Published : 24 Aug 2025, 05:24 PM
নব্বই দশকের টেলিভিশন নাটকে যে কয়েকজন তরুণ অভিনয় শিল্পী তাদের ক্যারিয়ারের নতুন অধ্যায় শুরু করেছিলেন, তাদের মধ্যে একজন অভিনেত্রী আফসানা মিমি।
কেবল নাটক নয়, বিজ্ঞাপন, টেলিফিল্ম এবং সিনেমাতেও যার উপস্থিতি আলো ছড়িয়েছে। পরে নির্দেশনাওতে ছাপ রাখেন তিনি। তবে মিমির শুরুটা মঞ্চে। তিন দশকের বেশি সময় পেরিয়ে অভিনয় এবং নির্মাণ থেকে ‘কিছুটা দূরে থাকা’ এই অভিনেত্রী বলেছেন, মঞ্চ নাটকের কোনো একটি চরিত্রের জন্য অপেক্ষা তিনি করেন।
মিমির কথায়, মঞ্চের কাজের জন্যই তার ভেতরে ‘খিদে’ রয়ে গেছে।
এই অভিনেত্রীকে এর মধ্যে পাওয়া গেছে ‘উৎসব’ সিনেমায়।

‘কোথাও কেউ নেই’, 'বেদনার রং নীল', 'অতসী', 'নদীর নাম মধুমতী', 'চিত্রা নদীর পারে', 'প্রিয়তমেষু'সহ এবং বহু নাটক-সিনেমা করা আফসানা মিমির সঙ্গে গল্প করতে এক বিকেলে গ্লিটজ টিম উপস্থিত হয় উত্তরায় মিমির গড়ে তোলা শিশু-কিশোরদের নিয়ে সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র 'ইচ্ছেতলায়'।
দীর্ঘ আলাপচারিতায় মিমি জানিয়েছেন, তার অভিনয় ক্যারিয়ার নিয়ে কিছু কথা। জানিয়েছেন নাটক ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে কিছু কথাও।
গ্লিটজ: ‘উৎসব’ সিনেমায় নব্বই দশকের অভিনয়শিল্পীদের একসঙ্গে পেয়েছে দর্শক। এমন করে একসঙ্গে ফিরতে ইচ্ছে করে?
আফসানা মিমি: হ্যাঁ, ফিরতে ইচ্ছে করে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে তো টাইম ট্রাভেল করা যায় না। মনে হয়, যদি সেই সময়টাকে এখন নিয়ে আসতে পারতাম! নতুনকে আবাহন করতে গিয়ে আমরা পুরনো অনেক কিছু পুরোপুরি ফেলে দিয়েছি, সেই জায়গাগুলো নিয়ে আমার সবসময়ই একটা সংকট থাকে। সবচেয়ে বেশি মনে হয়, প্রতিটি কাজের সৌন্দর্য, মনের সৌন্দর্য, মানুষের কাজকে ভালোবাসার সৌন্দর্য, সততার সৌন্দর্য এসব যদি ফিরে আসত, কত ভালো লাগত! সংস্কৃতি আমাদের শেকড়, যার ওপর দাঁড়িয়ে আমরা অনেক দূর পথ পাড়ি দিতে পারি। সেই জায়গা থেকে কেমন যেন আমরা এলোমেলো হয়ে গেছি। সেটা ফেরত আসলে বেশ ভালো হত।
ঈদে ‘উৎসব’ সিনেমায় যে আমরা কাজ করেছি নব্বই দশকের আমি, জাহিদ হাসান আর আজাদ আবুল কালাম। জয়া, অপি, দিনার, তানিম নূর হয়ত আমাদের একটু পরের ব্যাচ; সৌম্য জ্যোতি, সাদিয়া আমাদের অনেক ছোট। ভিন্ন বয়স, ভিন্ন সময়ের হলেও আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে কোনো অসুবিধা হয়নি। ঠিকঠাক সংস্কৃতি চর্চার যে জায়গাটা, সেখানে একটা সময়ের সঙ্গে আরেকটা সময় যুক্ত হতে পারে। তাই নব্বই দশকের আমার সঙ্গে ২০২৫ সালের সাদিয়া আয়মানের মানসিক সম্পর্ক তৈরি করতে কোথাও কোনো সমস্যা হয়নি। যদিও ‘উৎসব’ সিনেমায় আমাদের সেই সম্পর্কের প্রয়োজন ছিল না, আমরা আলাদা বয়সের দুই চরিত্রই করেছি। কিন্তু সিনেমার বাইরে, রিলিজের সময়, বিভিন্ন হলে যাওয়া, একসঙ্গে ছবি তোলা, ঘোরা, আনন্দ করা, প্রেস কনফারেন্স সব জায়গায় আমি দেখেছি, ছোট জেসমিন আর বড় জেসমিন আসলে একই জেসমিন। আমাদের চিন্তার জায়গাটা একই রকম।

গ্লিটজ: আপনার শুরু সময় অর্থাৎ নব্বইয়ের টিভি নাটকের সময়টা আপনার মনে কতখানি দাগ কেটে আছে?
