Published : 23 May 2026, 04:16 PM
ঈদুল আজহায় বাড়িতে একটা আলাদা উত্তেজনা থাকে। পশু কেনা, কোরবানির প্রস্তুতি, আত্মীয়স্বজনের আসা-যাওয়া, মাংস ভাগাভাগি। সব মিলিয়ে বড়রা এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েন যে, শিশুরা কখন কোথায় কী করছে, সেটা খেয়াল রাখা কঠিন হয়ে যায়।
আর ঠিক এই ফাঁকেই ঘটে যেতে পারে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক চিকিৎসক ডা. আফসানা হক নয়ন বলছেন, “ঈদের সময়ে শিশুদের জন্য আলাদা কিছু সতর্কতা মেনে চলা জরুরি। বড়দের অমনোযোগের মুহূর্তগুলোই শিশুর জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক।”
যাত্রাপথে শিশুর যত্ন
অনেক পরিবার ঈদে গ্রামের বাড়ি যাবেন। দীর্ঘ যাত্রায় শিশুদের নিয়ে কিছু বাড়তি প্রস্তুতি দরকার। সঙ্গে পর্যাপ্ত পানি এবং শুকনো খাবার রাখতে হবে। আবহাওয়ার কথা মাথায় রেখে ছাতা বা বর্ষাতিও ব্যাগে রাখা উচিত।
ডা. আফসানা হক নয়ন বলেন, “এই আবহাওয়ায় শিশুদের জন্য পাতলা, সুতি এবং বাতাস চলাচল করতে পারে এমন পোশাক সবচেয়ে ভালো। ভারী বা সিনথেটিক পোশাকে ঘাম জমে শিশু অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে।”
শিশুর গাড়িতে বমিও হতে পারে। এজন্য আগেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ সঙ্গে নিয়ে রাখা ভালো। পথে বমি হলে ঘাবড়াবেন না, গাড়ি থামিয়ে একটু বিশ্রাম দিন।
হাটে নিয়ে গেলে বাড়তি নজর
অনেক শিশু বাবা-মায়ের সঙ্গে পশুর হাটে যেতে চায়। তাদের এই আগ্রহ স্বাভাবিক। তবে হাটে ভিড় বেশি, পশু থাকে, সব মিলিয়ে পরিবেশটা শিশুর জন্য নিরাপদ নয়।
ডা. নয়ন পরামর্শ দেন, “হাটে গেলে শিশুর হাত শক্ত করে ধরে রাখুন। ভিড়ের মধ্যে একা ছেড়ে দেবেন না। পশুর কাছে যাওয়ার সময় দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। আর অবশ্যই শিশুকে মাস্ক পরিয়ে নিয়ে নেবেন। হাটে অনেক পশু একসঙ্গে থাকে, সেখান থেকে জীবাণু ছড়ানোর আশঙ্কাও বাড়ে।”
পশু কিনে আনার পর
পশু বাড়িতে আসলে শিশুরা সবচেয়ে বেশি উত্তেজিত হয়। ছুটে গিয়ে আদর করতে চায়, কাছে থাকতে চায়, খাওয়াতে চায়। এই আগ্রহ পুরোপুরি ঠেকানো যায় না, তবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
এই চিকিৎসক বলেন, “মনে রাখবেন, পশু বিরক্ত হলে বা ভয় পেলে আঘাত করতে পারে। শিশু বারবার কাছে গেলে পশু অস্থির হতেই পারে। তাই শিশুকে বোঝান, দূর থেকে দেখা যাবে। তবে বারবার কাছে যাওয়া ঠিক নয়।”
পশুর সঙ্গে সময় কাটানোর পর শিশুর হাত-পা ভালোভাবে সাবান দিয়ে ধুয়ে দিতে হবে। পশুর গা থেকে নানান ধরনের জীবাণু আসতে পারে, যা ছোটদের জন্য ক্ষতিকর হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
ধারালো জিনিস থেকে শিশুকে দূরে রাখা
কোরবানির আগে-পরে বাড়িতে ছুরি, কাঁচি, বঁটি-সহ নানান ধারালো জিনিস থাকে। এসবের ব্যবহারের পর সরিয়ে না রাখলে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
কোরবানির দিন এই বিষয়ে সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হয়। ধারালো জিনিস ব্যবহারের পর, শিশুর নাগালের বাইরে রাখতে হবে।
কোরবানির পরে পরিবেশ পরিষ্কার রাখা
ডা. নয়ন বলেন, “কোরবানির পরে রক্ত ও বর্জ্য দ্রুত পরিষ্কার করা জরুরি। বিশেষত এখন বৃষ্টি হতে পারে। রক্ত ও ময়লা বৃষ্টির পানিতে মিশে জীবাণু ছড়ানোর পরিবেশ তৈরি করে। এই দূষিত পানি বা কাদা শিশুর গায়ে লাগলে সেখান থেকে ডায়রিয়া, অন্ত্রের প্রদাহসহ নানান রোগ হতে পারে।”
কোরবানির পরপরই পরিষ্কার শুরু করতে হবে। শিশুকে ওই এলাকা থেকে দূরে রাখতে হবে, যতক্ষণ পরিষ্কার না হচ্ছে।
খাবারের রুটিন ভেঙে পড়লে বিপদ
ঈদে শিশুর খাওয়াদাওয়ার স্বাভাবিক সময়সূচি ভেঙে যায়। এই অনিয়মেই শিশু অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে।
তিন থেকে চার ঘণ্টা পর পর শিশুকে খাবার দিতে হবে। মাংসের পাশাপাশি ঘরে তৈরি সহজপাচ্য খাবার যেন থাকে। পর্যাপ্ত পানি খাওয়ানো নিশ্চিত করতে হবে।
ঈদের দিন সবচেয়ে বড় সতর্কতা
ডা. নয়ন বলেন, “কোরবানির দিন বাড়িতে আগুন জ্বলে, জলাশয়ের কাছে কাজ হয়, বৈদ্যুতিক তার ভেজা পরিবেশে বিপজ্জনক হতে পারে। শিশু যেন এসব জায়গায় না যায়, সেদিকে কড়া নজর রাখতে হবে।”
অচেনা জায়গায় বা অপরিচিত কারও সঙ্গে শিশু যেন কোথাও না যায়। ঈদের ভিড়ে এই বিপদটা অনেকে উপেক্ষা করেন।
সতর্কতা হিসেবে কাছের হাসপাতাল ও পুলিশ স্টেশনের নম্বর নিজের ফোনে সেভ রাখলে বিপদে দ্রুত সাহায্য চাওয়া সম্ভব হয়।
আরও পড়ুন
শিশুকে যেভাবে স্বাস্থ্যকর খাবারে অভ্যস্ত করা যায়