Published : 15 Dec 2025, 06:01 PM
খাবারের পর অল্প হাঁটা এটি যেন সহজ এবং খুব পরিচিত একটি অভ্যাস। তবে এই ছোট অভ্যাসটি যে শরীরের ভেতরে কতটা বড় ধরনের উপকার করতে পারে, সে সম্পর্কে অনেকেই জানেন না।
হাঁটা এমন একটি ব্যায়াম, যা যে কোনো বয়স, পরিবেশ ও শারীরিক সক্ষমতার মানুষ খুব সহজেই করতে পারে। আর খাবারের পর কয়েক মিনিটের হাঁটা হজম, রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি পর্যন্ত বিস্তৃত প্রভাব ফেলে।
দৈনিক জীবনযাপনেও এই অভ্যাস সহজে মানিয়ে নেওয়া যায়। ব্যস্ততার মাঝেও ১০ বা ১৫ মিনিট বের করে নেওয়া শুধু সম্ভবই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্য রক্ষায়ও কার্যকর।
রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক
খাবারের পর হাঁটা রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিক রাখতে দারুণ কাজ করে।
‘হেলথ এইড’ হাসপাতালের চিকিৎসক আফিফ বাসার বলেন, “খাবার গ্রহণের পর শরীরে স্বাভাবিকভাবেই শর্করার মাত্রা বাড়ে। তবে অল্প হাঁটা এই অতিরিক্ত শর্করাকে দ্রুত শক্তিতে রূপান্তর করতে সাহায্য করে। বিশেষ করে যাদের ডায়াবেটিস আছে বা ঝুঁকিতে আছেন তাদের জন্য খাবারের পর হাঁটা যেন এক ধরনের প্রাকৃতিক ওষুধের মতো কাজ করে।”
খাবারের পর ধীর গতিতে ১০ থেকে ১৫ মিনিট হাঁটলে অগ্ন্যাশয়কে অতিরিক্ত কাজ করতে হয় না। শরীর স্বাভাবিকভাবেই অতিরিক্ত গ্লুকোজ ব্যবহার করে ফেলতে পারে।
হজম প্রক্রিয়া আরও সক্রিয় হয়
খাবারের পর হাঁটার সঙ্গে হজম প্রক্রিয়ার গভীর সম্পর্ক আছে।
এই চিকিৎসকের ভাষায়, “শরীরকে সামান্য নড়াচড়া করানো মানেই হজমতন্ত্রকে সংকেত দেওয়া। ভারী খাবার, ভাজাপোড়া বা মসলাযুক্ত রান্না প্রায়ই পেটের অস্বস্তি, গ্যাস বা বদহজম ঘটায়। খাবারের পর খুব দ্রুত শুয়ে পড়া বা দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা এগুলোকে আরও বাড়িয়ে দেয়।”
“তবে খাওয়ার ১০ মিনিট পর হাঁটা শুরু করলে পাকস্থলী ও অন্ত্রে রক্ত প্রবাহ বেড়ে যায়। যার ফলে খাবার ভাঙা, পুষ্টি শোষণ ও বর্জ্য নির্গমনের প্রক্রিয়া সহজ হয়। হাঁটার ফলে পেট ফেঁপে থাকা, অম্বল বা গ্যাসের সমস্যা কমে।”- বলেন ডা. বাসার।
রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি পায়
“দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা, যেমন- কর্মজীবী মানুষের অফিস ডেস্কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকা রক্ত সঞ্চালন কমিয়ে দেয়। ফলে পায়ের নিচে ভারী ভাব, জড়তা, এমনকি রক্তপ্রবাহ সংক্রান্ত সমস্যার মতো ঝুঁকি তৈরি হতে পার”- বলেন এই বিশেষজ্ঞ।
খাবারের পর হালকা হাঁটা রক্তকে শরীরের প্রতিটি অংশে সমানভাবে পৌঁছে দিতে সাহায্য করে। এটি শুধু পেশিতে অক্সিজেন সরবরাহ বাড়ায় না, রক্তনালীগুলোর স্বাভাবিক কার্যকারিতাও বজায় রাখে।
অনেকেই দুপুরের খাবারের পর অফিসে বসেই কাজ চালিয়ে যান। অথচ এই সময়টায় পাঁচ মিনিট সিঁড়ি ব্যবহার করা কিংবা অফিসের বারান্দায় কিছুক্ষণ ধীরগতির হাঁটা স্বাস্থ্য রক্ষায় প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখতে পারে।
রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে
খাবারের পর হাঁটা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর। হাঁটার ফলে রক্ত শরীরজুড়ে সঠিকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, হৃদযন্ত্র কম চাপ নিয়ে রক্ত সঞ্চালন করতে পারে।
অনেকেই খাবারের পর ভারী হয়ে যান, যা শরীরে রক্তের প্রবাহকে ধীর করে। এটি হৃদযন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে।
খাবারের পর হাঁটা এই চাপটাকে কমিয়ে দেয়। নিয়মিত হাঁটলে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকিও কমে।
মেটাবলিজম বৃদ্ধি পায়
শরীরে শক্তি খরচের হার অর্থাৎ ‘মেটাবলিজম’ বাড়াতে খাবারের পর হাঁটা ভালো অভ্যাস।
খাবারের পর নড়াচড়া করলে শরীরের জমে থাকা অতিরিক্ত গ্লুকোজ পেশিতে শক্তিতে পরিণত হয়। ফলে চর্বি জমার প্রবণতা কমে।
‘মেটাবলিজম’ বাড়লে ক্যালরি পোড়ার হারও বাড়ে, যা ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। বিশেষ করে পেটের চারপাশে অবাঞ্ছিত চর্বি কমাতে খাবারের পর নিয়মিত হাঁটা অত্যন্ত কার্যকর।
অনেকেই রাতের খাবার খেতে দেরি করে ফেলেন আবার খাওয়ার পরই ঘুমিয়ে পড়েন যা ওজন বাড়ানোর প্রধান কারণগুলোর একটি।
তাই খাওয়ার পর ১৫ মিনিট হাঁটাকে অভ্যাস করা ভালো।
ঘুমের মান ভালো করে
অল্প হাঁটাও শরীরকে আরাম দেয়, মনকে শান্ত করে এবং ঘুমের প্রস্তুতি তৈরি করে। খাবারের পর রক্ত সঞ্চালন সক্রিয় থাকায় শরীরের তন্দ্রাভাব দূর হয়, পরে ঘুম আসা সহজ হয়।
যারা রাতে অস্থিরতা, টেনশন বা হালকা অনিদ্রায় ভোগেন, তাদের জন্য খাবারের পর ধীরগতির হাঁটা হতে পারে প্রাকৃতিক সমাধান।
মানসিক স্বাস্থ্য ও মনোভাব উন্নত করে
মানসিক সুস্থতা, এখন শারীরিক সুস্থতার মতোই গুরুত্বপূর্ণ।
হাঁটাহাঁটি প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে বিষণ্নতার ঝুঁকি কমাতে পারে বলে মত দেন- মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নাদিয়া নাসরিন ।
খাবারের পর হাঁটা মনকে সতেজ করে, উদ্বেগ কমায় এবং মস্তিষ্কে ভালো লাগার হরমোন নিঃসরণ বাড়ায়।
ব্যস্ত নগরজীবনে প্রতিদিনের চাপ সামলাতে খাবারের পর ১০ থেকে ১৫ মিনিট হাঁটা মানসিক ভারসাম্য রাখতে সাহায্য করে।
আরও পড়ুন
নৈশভোজের পরে হাঁটার ৩ উপকারিতা