আফসানা মিমি: আমার মনে করার চেয়ে সবচেয়ে বেশি আনন্দ হয় যখন এখনকার হাইস্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছেলে-মেয়েরা এসে বলে, আমাদের সেই সময়ের কাজগুলো তাদের ভালো লাগে। এটা আমার জন্য সবচেয়ে আনন্দের জায়গা।
নব্বই দশকে আমাদের বলা হত, টেলিভিশন হচ্ছে ইরেজ মিডিয়াম, তোমরা যা করছো, একসময় মুছে যাবে। কিন্তু যখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ইউটিউব, ফেইসবুক এল, তখন সেই কাজগুলো নতুন করে ফিরল। আমরা মনে করি, এটা আমাদের সৌভাগ্য যে এখনকার মানুষও আমাদের কাজ দেখতে পাচ্ছে যা আসলে পাওয়ার কথা ছিল না।
গ্লিটজ: নাটক ইন্ডাস্ট্রির একাল-সেকালের পার্থক্য কীভাবে দেখেন?
আফসানা মিমি: আমি আসলে সে অর্থে একাল সেকাল বলব না। আমাদের তো লম্বা সময় দেখা হল। নব্বইয়ের দশক, শূন্য দশক, ২০১১ থেকে ২০২০, এখন আবার আরেকটা দশকের অর্ধ সময় পার করে ফেললাম। সেই হিসেবে কিছু সংকটের সময় সবসময়ই এসেছে। তবে আমাদের ইন্ডাস্ট্রি নিজে থেকে তার আবেদন হারিয়েছে। এটা আমি মনে করি, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতিকে দোষ দিয়ে আমরা খুব বেশি গা বাঁচাতে পারব না।
গ্লিটজ: এই সময়ের নাটক নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কেমন?
আফসানা মিমি: এখনকার নাটকের ধরন নিয়ে তেমন কিছু বলতে চাই না, বলতেও পারব না। এই বিষয়ে আমার সম্যক জ্ঞান নেই। যতটুকু ভাসা-ভাসা ধারণা আছে, তা দিয়ে পুরো ইন্ডাস্ট্রি বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়। কারণ দর্শক হিসেবে সব কাজ তো দেখা হয় না।
তবে ছোট ছোট টুকরো ভিডিও দেখে মনে হয়, ভাষার ব্যবহারে আমরা অনেক সময় কাজের সৌন্দর্য নষ্ট করে ফেলছি। ডাবল মিনিংয়ে কথা বলা, গালিগালাজ করা, বাজে উচ্চারণে কথা বলা এসব ভাষার ওপর এক ধরনের আগ্রাসন আছে, যা আমার ভালো লাগে না। ব্যক্তিগতভাবে আমি এসব চর্চা করি না, সমর্থনও করি না।
অবশ্য ইন্ডাস্ট্রিতে নানা ধরনের মানুষ থাকবেই, সবাইকে একই পথে পরিচালিত করা সম্ভব নয়। সেটা তখনই সম্ভব, যখন সবার লক্ষ্য ও দর্শন এক হবে।
গ্লিটজ: নাটকের ভাষার পরিবর্তন, অশ্লীল শব্দের ব্যবহার আপনাকে পীড়া দেয়?
