Published : 21 Sep 2025, 06:58 PM
মানুষ কখনও কখনও জিনিসপত্র জমিয়ে রাখে। ভবিষ্যতে কাজে লাগবে ভেবে, অথবা ফেলে দিতে কষ্ট হয় বলে অনেকেই করেন এই কাজ।
তবে এই অভ্যাস নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে, সেটা হয়ে ওঠে মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুতর সমস্যা; যাকে বলা হয় ‘হোর্ডিং ডিজঅর্ডার’।
২০১৮ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটিকে মানসিক স্বাস্থ্যজনিত ব্যাধি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এর আগেই ‘আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন’ তাদের মানসিক রোগের নির্দেশিকায় এই সমস্যার নাম অন্তর্ভুক্ত করেছিল।
এই ব্যাধির শিকার মানুষরা ঘরে অকারণে জিনিসপত্র জমিয়ে রাখেন। পোশাক, বই, খেলনা, গৃহস্থালির সরঞ্জাম যা-ই হোক না কেন, তাদের কাছে প্রতিটি জিনিস মনে হয় দরকারী।
ফেলে দিতে না পারার মানসিক সংকট ধীরে ধীরে তাদের ঘরকে অগোছালো করে তোলে এবং জীবনযাত্রায় চরম অস্বস্তি ও ঝুঁকি তৈরি করে।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা: জিনিসের ভিড়ে আটকে যাওয়া জীবন
৫৩ বছর বয়সি মার্কিন নাগরিক কিম প্রথমে বুঝতেই পারেননি তার অভ্যাস কতটা ভয়াবহ হতে পারে। তিনি গ্যারেজ সেলের শেষদিকে গিয়ে বিনা মূল্যে পড়ে থাকা জিনিসপত্র গাড়িতে বোঝাই করে আনতেন। পরিবার বা আত্মীয়রা যখন তাকে অপ্রয়োজনীয় জিনিস রাখতে বলত, তিনি সেগুলোও জমিয়ে রাখতেন।
সিএনএন ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে কিম বলেন, “প্রথমে শোবার ঘরের চারপাশে জিনিসপত্র রাখা শুরু হলেও ধীরে ধীরে বসার রুম ও বারান্দা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। অবশেষে যখন ঘরের ভেতরে চলাফেরার পথ সরু হয়ে বিপজ্জনক হয়ে উঠল, তখন উপলব্ধি করলাম এটি কেবল শখ নয়, এটি একটি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা।”
হোর্ডিং আসলে কী?
বিশেষজ্ঞরা বলেন, সাধারণ জিনিস সংগ্রহের সঙ্গে হোর্ডিংয়ের পার্থক্য অনেক।
যুক্তরাজ্যের ‘নর্থামব্রিয়া বিশ্ববিদ্যাল’য়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং ‘হোর্ডিং রিসার্চ’ গ্রুপের পরিচালক ডা. নিক নেভ সিএনএন ডটকম-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেন, “ইতিহাসজুড়ে দেখা যায়- মানুষ জিনিসপত্র সংগ্রহ করেছে। সংগ্রহ করা মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। তবে যখন এর পেছনে গভীর মানসিক আঘাত বা ট্রমার ভূমিকা থাকে, তখন এটি হোর্ডিং ডিজঅর্ডারে পরিণত হয়।”
তার মতে, "শৈশবে নির্যাতন, অবহেলা, বিশৃঙ্খল পরিবার বা অনাথ অবস্থার মতো ট্রমা পরবর্তী জীবনে এ ধরনের প্রবণতা তৈরি করতে পারে।"
ট্রমা ও জমিয়ে রাখার সম্পর্ক
কিমের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, হোর্ডিংয়ের সঙ্গে ট্রমা গভীরভাবে জড়িত। এক পর্যায়ে তিনি একাধিক কঠিন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন— অপমানজনক সম্পর্ক, বন্ধুর মৃত্যু এবং গুরুতর রোগ নির্ণয়। তখন থেকেই তার জিনিস জমিয়ে রাখার প্রবণতা বেড়ে যায়।
ডা. নেভ ব্যাখ্যা করেন, “প্রথমে এটি একটি মোকাবিলা করার কৌশল হিসেবে কাজ করে। তবে দ্রুত সেটা আসক্তিতে পরিণত হয়। শুধু জিনিস সরিয়ে ফেললেই সমাধান হয় না, কারণ সমস্যার মূল কারণ রয়ে যায় অমীমাংসিত।”
ভাড়া বাসায় সংকট
এই সমস্যায় আক্রান্ত ভাড়াটিয়াদের নিয়ে কাজ করছেন যুক্তরাজ্যের হ্যাদার ম্যাট্যুজো, যিনি ‘ক্লাউডস এন্ড’ নামের একটি সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা।
তিনি বলেন, “যদি ভাড়া বাসায় থাকেন, বাড়িওয়ালা আদালতে গিয়ে ঘর খালি করার আদেশ আনতে পারে। এটি ভুক্তভোগীদের মানসিক অবস্থাকে আরও খারাপ করে তোলে।”
মহামারির সময় ‘হোর্ডিং’ বেড়ে যাওয়ার প্রমাণও তিনি পেয়েছেন।
“সারা বিশ্ব তখন হোয়ার্ড করছিল, যেন সব শেষ হয়ে যাবে। যারা আগে থেকেই উদ্বিগ্ন ছিলেন, তাদের জন্য পরিস্থিতি ছিল আরও ভয়ানক”- বলেন হ্যাদর।
চিকিৎসা ও নতুন উদ্যোগ
যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডা. ক্যারোলিন রদ্রিগেজ দীর্ঘদিন ধরে ‘হোর্ডিং ডিজঅর্ডার’ নিয়ে গবেষণা করছেন।
তিনি বর্তমানে ‘ভার্চুয়াল রিয়ালিটি’ প্রযুক্তির মাধ্যমে চিকিৎসার একটি উদ্যোগ চালাচ্ছেন।
এই প্রোগ্রামে রোগীরা তাদের সবচেয়ে অগোছালো ঘরের ছবি তুলে জমা দেন। পরে সেই ঘর ও জিনিসগুলোর ভার্চুয়াল সংস্করণ তৈরি করা হয়।
অংশগ্রহণকারীরা ভিআর হেডসেট ব্যবহার করে ঘুরে বেড়ান এবং জিনিস ফেলার অনুশীলন করেন।
ডা. রদ্রিগেজ বলেন, “বাস্তবে জিনিস ফেলা অনেক সময় তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে ওঠে। ভার্চুয়াল পরিবেশে অনুশীলন করলে তারা ধীরে ধীরে মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে পারেন।”
বোঝাপড়া ও সহমর্মিতা প্রয়োজন
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ‘হোর্ডিং’য়ে আক্রান্তদের অনেকেই আসলে ভালো কিছু করার উদ্দেশ্যে জিনিস জমিয়ে রাখেন। তাদের উদ্দেশ্য খারাপ নয়, বরং ভেতরের অশান্তি সামাল দেওয়ার চেষ্টা।
এই অসুখের ভোগা লি শুয়ের বলেন, “মানুষ ভাবে তারা পরিবারের চেয়ে জিনিসকে বেশি ভালোবাসে। আসলে তারা ভালো মানুষ হওয়ার চেষ্টা করে। তাদের প্রয়োজন সহায়তা, বোঝাপড়া এবং সমাজের ইতিবাচক মনোভাব।”
আরও পড়ুন