Published : 29 Jun 2026, 01:20 PM
সুস্থ ও দীর্ঘ জীবন পাওয়ার জন্য মানুষ কত কিছুই না করে। ঠান্ডা পানিতে ডুব দেওয়া, ‘গ্রিন পাউডার’ খাওয়া কিংবা দামী ফিটনেস ট্র্যাকার ব্যবহার করে শরীরের গতিবিধি মাপা— এরকম কৌশলের কোনো শেষ নেই।
তবে সুস্থ দীর্ঘায়ু পাওয়ার এই আধুনিক ইঁদুরদৌড়ে অনেক সময় খুব সাধারণ তবে শক্তিশালী কিছু অভ্যাসকে এড়িয়ে যাওয়া হয়। এমনই একটি অবহেলিত অথচ কার্যকর অভ্যাস হল ডেন্টাল ফ্লস বা সুতো দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করা।
চিকিৎসা গবেষকেরা বলছেন, প্রতিদিন রাতে মাত্র এক টুকর সুতো দিয়ে দাঁতের কোণা পরিষ্কার করার অভ্যাস কেবল হাসিকে সুন্দর ও দাগহীন রাখবে না, বরং এটি হৃদযন্ত্র এবং মস্তিষ্ককেও সুরক্ষিত রাখবে।
যে কারণে শুধু ব্রাশ করাই যথেষ্ট নয়
মুখের যত্নে সাধারণত দিনে দুবার ব্রাশ করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
তবে মার্কিন দন্ত-চিকিৎসক এবং গবেষক ডা. কামি হস সেল্ফ ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেন, আমরা যখন ব্রাশ করি, তখন তা দাঁতের মাত্র ৬০ শতাংশ উপরিভাগ পরিষ্কার করতে পারে।”
‘ইফ ইওর মাউথ কুড টক’ বইয়ের এই লেখক আরও বলেন, “মানে হল, যদি ফ্লসিং না করেন, তবে দিনের পর দিন মুখের প্রায় অর্ধেক অংশ সম্পূর্ণ নোংরা ও অপিরষ্কার থেকে যাচ্ছে!”
একই প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের বোর্ড-সার্টিফাইড পিরিওডনটিস্ট ডা. রিচার্ড নেজাত এই বিষয়ে যোগ করে বলেন, “দাঁতের মধ্যবর্তী যে ফাঁকা জায়গাগুলোতে ব্রাশ পৌঁছাতে পারে না, ফ্লসিং মূলত সেখানে জমে থাকা ব্যাকটেরিয়ার আস্তরণকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। ফলে মাড়ির রোগ বা ‘পায়োরিয়া’ ধারে কাছে ঘেঁষতে পারে না।
এক টুকরা সুতা ও দীর্ঘায়ুর বৈজ্ঞানিক সংযোগ
মুখের মাড়ির কোষগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং রক্তনালীর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে মাড়িতে জমে থাকা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া খুব সহজেই রক্তপ্রবাহে মিশে যাওয়ার সুযোগ পায়।
পাঁচ হাজারেরও বেশি বয়স্ক মানুষের ওপর করা, যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে অবস্থিত সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘কেক স্কুল অব মেডিসিন’য়ের গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত প্রতিদিন ফ্লসিং করেন না, তাদের অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি প্রতিদিন ফ্লসিং করা ব্যক্তিদের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়ে যায়!
যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘায়ু বিশেষজ্ঞ ডা. জেনিফার টিমনস ব্যাখ্যা করেন, “মুখের ভেতর ‘পোর্ফাইরোমোনাস জিঞ্জিভালিস’ নামের এক ধরনের মারাত্মক ব্যাকটেরিয়া জন্ম নেয়, যা মাড়ির রোগ তৈরি করে।”
এই ব্যাকটেরিয়া রক্তনালীতে প্রবেশ করে রক্ত জমাট বাঁধাতে এবং প্রদাহ তৈরি করতে পারে, যা হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
এমনকি আলঝাইমার’স বা ডিমেনশা স্মৃতিভ্রম) আক্রান্ত রোগীদের মস্তিষ্কের টিস্যুতেও এই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
ফ্লসিং করার সঠিক নিয়ম
এই দন্ত চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, ফ্লসিং করার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় মেনে চলা জরুরি।
সকাল বনাম রাত: ডা. কামি হস বলেন, “সকালে ব্রাশ করার চেয়ে রাতে ঘুমানোর আগে ফ্লসিং করা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাতে যখন মুখ ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা বন্ধ থাকে, তখন ব্যাকটেরিয়া দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে।”
পদ্ধতি: সুতোটিকে দুই আঙুলে পেঁচিয়ে ইংরেজি ‘সি’ অক্ষরের মতো বাঁকিয়ে প্রতিটি দাঁতের গোড়ায় আলতো করে ওপর-নিচ করে ঘষতে হবে।
পানির ‘ফ্লাশার’ বনাম সাধারণ সুতা: ‘ওয়াটার ফ্লাশার’ বা প্লাস্টিকের পিকের চেয়ে সাধারণ ডেন্টাল ফ্লসিং সুতা দাঁতের খাঁজে নিখুঁতভাবে কাজ করে।
ফ্লসিং হয়ত হৃদযন্ত্র ভালো রাখতে বা স্ট্রোক থেকে দূরে রাখতে কোনো জাদুকরী একক নিরাময় নয়, তবে এটি প্রতিদিনের সবচেয়ে সহজ ও সস্তা একটি জীবনযাত্রার অভ্যাস, যা পুরো শরীরকে ভেতর থেকে সুস্থ রাখতে বড় ভূমিকা পালন করে।
তাই টুথব্রাশের পাশাপাশি ডেন্টাল ফ্লস ব্যবহারের অভ্যাস শুরু করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
আরও পড়ুন