আফসানা মিমি: আমাদের নাটক ইন্ডাস্ট্রি আলাদা কিছু নয়, এটি কিন্তু রাষ্ট্র ও সমাজেরই একটি অংশ। রাষ্ট্রে যা চলছে, সমাজে যা চলছে, নাটক কী তার বাইরের কিছু হবে। হবে না কিন্তু। আমরা সামগ্রিকভাবেই শিক্ষার মধ্যে আমাদের বাংলা ভাষাকে সেই অর্থে যত্ন করতে পারছি না, আর তার প্রভাব নাটকে পড়বেই।
কোন শব্দ কোথায় ব্যবহার করতে হবে, বাক্য গঠন কেমন হবে এসব জীবন ও ভাষার অংশ। সব জায়গায় সাহিত্য হওয়া দরকার বিষয়টা এমন নয়। আমি যা বলতে চাই তা হলো, পরিষ্কার বাংলা ভাষায়, শুদ্ধ বানানে সঠিক শব্দ ও বাক্য প্রয়োগ করা আমাদের দায়িত্ব।
সম্প্রতি আমি দেখেছি, আমার নির্মাণ করা ২০০৪ সালের 'অফ বিট' নাটক ইউটিউব চ্যানেলে নতুন করে আপলোড করা হয়েছে। যিনি আপলোড করেছেন, তিনি ‘নিউ নাটক ২০২৫’ লিখে দিয়েছেন। পাশাপাশি থাম্বনিলে জয়া ও তাহসানের নতুন একটি ছবি দেওয়া। কিন্তু দর্শক ভিতরে ঢুকলেই দেখবেন এটা পুরনো নাটক, কারণ নাটকে স্পষ্ট লেখা রয়েছে ২০০৪ সাল। জয়ার ও তাহসানের চেহারা দেখে বুঝতে পারবেন এটা ২০ বছর আগের কাজ। তাহলে কেন বোকা বানানো হচ্ছে, ‘নিউ নাটক’ বলে? আমি এটা দেখে পরিবর্তন করিয়েছি। আমার নিজের নাটক বলে এটার উদাহরণ দিলাম। এমনভাবে আমাদের নাটকেও অনেক সময় চটকদার শব্দ, অপ্রয়োজনীয় বাক্য ও আপত্তিকর ভাষায় মানুষকে বিভ্রান্ত করা হয়। এটা কোনো চর্চার অংশ হতে পারে না।
গ্লিটজ: অভিনেত্রী ও নির্মাতা হিসেবে কোন মাধ্যমে কাজ করতে পছন্দ করেন?
আফসানা মিমি: অভিনয়শিল্পী হিসেবে আমি সব মাধ্যমেই কাজ করতে পছন্দ করি। আমার কাছে নাটক, ওটিটি, সিনেমা সবই হচ্ছে ক্যামেরার সামনে অভিনয় করা। এর বাইরে এই কাজের আর কোনো অর্থ নেই। তবে মঞ্চে অভিনয় করতে খুব ভালোবাসি। মনে হয় আমাকে যদি কেউ ডাকত, থিয়েটারে একটা চরিত্র দিয়ে বলত অভিনয় কর। সেরকম চরিত্রের জন্য মাঝেমধ্যে বুকের মধ্যে একটু চিনচিন করে।
এই থিয়েটারের খিদে রয়ে গেছে দুই কারণে। এক, নিয়মিত প্র্যাকটিস না করলে কনফিডেন্স কমে যায়। থিয়েটারের সঙ্গে থাকলে অভিনয়ের স্কিলটা ঠিকঠাকভাবে ধরে রাখতে পারব। না হলে একসময় হারিয়ে যেতে হবে। দুই, আমি অনেক মিস করছি থিয়েটারকে।
আর নির্মাতা হিসেবে বিজ্ঞাপন করতে পছন্দ করি কারণ বিজ্ঞাপন করলে ভালো পারিশ্রমিক পাওয়া যায়। ওটিটির কাজেরও বাজেট বেশি থাকে।
গ্লিটজ: তরুণদের মধ্যে থিয়েটার চর্চার আগ্রহ কেমন দেখতে পান?
আফসানা মিমি: থিয়েটার তারাই মিস করবে যারা এ পথে একবার হেঁটে এসেছে। থিয়েটারের অভিজ্ঞতার সাধ যে পাইনি সে থিয়েটার মিস করবে না। আর তরুণদের শেখার আগ্রহ বলতে যে থিয়েটার ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসেনি সে এটার প্রয়োজন অনুভব করবে না।
গ্লিটজ: থিয়েটার চর্চা কী কমে যাচ্ছে?
আফসানা মিমি: সব খানেই তো আমরা নিচের দিকে যাচ্ছি, থিয়েটার কীভাবে উপরের দিকে উঠবে।
গ্লিটজ: 'কাছের মানুষ', ‘ডলস হাউস’ ধারাবাহিকের পর আর কোনো ধারাবাহিকের নির্মাণে আপনাকে পাওয়া যায়নি কেন?
