Published : 16 Jul 2025, 04:34 PM
চাপ, দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগে ভরা আধুনিক জীবনে একটু প্রশান্তি খোঁজার চেষ্টায় নানান উপায় খোঁজা হয়। সেই চেষ্টায় একটি সহজ কিন্তু কার্যকর পদ্ধতি হয়ে উঠছে ‘বক্স ব্রিদিং’ বা চার ধাপের নিঃশ্বাস অনুশীলন।
এটি একদিকে যেমন দেহকে চাপমুক্ত করে, অন্যদিকে মনকে ফিরিয়ে আনে বর্তমান মুহূর্তে।
বিশেষজ্ঞদের মতে- এই পদ্ধতি এতটাই কার্যকর যে শুধু ধ্যান বা যোগব্যায়ামে সীমাবদ্ধ নয়। এটি ব্যবহার করে চরম চাপেও মাথা ঠাণ্ডা রাখা যায়।
বক্স ব্রিদিং কী?
যার আরেক নাম ‘ফোর স্কয়ার ব্রিদিং’ বা ‘সামা বৃত্তি প্রণায়াম’। মূলত একটি চার ধাপের নিঃশ্বাস অনুশীলন।
প্রতিটি ধাপে চার গোনার সময় ধরে নিঃশ্বাস নেওয়া, ধরে রাখা, ছাড়ার পর আবার থেমে থাকা হয়।
অনলাইন নিঃশ্বাস প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ‘মাইন্ড ইউ ক্লাব’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রশিক্ষক সোফি বেল রিয়েলসিম্পল ডটকম-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেন, “বক্স ব্রিদিং হল এমন একটি পদ্ধতি যেখানে শ্বাস গ্রহণ, শ্বাসধারণ, শ্বাসত্যাগ এবং আবার থেমে থাকতে হয়। আর প্রতিটি ধাপ সমান সময় ধরে করতে হয়।”
এই চার ধাপের নিঃশ্বাস প্রক্রিয়া হল- ১. চার গোনায় শ্বাস নিন ২. চার গোনায় শ্বাস ধরে রাখুন ৩. চার গোনায় শ্বাস ছাড়ুন ৪. চার গোনায় থেমে থাকুন।
এভাবে বারবার চক্রাকারে অনুশীলন করলে শ্বাস-প্রশ্বাস ধীরে এবং গভীর হয়। আর মনোযোগও দৃঢ়ভাবে নিঃশ্বাসের ওপর কেন্দ্রীভূত থাকে।
বক্স ব্রিদিং-এর উপকারিতা
দেহের চাপপ্রতিক্রিয়া হ্রাস করে: যুক্তরাষ্ট্রের নিঃশ্বাস বিশেষজ্ঞ অ্যালি লেভিন একই প্রতিবেদনে বলেন, “বক্স ব্রিদিং ‘ফাইট-অর-ফ্লাইট’ অর্থাৎ বাঁচো কিংবা মরো- অবস্থা থেকে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরিয়ে আনে।”
যখন চাপ বা উদ্বেগে থাকা হয় তখন নিঃশ্বাস হয়ে পড়ে দ্রুত ও অগভীর। একে বলে ‘হাইপারভেন্টিলেইশন’, যা শরীরের কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা কমিয়ে দেয় এবং মাথা ঘোরাতে পারে।
‘বক্স ব্রিদিং’ এই ধরনের সমস্যাগুলো প্রতিরোধ করে।
এছাড়া, চাপের সময় হৃদস্পন্দন বেড়ে যায় এবং কর্টিসল ও অ্যাড্রিনালিন নামক স্ট্রেস হরমোন নিঃসৃত হয়। ধীরে নিঃশ্বাস নেওয়ার মাধ্যমে ‘প্যারাসিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম’ সক্রিয় হয়। যা দেহকে আবার শান্ত অবস্থায় ফিরিয়ে আনে।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেইশন’-এ প্রকাশিত একাধিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, ‘ডায়াফ্র্যাগমেটিক’ নিঃশ্বাস (বড় করে, গভীরভাবে ধীরে শ্বাস নিয়ে পেট ভর্তি করা) শরীরের ওপর চাপের প্রভাব কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
অনাকাঙ্ক্ষিত চিন্তার ঘূর্ণি থামায়: চিন্তার ঘূর্ণি বা অবিরাম দুশ্চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
সোফি বেল বলেন, “বক্স ব্রিদিং’ মনকে এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত করে, যা মানসিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনে ও মনোযোগ বাড়ায়।”
এটি মস্তিষ্ককে এমন একটি কাজে ব্যস্ত রাখে যার মাধ্যমে নেতিবাচক ভাবনার প্রতি আসক্তি কমে। নিয়মিত চর্চার ফলে নিজের চিন্তার গতিপথকে নিয়ন্ত্রণ করতে, মন ধীরে ধীরে প্রশিক্ষিত হয়ে ওঠে।”
বর্তমান মুহূর্তে মনোযোগ ফিরিয়ে আনে: উদ্বেগ অনেক সময় ভবিষ্যতের ভাবনা বা অতীতের অনুশোচনার ফল। ‘বক্স ব্রিদিং’ এমন এক অনুশীলন, যা মনকে ফিরিয়ে আনে বর্তমান মুহূর্তে।
সোফি বেল বলেন, “নিঃশ্বাসের ওপর মনোযোগ দিলে বর্তমানের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন। এই অভ্যাস নেতিবাচক চিন্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে শেখায়, যা দীর্ঘমেয়াদে চাপ প্রতিক্রিয়ার ধরন বদলে দিতে পারে।”
যেভাবে ‘বক্স ব্রিদিং’ শুরু করা যায়
এই অনুশীলন শুরু করতে দরকার শুধু কিছুটা মনোযোগ ও সময়। বিশেষ কোনো যন্ত্রপাতি বা জায়গার প্রয়োজন হয় না। যে কোনো সময়, যে কোনো জায়গায় এটি করা যায়।
অনুশীলনের ধাপগুলো হল-
প্রথমে এমন একটি জায়গায় বসতে বা দাঁড়াতে হবে যেখানে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ হয়। পিঠ সোজা, কাঁধ ঢিলে রাখতে হবে।
মনোযোগ দিতে হবে নিজের নিঃশ্বাসের দিকে।
ধীরে ধীরে চার গোনা পর্যন্ত শ্বাস নিতে শুরু করতে হবে। এই সময় অনুভব করতে হবে নিজের পেট ফুলে উঠছে।
চার গোনা পর্যন্ত শ্বাস ধরে রাখতে হবে। কেবল গোনার দিকেই মন দিতে হবে।
চার গোনায় ধীরে ধীরে শ্বাস ছাড়তে হবে।
আবার চার গোনায় থেমে থাকতে হবে।
এই চক্র কয়েকবার পুনরাবৃত্তি করলেই পূর্ণ হবে ‘বক্স ব্রিদিং’।
প্রথমদিকে এই অনুশীলন কিছুটা অস্বস্তিকর মনে হতে পারে। তবে নিয়মিত চর্চায় সহজ হয়ে যায়।
সোফি বেল পরামর্শ দেন, “যদি প্রথমে কঠিন লাগে, তাহলে গোনার সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া যায় বা অন্য সময় আবার চেষ্টা করা যায়।"
"আবার চাইলে এটি দৈনন্দিন ছোট ছোট অভ্যাসের সঙ্গেও জুড়ে দেওয়া ভালো বুদ্ধি। যেমন- পানি ফুটানোর সময় বা গোসলের জন্য অপেক্ষা করার সময়”- পরামর্শ দেন তিনি।
আরও পড়ুন