Published : 18 Mar 2026, 04:36 PM
স্থূলতা বা ‘ওবেসিটি’ আর অতিরিক্ত ওজন এখন বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসংকট হিসেবে দেখা হয়।
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুসারে, প্রতি আট জনে একজন স্থূলতার সমস্যায় ভুগছেন।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ফারজানা রহমান দিনা বলেন, “স্থূলতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের মধ্যে দ্বিমুখী সম্পর্ক রয়েছে। একদিকে মানসিক চাপ, বিষণ্নতা বা উদ্বেগ স্থূলতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়; অন্যদিকে স্থূলতা নিজেই বিভিন্ন মানসিক অস্বস্তি ও রোগের জন্ম দেয়।”
এটি একটি দুষ্টচক্র, যা ভাঙতে শরীর ও মন— দুটোকেই একসঙ্গে সুস্থ করতে হয়।
বিষণ্নতা ও স্থূলতার চক্র
স্থূল ব্যক্তিদের মধ্যে বিষণ্নতা সবচেয়ে সাধারণ মানসিক সমস্যা। অতিরিক্ত ওজনের কারণে আত্মসম্মান কমে যায়। সমাজের সৌন্দর্যের মানদণ্ডে নিজেকে অযোগ্য মনে হয়। অনেকে নিজের শরীর নিয়ে লজ্জিত বোধ করেন।
ডা. দিন বলেন, “অনেকে এই কারণে সামাজিক অনুষ্ঠানে যেতে চান না, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে মিশতে অস্বস্তি পান। ফলে একাকিত্ব বাড়ে, মনমরা ভাব তৈরি হয়।”
এই অবস্থায় অনেকে আরও বেশি করে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের দিকে ঝুঁকে পড়েন— চকলেট, আইসক্রিম, ফাস্টফুড—যা ওজন আরও বাড়ায়। এভাবে একটা দুষ্টচক্র তৈরি হয়।
উদ্বেগ ও সামাজিক চাপ
স্থূল ব্যক্তিরা প্রায়ই সমাজের সৌন্দর্যের মানদণ্ডে নিজেদের অযোগ্য মনে করেন। কাজের জায়গায়, স্কুল-কলেজে বা পারিবারিক পরিবেশে উপহাস, কটূক্তি বা নেতিবাচক মন্তব্যের শিকার হন। এতে সামাজিক উদ্বেগ বাড়ে।
অনেকে জনসমক্ষে যেতে বা কথা বলতে ভয় পান। আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন।
দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ শরীরে ‘স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল’ বৃদ্ধি করে। যা ক্ষুধা বাড়ায়, বিশেষ করে চিনি ও চর্বিযুক্ত খাবারের প্রতি আকর্ষণ তৈরি করে। ফলে ওজন আরও বেড়ে যায়।
‘ইমোশনাল ইটিং’ ও ‘বিঞ্জ ইটিং’
স্থূলতার সঙ্গে ‘ইমোশনাল ইটিং’ ও ‘বিঞ্জ ইটিং ডিজঅর্ডার’ গভীরভাবে জড়িত।
মানসিক চাপ, দুঃখ, একাকিত্ব বা রাগের সময় অনেকে খাবারকে আশ্রয় করেন। একসঙ্গে অনেক বেশি খেয়ে ফেলেন। খাওয়ার পর অপরাধবোধ হয়।
“এই অপরাধবোধ আবার আরও খাওয়ার দিকে ঠেলে দেয়। এভাবে একটা চক্র তৈরি হয়” – বলেন ডা. দিনা।
অনেক সময় এই আচরণগত সমস্যা মানসিক রোগের লক্ষণ হয়ে দাঁড়ায়।
আত্মসম্মান ও ‘বডি ইমেজ’
স্থূলতা শরীরের চেহারা ও আকারে পরিবর্তন আনে। বিশেষত তরুণী ও কিশোরীদের মধ্যে দেহ-ভাবনা বিকৃতি (বডি ডিসমরফিক ডিজঅর্ডার) দেখা যায়। নিজেকে অসুন্দর মনে হয়। আত্মসম্মান কমে যায়। সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বাড়ে। এতে হতাশা ও উদ্বেগ আরও তীব্র হয়।
নিদ্রাহীনতা ও মানসিক ক্লান্তি
স্থূলতার সঙ্গে ‘স্লিপ অ্যাপনিয়া’ ও নিদ্রাহীনতা প্রায়ই যুক্ত থাকে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি ও মেজাজের পরিবর্তন ঘটে।
সারাদিন ক্লান্তি, বিরক্তি ও মনোযোগহীনতা দেখা দেয়। এতে মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হয়।
চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা
স্থূলতার চিকিৎসায় শুধু ওজন কমানোই লক্ষ্য নয়— মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ডা. দিনা বলেন, “কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি (সিবিটি)’ ইমোশনাল ইটিং কমাতে সাহায্য করে। স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট, মাইন্ডফুলনেস ট্রেনিং ও গ্রুপ থেরাপি আত্মনিয়ন্ত্রণ বাড়ায়।”
পরিবার ও সমাজের সহায়ক মনোভাব রোগীর আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনে। নিয়মিত ব্যায়াম, সুষম খাদ্যাভ্যাস ও পর্যাপ্ত ঘুম শরীর ও মন— দুটোকেই ভারসাম্যে রাখে।
আরও পড়ুন
নিঃসঙ্গতা: ধূমপান ও স্থূলতার মতোই ক্ষতিকর