আফসানা মিমি: আমি খুব আহামরি, বড় মেধাবী নির্মাতা না। টেলিভিশনের জন্য যতটুকু প্রয়োজন ওই জায়গাতে আমি আমার একটি শক্তিশালী ছাপ রেখে গিয়েছি। এখন টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর দায়িত্ব উনারা আমাকে দিয়ে কাজ করাবেন নাকি করাবেন না। এটা আমার দায়িত্ব না।
গ্লিটজ: টেলিভিশন স্টেশনগুলোর প্রযোজনা কমে গিয়েছে নাকি আপনার নির্মাণ নিয়ে আগ্রহ কমে গিয়েছে?
আফসানা মিমি: আমার নির্মাণের প্রতি আগ্রহ কমে গিয়েছে এটা যেমন সত্য নয়, আবার খুব আগ্রহ রয়েছে সেটাও সত্য নয়। আমি একটা মাঝামাঝি জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি। কারণ একটা ভালো নির্মাণ করতে হলে আমাকে স্ট্যান্ডার্ড বাজেট পেতে হবে। ভালো গল্প পেতে হবে, ঠিকঠাক অভিনয়শিল্পী, প্রোডাকশন ক্রু পেতে হবে। যাদেরকে নিয়ে একসঙ্গে কাজ করব। কেউ যদি এসে আমাকে বলেন, ‘‘মিমি তুমি এটা কর”। আমার জন্য করাটা সহজ। কিন্তু আমি গিয়ে বলব, ‘আমি এমন একটা কাজ করতে চাই আমাকে দাও’৷ সত্যি বলতে আমার এখন এটা আর বলতে ইচ্ছে করে না। কারণ আমি বিশ্বাস করি যদি আমাকে প্রয়োজন হয় মানুষ খুঁজে নিবে। যদি আমাকে খুঁজে না নেয় তার মানে আমাকে তার প্রয়োজন নাই। আমাকে ওই সত্যটা মেনে নিতে হবে আমি আসলে ওই জায়গায় আর নেই।
আমি যেহেতু সাহিত্য নির্ভর কাজ করতে ভালোবাসি, কিছু গল্প, উপন্যাস নির্বাচনে আছে এগুলো গুছিয়ে প্রপোজাল দিলে হয়ত অনেকে রাজি হবেন। কিছু কাজ হয়ত করব।

গ্লিটজ: পরিচালনায় নারীদের প্রতিবন্ধকতা, আশা, সাফল্য কতটুকু?
আফসানা মিমি: এই জায়গাটা মেয়েদের জন্য একটু কঠিন। আমার মনে হয় মেয়েদের পিছনে ইনভেস্ট কম করতে চায়। তাই নির্মাণে মেয়েদের অংশগ্রহণ কম।
আমি কিন্তু নারীবাদী নই, আমার জীবনে তো অবশ্যই, যত মেয়েরা কাজ করেন বিভিন্ন সেক্টরে তাদের জীবনে তাদের পুরুষ বন্ধু, পুরুষ সহকর্মীরা কত কত অবদান রেখেছেন। আমরা পথ চলেছি, কিন্তু একজন পুরুষ সহকর্মী বা বন্ধু আমাদেরকে সহযোগিতা করেনি এটা আমি কখনোই বলবো না। কিন্তু এখানে কাজের ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটের জায়গায় একটা পুরুষ তান্ত্রিকতা ভয়ংকরভাবে আছে। কেন আছে জানি না। তবে এগুলো নিয়ে গবেষণা হওয়া দরকার। নারীদের অংশগ্রহণ কম কেন সেটা নিয়ে ভাবা উচিত।
গ্লিটজ: অভিনয় ও পরিচালনার বাইরে কী সবথেকে বেশি আনন্দ দেয়?
আফসানা মিমি: গল্প করতে, ঘুরে বেড়াতে, সম্ভাবনাময় মানুষের সঙ্গে আড্ডা দিতে খুব ভালো লাগে, ঘরবাড়ি গুছাতে, বিশ্রাম নিতে, আর সব থেকে বেশি যেই জায়গায় সময় দিতে ভালো লাগে সেটা হল ইচ্ছেতলা। এটা আমার প্রাণের জায়গা।
গ্লিটজ: ইচ্ছেতলা কী?
