‘নজরুলের গান নিয়ে শাফিনের কাজটা হল না, আফসোস থেকে যাবে’
মৃত্যুর আগে শাফিনের সঙ্গে শেষ কথোপকথন গ্লিটজের কাছে তুলে ধরেন ‘ফিডব্যাক’ ব্যান্ডের ফোয়াদ নাসের।
নজরুলের কিছু গান নতুন সংগীত আয়োজনে সাজাতে চেয়েছিলেন ব্যান্ডসংগীতের প্রয়াত তারকা শাফিন আহমেদ। যে স্বপ্ন, পরিকল্পনা রয়ে গেল অধরা।
এই দায়িত্ব শাফিন দিতে চেয়েছিলেন তার সহকর্মী ‘ফিডব্যাক’ ব্যান্ডের ফোয়াদ নাসেরকে।
শাফিনের মৃত্যুর আগে তার সঙ্গে শেষ কথোপকথনের কথা গ্লিটজের কাছে তুলে ধরেছেন সংগীত পরিচালক।
ফোয়াদ নাসের বলেন, “আমেরিকা যাওয়ার আগে একদিন শাফিন বলেছিল, ওর সংগীত জীবনের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে একটি বিশেষ আয়োজন করতে চায়। আমাকে বলেছিল, দশটি নজরুলসঙ্গীতের সঙ্গীতায়োজনের দায়িত্ব নিতে। ওর সেই স্বপ্ন আর বাস্তব হল না। এই আফসোসটা থেকে যাবে।”
শাফিন দেশের সংগীত অঙ্গনের দুই মহারথী সংগীত শিল্পী ফিরোজা বেগম এবং সুরকার কমল দাশগুপ্তের সন্তান।
পারিবারিক ঐতিহ্যের কারণে ছোটবেলা থেকেই গানের আবহে বেড়ে উঠেছেন শাফিন। বাবার কাছে উচ্চাঙ্গ সংগীত আর মায়ের কাছে নজরুলগীতি শিখেছেন।
২০২৪ সালের ২৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার একটি হাসপাতালে মারা যান ব্যান্ড সংগীতের উজ্জ্বল এই তারকা। একটি কনসার্টে অংশ নিতে ২০ জুলাই সেখানে গিয়েছিলেন তিনি। বিদেশে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে নেওয়া হয় হাসপাতালে, চারদিন লাইফ সাপোর্টেও ছিলেন তিনি। কিন্তু সেখান থেকে আর ফেরানো যায়নি শাফিনকে।
কফিনবন্দি হয়ে শাফিন দেশে ফেরেন ২৯ জুলাইয়ে। পরদিন ৩০ জুলাই বনানী কবরস্থানে শায়িত হন শাফিন।
কণ্ঠ, সুর আর গান দিয়ে শাফিন চিরকাল বেঁচে থাকবেন বলে মনে করেন ফোয়াদ নাসের।
এক বছরে শাফিন আহমেদ তার সহশিল্পীদের মনে কতটা বেঁচে আছেন প্রশ্নে ফোয়াদ নাসের বলেন, "যে চলে যায়, সে তো আর ফিরে আসে না। কিন্তু শাফিন আহমেদ ফিরে আসবে বারবার তার গান দিয়ে, তার কাজ দিয়ে, নতুন প্রজন্মের অনুসরণের মধ্য দিয়ে।"
প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে ব্যান্ড মিউজিক থেকে কোনো আয়োজন করা হয়েছে কী না প্রশ্নে ফোয়াদ নাসের বলেন, "পারিবারিকভাবে কিছু আয়োজন করা হয়েছে, সেটা পরিবারে সীমাবদ্ধ। তবে ফেব্রুয়ারিতে শাফিনকে ট্রিবিউট করে কনসার্ট হয়েছিল সেখানে আমরা অংশ নিয়েছিলাম। শাফিনের প্রতি আমাদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা জানিয়েছি।”
শাফিনের সঙ্গে পরিচয়ের সময়টার কথা স্মরণ করে ফোয়াদ নাসের বলেন, "শাফিনের সঙ্গে আমার পরিচয় সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ধানমন্ডিতে। সেই পরিচয়ের পর আমরা একসঙ্গে ১২ বছর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল বাজিয়েছেই ,গান করেছি।”
শাফিনের কোন ব্যাপারটা ফোয়াদ নাসেরকে টানত জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সেটা হল রেকর্ডিং হোক বা মঞ্চ সব জায়গাতেই সে ভীষণ পেশাদার ছিল। সাজসজ্জায় সে ছিল রকস্টার। ফ্যাশনে তার অবস্থান ছিল অনেকটা ঈর্ষণীয়।”
শাফিনের মত 'দ্বিতীয় শিল্পী তৈরি হবে না' বলে মন্তব্য করেছেন ফোয়াদ।
"একজন অসাধারণ যন্ত্রশিল্পী ছিল শাফিন। বেজ বাজিয়ে গাওয়া, যা খুব কঠিন সেটা খুব সাবলীলভাবে করত সে।"
ফরিদ রশিদের হাত ধরে ১৯৭৯ সালে বড় ভাই হামিন আহমেদ ও শাফিন গড়ে তোলেন ব্যান্ড ‘মাইলস’। প্রথম কয়েক বছর তারা বিভিন্ন পাঁচতারা হোটেলে ইংরেজি গান গাইতেন।
এরমধ্যেই প্রকাশিত হয় দুইটি ইংরেজি গানের অ্যালবাম ‘মাইলস’ ও ‘এ স্টেপ ফারদার’। পরে মাইলসের বাংলা গানের প্রথম অ্যালবাম ‘প্রতিশ্রুতি’ বের হয় ১৯৯১ সালে।
ওই অ্যালবামের জনপ্রিয়তার পর বিটিভিতে বিভিন্ন গানের অনুষ্ঠানে দেখা যেতে থাকে মাইলসকে। ধীরে ধীরে মাইলস দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ব্যান্ডে পরিণত হয়।
মাইলসের জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে রয়েছে- ‘চাঁদ তারা সূর্য’, ‘প্রথম প্রেমের মতো’, ‘গুঞ্জন শুনি’, ‘সে কোন দরদিয়া’, ‘ফিরিয়ে দাও’, ‘ধিকি ধিকি’, ‘পাহাড়ি মেয়ে’, ‘নীলা’, ‘কি যাদু’, ‘কতকাল খুঁজব তোমায়’, ‘হৃদয়হীনা’, ‘স্বপ্নভঙ্গ’, ‘জ্বালা জ্বালা’, ‘শেষ ঠিকানা’, ‘পিয়াসী মন’, ‘বলব না তোমাকে’, ‘জাতীয় সঙ্গীতের দ্বিতীয় লাইন’ ও ‘প্রিয়তমা মেঘ’।
কয়েক বছর আগে মাইলস থেকে আলাদা হয়ে শাফিন আহমেদ গড়ে তোলেন ‘ভয়েস অব মাইলস’ নামের তার নিজস্ব একটি ব্যান্ড। তবে সেই ব্যান্ডটিরও আর কোনো অস্তিত্ব নেই।
আরও পড়ুন:
