগ
অস্বাভাবিক ওজন বাড়া বা কমা
দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি
মেজাজ খিটখিটে হওয়া বা হঠাৎ পরিবর্তন
যৌন আগ্রহ কমে যাওয়া
অনেক সময় এসব লক্ষণ ধীরে ধীরে দেখা দেয় বলে নারীরা গুরুত্ব দেন না।
প্রজনন ক্ষমতায় প্রভাব
নারীর প্রজনন হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমের সঙ্গে শরীরের জৈবিক ঘড়ির সম্পর্ক রয়েছে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে বা দীর্ঘদিন ঘুমের সময়সূচি অনিয়মিত থাকলে হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
ফলে ডিম্বস্ফোটনে সমস্যা হওয়ার পাশাপাশি, কিছু ক্ষেত্রে গর্ভধারণের সক্ষমতাও প্রভাবিত হতে পারে।
মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব
রাত জাগার অভ্যাস থাকলে, বা নিয়মিত রাত জেগে কাজ করলে ঘুমের সমস্যা, মানসিক চাপ ও মন খারাপের মতো সমস্যা বাড়তে পারে।
দিনের বেলা পর্যাপ্ত আলো না পাওয়া এবং ঘুমের স্বাভাবিক সময়সূচি নষ্ট হওয়ার কারণেও দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি ও অবসাদ দেখা দিতে পারে।
দীর্ঘদিন হরমোন ও ঘুমের ছন্দে ব্যাঘাত থাকলে বিপাকীয় সমস্যা, হৃদ্রোগ এবং ‘পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিসিওএস)’-এর মতো কিছু স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
রাতের শিফটে কাজ করলে সবারই হরমোনের সমস্যা হবে, এমন নয়। তবে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে তাদের, যারা—
বহু বছর ধরে রাতের শিফটে কাজ করছেন
নিয়মিত ৬–৭ ঘণ্টার কম ঘুমান
অনিয়মিত সময়ে খাবার খান
অতিরিক্ত মানসিক চাপের মধ্যে থাকেন
বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীরে স্বাভাবিক হরমোনের পরিবর্তনও ঘটে। তাই এ সময় দীর্ঘদিন রাতের শিফটে কাজ করলে ঘুম ও হরমোনের ওপর প্রভাব বেশি অনুভূত হতে পারে।
রাতের শিফটে কাজ করেও হরমোনের ভারসাম্য ঠিক রাখার উপায়
কাজের জন্য স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে কিছু নিয়ম পালন করা উপকারী।
পর্যাপ্ত ঘুম: প্রতিদিন ৭–৮ ঘণ্টা ঘুমের চেষ্টা করতে হবে। দিনের বেলা ঘুমাতে হলে ঘরটি শান্ত, অন্ধকার ও ঠান্ডা রাখতে হবে।
প্রাকৃতিক আলোতে থাকা: ঘুম থেকে ওঠার পর কিছু সময় প্রাকৃতিক আলোতে থাকলে, দেহের জৈবিক ঘড়ি ঠিক রাখতে সহায়তা করে।
পুষ্টিকর খাবার খাওয়া: খাবারে শাকসবজি, ফলমূল, ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডস সমৃদ্ধ খাবারসহ বিভিন্ন পুষ্টিকর খাবার রাখতে হবে দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায়। রাতে ফাস্টফুড, চা ও কফি এড়াতে হবে।
নিয়মিত ব্যায়াম করা: হাঁটা, সাঁতার বা যোগব্যায়ামের মতো নিয়মিত শরীরচর্চা মানসিক চাপ কমাতে এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
শরীরের পরিবর্তনকে গুরুত্ব দিন
মাসিক অনিয়মিত হওয়া, দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি, অতিরিক্ত ব্রণ বা চুল পড়ার মতো সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক হরমোনসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করতে বলতে পারেন।
রাতের শিফটে কাজ করা অনেকের জন্য পেশাগত প্রয়োজন। তাই কাজের পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং নিজের শরীরের পরিবর্তনের দিকে নজর রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক: পুষ্টিবিদ লিনা আকতার। রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার দিনাজপুর।
