Published : 13 May 2026, 07:36 PM
অফিসে বসে আছেন। কাজ আছে, ডেডলাইন আছে। কিন্তু জানালার বাইরে তাকালেই মেঘলা আকাশ, হালকা বৃষ্টির শব্দ। মনে হচ্ছে চোখ দুটো কে যেন টেনে ধরছে। স্ক্রিনের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। বিছানার কথা মনে আসছে বারবার।
বৃষ্টির দিনে এই অনুভূতি প্রায় সবারই হয়। কেউ কেউ নিজেকে দোষ দেন— ‘আজকেও অলসতা করলাম।’
তবে বৃষ্টির দিনে কাজ করতে বসলে ঘুম আসার বিষয়টি কেবল অলসতা নয়, বরং একটি খাঁটি জৈবিক ও পরিবেশগত প্রক্রিয়া, তা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে প্রমাণিত হয়েছে।
সূর্যালোকের অভাব ও হরমোনের খেলা
যুক্তরাষ্ট্রের অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক’য়ের ‘বিহেইভিওরাল স্লিপ মেডিসিন’ বিভাগের পরিচালক ডা. মিশেল ড্রেরাপ ব্যাখ্যা দিয়েছেন, “দিনের বেলা সূর্যের আলো কম থাকার অর্থ হল শরীরে কম পরিমাণে 'সেরোটোনিন' তৈরি হওয়া। এই হরমোনের কাজ হল সতেজ রাখা। এর বিপরীতে শরীরে 'মেলাটোনিন' যা ঘুমের হরমোন নামে পরিচিত, সেটার উৎপাদন অনেক বেড়ে যায়। যে কারণে আমরা তীব্র ক্লান্তি ও ঘুম অনুভব করি।”
তিনি গবেষণা করে দেখিয়েছেন যে, দৈহিক ঘড়ি বা সার্কাডিয়ান রিদম সূর্যালোকের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। মেঘলা আকাশে যখন অন্ধকার আবহ তৈরি হয়, তখন ‘পিনিয়াল’ গ্রন্থি বিভ্রান্ত হয়ে দিনকেই রাত মনে করে এবং মেলাটোনিন হরমোন নিঃসরণ শুরু করে।
বৃষ্টির শব্দের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব, (পিংক নয়েজ)
‘ইন্টারন্যাশনাল স্লিপ ফাউন্ডেশন’সহ বিভিন্ন নিউরোলজিক্যাল গবেষণায় দেখা গেছে, বৃষ্টির একটানা টুপটাপ শব্দ হল আসলে- 'পিংক নয়েজ'।
কোনো কর্কশ বা আকস্মিক শব্দ শুনলে মস্তিষ্ক সতর্ক হয়ে যায়। তবে বৃষ্টির শব্দের মতো একটি নির্দিষ্ট ও ছন্দময় কম ‘ফ্রিকোয়েন্সির’ শব্দ শুনতে থাকলে মস্তিষ্ক এটিকে নিরাপদ সংকেত হিসেবে গ্রহণ করে। যা মস্তিষ্কের ‘আলফা’ তরঙ্গকে উদ্দীপিত করে মনকে শান্ত ও ধ্যানমগ্ন অবস্থায় নিয়ে যায়। ফলে কাজের মনোযোগ হারিয়ে ঘুম চলে আসে।
‘ইউনিভার্সিটি অব রচেস্টার’-এর ঘুম ল্যাবরেটরির একটি গবেষণায় ৪৩ জন ব্যক্তির ওপর ১০৫ রাত ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়। গবেষকরা আবহাওয়ার তথ্যের সাথে তুলনা করে দেখেন, যখন বায়ুমণ্ডলের চাপ বেশি থাকে (অর্থাৎ রোদ উজ্জ্বল আবহাওয়া) তখন মানুষ রাতে সবচেয়ে গভীর ও আরামের ঘুম ঘুমায়।
তবে বৃষ্টির রাতে স্বাভাবিকের চাইতে ঘুম কম গভীর হয়। ফলে পরদিন সকাল বা দুপুরে কাজ করতে বসলে শরীর আগের ক্লান্তি কাটাতে পুনরায় ঘুমের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
উচ্চ আর্দ্রতা ও ফুসফুসের অতিরিক্ত পরিশ্রম
আবহাওয়া বিজ্ঞান ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, বৃষ্টির সময় বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ অত্যধিক বেড়ে যায়, ফলে বায়ুচাপ কমে। আর বাতাসে আর্দ্রতা বৃদ্ধির কারণে নাইট্রোজেন এবং হাইড্রোজেনের পরিমাণ বাড়ে, আর অক্সিজেনের ঘনত্ব সামান্য কমে।
