Published : 16 Jul 2026, 12:37 AM
ইরানের বন্দরগুলোতে মঙ্গলবার বিকালে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে নৌ-অবরোধ কার্যকর করেছে। তবে ইরান তা উপেক্ষা করার ছক কষে যুক্তরাষ্ট্রকে বড় পরীক্ষায় ফেলার প্রস্তুতি শুরু করেছে।
নৌ অবরোধ কার্যকরের আগে থেকেই মার্কিন সামরিক বাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে এবং সমুদ্রে নজরদারি এড়ানোর জন্য ইরান অবরোধ-ভেদী জাহাজের ‘ছায়া নৌবহর’ (শ্যাডো ফ্লিট) প্রস্তুত করেছে।
সমুদ্র নিরাপত্তাবিষয়ক তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘উইন্ডওয়ার্ড ইন্টেলিজেন্স’-এর তথ্যানুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে চলাচল করা ইরানের ২৩টি জাহাজ জালিয়াতি করে অন্য দেশের পতাকা ব্যবহার করছে, সম্প্রতি তাদের ট্রান্সপন্ডার (যোগাযোগ যন্ত্র) বন্ধ করে দিয়েছে বা নিজেদের গতিবিধি গোপন করার চেষ্টা করছে।
নৌ বাণিজ্য খাতে পরিচিত ‘ডার্ক ভেসেল’ (পরিচয় গোপনকারী জাহাজ) বা ‘শ্যাডো ফ্লিট’ হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে এসব জাহাজকে।
‘পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকস’-এর সিনিয়র ফেলো এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাবেক উপ-পরিচালক আদনান মাজারেই উল্লেখ করেছেন যে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দেওয়ার ক্ষেত্রে ইরানের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
বছরের পর বছর ধরে ইরান ছায়া কোম্পানির জটিল নেটওয়ার্ক, গোপনে জ্বালানি তেল বিনিময় এবং সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের ওপর নির্ভর করে আসছে। এই ছায়া বহরের জাহাজগুলো মূলত নিজেদের পরিচয় লুকিয়ে বেশির ভাগ তেল চীনে বিক্রি করে থাকে বলে জানান মাজারেই।
উদাহরণস্বরূপ, উইন্ডওয়ার্ড ইন্টেলিজেন্সের ট্র্যাক করা একটি ইরানি ট্যাংকার বেশ ঘোরানো পথ ধরে যাত্রা করছে। সেটি ইরানের প্রধান তেল কেন্দ্র 'খার্ক দ্বীপ' থেকে অপরিশোধিত তেল বোঝাই করে ইরাকের 'বসরা অয়েল টার্মিনাল' হয়ে চীনের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে।
উইন্ডওয়ার্ড জানিয়েছে, তেলের উৎস লুকিয়ে রাখার জন্য ইরান সাধারণত এ ধরনের কৌশলই ব্যবহার করে থাকে।
জাহাজ ও পণ্য ট্র্যাকিং সেবা ‘ভোর্টেক্সা’র তথ্য অনুযায়ী, উইন্ডওয়ার্ডের চিহ্নিত করা ২৩টি সন্দেহজনক জাহাজের মধ্যে ১০টিতে তেল বা পণ্য রয়েছে, বাকি ১৩টি বর্তমানে খালি।
সম্প্রতি বাতিল হওয়া ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ‘সমঝোতা স্মারক’-এর অংশ হিসেবে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানি তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছিলেন। তবে নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পরও ইরান তাদের ছায়া নৌবহর ব্যবহার করে তেল রপ্তানি অব্যাহত রেখেছিল।
‘ট্যাংকার ট্র্যাকার্স’-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত জুন মাসে ইরান প্রায় ৫ কোটি ব্যারেল এবং গত সপ্তাহে মাত্র এক দিনেই ১ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করেছে।
তিন সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চুক্তির সময় হরমুজ প্রণালি দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া এই জাহাজগুলোর অনেকগুলোর ওপরই এখন পুনরায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
উইন্ডওয়ার্ড জানিয়েছে, এগুলোর মধ্যে ৭টি বিশাল তেল ট্যাংকার বর্তমানে ভারত মহাসাগরে অপরিশোধিত তেল বোঝাই অবস্থায় কোনও আগ্রহী ক্রেতার অপেক্ষায় নোঙর করে আছে।
এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে জুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলা প্রথম মার্কিন নৌ-অবরোধটি হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরানের আমদানি-রপ্তানি সীমিত করতে বেশ সফল হয়েছিল, যদিও তা পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি।
‘ইউএস এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ (ইআইএ)-এর মতে, ইরান তার রাজস্ব আয়ের প্রায় ৫০ শতাংশই তেল বিক্রি থেকে পায়।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও চীন ইরানের সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা। কারণ, ইআইএ-এর তথ্য অনুযায়ী তারা ইরানের প্রায় ৮০ শতাংশ তেল আমদানি করে।
আইএমএফ এর সাবেক উপপরিচালক আদনান মাজারেই জানান, এই নৌ অবরোধ ইরানের বিশাল মূল্যস্ফীতিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
গত ১২ মাসে দেশটিতে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৫০ শতাংশ, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্বোচ্চ। আর এপ্রিল মাসে অবরোধ শুরু হওয়ার পর তা আরও লাফিয়ে বাড়ে।
বর্তমানে দেশটিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ইরানের মোট বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশই পরিচালিত হয় পারস্য উপসাগরের মাধ্যমে।