Published : 01 Jun 2026, 05:18 PM
কারও অনুপস্থিতিতে তার ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা বা ‘গসিপ’ করাকে, সাধারণত একটি নেতিবাচক সামাজিক অভ্যাস হিসেবে দেখা হয়।
তবে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান ও মনস্তাত্ত্বিক গবেষণা বলছে, এই অভ্যাসের পেছনে রয়েছে গভীর জৈবিক ও বিবর্তনীয় কারণ।
শরীরে যে ধরনের হরমোনের খেলা চলে
অক্সিটোসিন হরমোনের বৃদ্ধি: ইতালির ইউনিভার্সিটি অব পাভিয়া-র একদল গবেষক ২২ জন নারীর ওপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখেন, সাধারণ আড্ডার তুলনায় পরচর্চা বা ‘গসিপ’ করার সময় নারীদের শরীরে অক্সিটোসিন হরমোনের নিঃসরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এই হরমোনকে বলা হয় ‘লাভ হরমোন’ বা ‘বন্ডিং হরমোন’।
এটি পারস্পরিক বিশ্বাস ও ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে সাহায্য করে।
ডোপামিন ক্ষরণ: মনস্তত্ত্ব-বিষয়ক ওয়েবসাইট মিডিয়াম ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে, মার্কিন আরচরণগত বিশেষজ্ঞ কারমেন কুপার বলেন, “গবেষণায় দেখা গেছে, অন্যের গোপন বা মুখরোচক তথ্য জানার সময় মস্তিষ্কে ডোপামিন নামক আনন্দদায়ক নিউরোট্রান্সমিটার নির্গত হয়, যা মানুষকে এক ধরনের সাময়িক তৃপ্তি বা ‘থ্রিল’ দেয়।”
কর্টিসল ও হৃদস্পন্দন পরিবর্তন: ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা দেখিয়েছেন, যখন মানুষ সমাজে কোনো অন্যায় বা নেতিবাচক আচরণ দেখে, তখন তার হৃদস্পন্দন এবং স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল বেড়ে যায়। তবে তথ্যটি যখন সে অন্য কারও সাথে পরচর্চার মাধ্যমে জানায়, তখন তার শরীর শান্ত হয় এবং হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক স্তরে নেমে আসে।
পরচর্চার সুবিধা নিয়ে গবেষণাও হয়েছে
অভ্যাসটা খারাপ। তারপরও গবেষকরা বেশি কয়েকটি উপকারিতা খুঁজে পেয়েছেন।
মানসিক চাপ ও ক্ষোভ মুক্তি: যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াতে অবস্থিত গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান ইউসি বার্কলে-র সমাজ-বিষয়ক মনস্তাত্ত্বিক রোব উইলার, তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, “অন্যের খারাপ আচরণ নিয়ে কথা বলা বা 'গসিপ' করা শরীরের জন্য এক ধরনের থেরাপির মতো কাজ করে, যা মানুষের ভেতরের হতাশা ও ক্ষোভ কমিয়ে দেয়।”
সামাজিক বন্ধন ও নিরাপত্তা: অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তন-বিষয়ক মনস্তাত্ত্বিক রবিন ডানবার, তার গবেষণায় দাবি করেন, আদিম যুগে মানুষ যেভাবে একে অপরের শরীর পরিষ্কার করে বন্ধন দৃঢ় করত, আধুনিক মানুষের ক্ষেত্রে ভাষা আবিষ্কারের পর ‘পরচর্চা’ সেই ‘সামাজিক আঠা’ হিসেবে কাজ করছে। এর মাধ্যমে সমাজে ‘কে’ বিশ্বাসী আর ‘কে’ প্রতারক তা চেনা যায়।
উদ্বেগ দূর করা: ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, সান ডিয়েগো-র সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, সামাজিক পরিবেশের অনিশ্চয়তা দূর করতে ও অন্যের অভিজ্ঞতা থেকে পরোক্ষভাবে শিক্ষা নিতে পরচর্চা ভূমিকা রাখে।
নেতিবাচক দিক
গবেষকদের মতে, পরচর্চা যদি বিদ্বেষমূলক বা ক্ষতিকর হয়, তবে হিতে বিপরীত হতে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী চাপ ও ‘ফাইট-অর-ফ্লাই রেসপন্স’: কেস্যাট ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা-বিষয়ক মার্কিন বিশেষজ্ঞ ড. ডেভিড হ্যানসকম সতর্ক করেছেন যে, “যখন আমরা অনবরত কারও নামে নেতিবাচক কথা বলি বা ক্ষোভ উগরে দিই, তখন শরীর সর্বদা ‘ফাইট-অর-ফ্লাই’ মেজাজে চলে যায়। ফলে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিন হরমোন অতিরিক্ত মাত্রায় নিঃসরিত হয়ে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। আর উদ্বেগ ও রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়।
মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ হ্রাস: ইউনিভার্সিটি অব পাভিয়া’র গবেষণায় দেখা গেছে, অনবরত নাটকীয়তা বা নেতিবাচক পরচর্চায় লিপ্ত থাকলে মস্তিষ্কের ‘অ্যামিগডালা’ অঞ্চল অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে, যা মানুষের আবেগীয় নিয়ন্ত্রণ ও মনোযোগের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
মানসিক বিষাক্ততা: সায়েন্টিফিকআমেরিকান ডটকম’য়ে প্রকাশিত মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয় যে- অতিরিক্ত পরচর্চা মানুষের মনে ঈর্ষা, পরশ্রীকাতরতা এবং এক ধরনের দীর্ঘস্থায়ী অসন্তুষ্টি তৈরি করে।
কর্মক্ষেত্রে নেতিবাচক পরনিন্দা কর্মীদের মনোবল ও কর্মক্ষমতা ধ্বংস করে।
যেভাবে সামঞ্জস্য রাখা যায়
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের করা গবেণায় উল্লেখ করা হয়, পরচর্চা পুরোপুরি বন্ধ করা অসম্ভব, কারণ এটি মানুষের স্বভাবজাত। তবে সুস্থ থাকার চাবিকাঠি হলো ‘রক্ষণাত্মক বা ইতিবাচক পরচর্চা’।
কাওকে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে বা সমাজকে সচেতন করার জন্য যখন তথ্য আদান প্রদান করা হয়, তখন সেটা শরীরের জন্য উপকারী। তবে কাউকে হেয় করা, মিথ্যা রটানো বা হিংসাত্মক উদ্দেশ্যে পরচর্চা করলে, উল্টো নিজের শরীরের হরমোনাল ভারসাম্য নষ্ট হয়। পাশাপাশি হৃদরোগ ও মানসিক অবসাদের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।
আরও পড়ুন