ফলে ফুসফুসকে বাতাস থেকে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন টেনে নিতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি শারীরিক পরিশ্রম করতে হয়।
শরীরের এই অতিরিক্ত শক্তি খরচের ক্লান্তি অবচেতনভাবেই ঝিমুনি ভাব এনে দেয়।
তাই বৃষ্টির দিনে ডেস্কে বসে বা কাজ করতে গিয়ে, হাই তোলা বা ঘুমিয়ে পড়া সম্পূর্ণ স্বাভাবিক শারীরিক প্রতিক্রিয়া।
ঘুম ঘুমভাব কাটানোর উপায়
বৃষ্টির দিনে কাজ করার সময় প্রাকৃতিক হরমোন ও আবহাওয়া জনিত কারণে যে ঘুম আসে, তা কাটিয়ে পুরোপুরি সতেজ এবং কর্মক্ষম থাকার কয়েকটি কৌশল রয়েছে।
আলোর ব্যবস্থা পরিবর্তন
যেহেতু মেঘলা দিনে সূর্যালোকের অভাবে শরীরে ঘুম পাড়ানি হরমোন 'মেলাটোনিন' বাড়ে, তাই ঘরের আলো উজ্জ্বল করতে হবে।
ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক পরামর্শ দেয়- ঘরের সাধারণ হলুদ আলো বন্ধ করে দিন। টেবিল ল্যাম্প বা ডেস্কে উজ্জ্বল সাদা আলো ব্যবহার করুন। তীব্র আলো চোখকে সংকেত দেবে যে এটি দিন। ফলে মস্তিষ্ক মেলাটোনিন তৈরি বন্ধ করে দেবে।
২০-২০-২০ নিয়ম এবং স্ট্রেচিং
একটানা বসে থাকলে শরীরে রক্ত চলাচল ধীর হয়ে যায়। আর অক্সিজেনের মাত্রা কমে ক্লান্তি বাড়ে।
তাই প্রতি ২০ মিনিট পর পর বসা থেকে উঠতে হবে। তারপর অন্তত ২০ ফুট দূরের কোনো জিনিসের দিকে ২০ সেকেন্ড তাকিয়ে থাকতে হবে।
এই সময়ে হাত-পা টানটান বা স্ট্রেচিং করা ও একটু হেঁটে আসা উপকারী। এটি শরীরে রক্ত সঞ্চালন বাড়িয়ে তাৎক্ষণিক সতেজতা দেয়।
ক্যাফিন নেওয়ার সঠিক সময় ও পানি পান
ঘুম তাড়াতে চা বা কফি দারুণ কাজ করে। তবে অতিরিক্ত গ্রহণ করা যাবে না।
বৃষ্টির আর্দ্রতায় শরীর দ্রুত ‘ডিহাইড্রেইটেড’ বা পানিশূন্য হতে পারে, যা ক্লান্তি আরও বাড়িয়ে দেয়। তাই কাজ শুরু করার ঠিক আগে এক কাপ ‘ব্ল্যাক কফি’ বা গ্রিন টি পান করা উপকারী।
তবে গুরুত্বপূর্ণ হল কাজের টেবিলের পাশে পানির বোতল রাখা এবং ঘন ঘন সাধারণ তাপমাত্রার বা ঠাণ্ডা পানি পান করা।
শীতল পানি সরাসরি স্নায়ুতন্ত্রকে সজাগ করে তোলে।
ঘরের তাপমাত্রা ও বাতাসের প্রবাহ ঠিক রাখা
বৃষ্টির শীতল আবহাওয়া শরীরকে আরামদায়ক পর্যায়ে নিয়ে যায়, যা ঘুমের জন্য আদর্শ।
তাই এসি বা ফ্যানের গতি এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে যাতে ঘর অতিরিক্ত ঠাণ্ডা না হয়ে কিছুটা স্বাভাবিক বা সামান্য উষ্ণ থাকে। সম্ভব হলে ঘরের জানালা কিছুটা খুলে দিতে হবে, যাতে সতেজ বাতাস চলাচল করতে পারে। এতে ঘরে অক্সিজেনের মাত্রা বাড়বে এবং ঝিমুনি ভাব কাটবে।
কঠিন কাজগুলো আগে করা
দুপুরের দিকে বা ভারী খাবার খাওয়ার পর বৃষ্টির দিনে ঘুমের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি হয়।
তাই দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, জটিল এবং চিন্তাভাবনার কাজগুলো সকালের দিকে বা কাজ শুরুর প্রথম দুই ঘণ্টার মধ্যে শেষ করে ফেলতে হবে। দুপুরের পরের সময়ের জন্য রাখতে হবে হালকা বা কম গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
আরও পড়ুন
রাতে ঠিকমতো ঘুমিয়েছেন, তবু সারাদিন ঘুম ঘুম- কারণটা কী?
টানা আট ঘণ্টা ঘুমাতে পারলে যা হয়