আফসানা মিমি: ইচ্ছেতলা হচ্ছে শিশু কিশোরদের সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র। এই প্রতিষ্ঠানে শিশুরা এসে কিছুটা সময় আনন্দ নিয়ে কাটায়। এখানে তাদের একটা নিয়ম আছে। ওরা আসার পর একসঙ্গে সমাবেশে একটা গান করবে, একটা শপথ বাক্য আছে সেটা পাঠ করবে। আমাদের শিশুদের চারটা দল আছে। সেগুলো হল 'আগমনী', 'স্থিতি', 'উৎকর্ষ' ও 'মুক্তধারা'।
ইচ্ছেতলার মূল ব্যাপারটা হচ্ছে আমরা কাউকে কিছু শেখাতে চাই না। আমরা কিছু বিষয়ে তাদেরকে পরিচয় করে দিতে চাই সেই বিষয়গুলোতে তারা যদি আনন্দ পায়। তাহলে সে সেটা শিখে নিবে। আমাদের কার্যক্রম সব একসঙ্গে। একসাথে নাচ, গান, কবিতা, থিয়েটারের ক্লাস হয়।
গ্লিটজ: শিশুদের নিয়ে কী যথেষ্ট কাজ হচ্ছে?
আফসানা মিমি: আমি আসলে শিশুদের নিয়ে কাজ করতে পছন্দ করি, ভালোবাসি। আমি মনে করি শিশুদের জন্য অনেক কাজ হওয়া দরকার। এই যে এত এত টেলিভিশন চ্যানেল আছে নাটক, সিনেমা হচ্ছে এর মধ্যে শিশুদের জন্য একটা মাত্র দুরন্ত টিভি। তাও তাদের শিশুনির্ভর কাজ দেখাতে গেলে ডাবিং নির্ভর কাজ করতে হচ্ছে। এই দেশে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের জন্মের ২০ বছর পর একটা শিশুতোষ চ্যানেল চালু হয়েছে। বাংলাদেশ টেলিভিশনে বাচ্চাদের যে অনুষ্ঠান আছে সেটাও অপ্রতুল। আমরা কিন্তু বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রোগ্রাম দেখে বড় হয়েছি। এখন সেটাও নেই। তাই যথেষ্ট কাজ হচ্ছে না।
টিভি চ্যানেলের প্রত্যেকের রান্নার অনুষ্ঠান আছে,রূপচর্চার অনুষ্ঠান আছে, টকশো আছে। অনেক ধরনের প্রোগ্রাম আছে। শিশুদের জন্য তো এতটুকু সময় কেউ রাখে না। বাচ্চাদের অজস্র প্রডাক্ট আছে বাংলাদেশে। তারাও উদ্যোগ নিতে পারেন বাচ্চাদের প্রোডাক্ট শুধু বাচ্চাদের অনুষ্ঠানে স্পন্সর করবেন। অর্থাৎ ব্যবসা আর দায়িত্ব দুইটা একত্রিত করতে পারলেই শিশুদের জন্য কাজ বাড়বে।
গ্লিটজ: জীবনের অনেকটা সময় পার করেছেন। কখনো কাউকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছেন?
আফসানা মিমি: ৫৭ বছর চলছে আমার, জীবনে অজস্র মানুষকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছি। এখনো হই। এই অনুপ্রেরণা ছোট বড় মাঝারি সবাই দেয়। এই মুহূর্তে আমি আমার শিশুদের দেখে অনুপ্রেরণা পাই। সহকর্মীদের দেখে, গুরুজনদের দেখে তো পাই৷ যেটা গুণে গেঁথে শেষ করা যাবে না। একটা লেখা, কবিতা পড়ে, সিনেমা দেখে, গান শুনে অনুপ্রাণিত হই। যেসব মানুষের সঙ্গে কাজ করি তাদের দেখে অনুপ্রাণিত হই প্রতিদিনই। জীবনের নানান কিছু থেকে।
গ্লিটজ: নাটক ইন্ডাস্ট্রির তিক্ত দিক কোনটা?
আফসানা মিমি: আমার নাটকের সিন্ডিকেট জিনিসটা ভালো লাগে না। আমরা যে ইন্ডাস্ট্রির উন্নতি করতে চাই না এটা আমার ভালো লাগে না। কারণ এই ইন্ডাস্ট্রিটা প্রতিনিয়ত উন্নতি করার একটা জায়গা। শুধুমাত্র আয়ের জন্য সবাই এই ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করে যাচ্ছে। আমরা প্রচুর কম্প্রোমাইজ করে চলি তা ভালো লাগে না। নানা ধরনের দুর্নীতি আছে সেটা ভালো লাগে না৷
নাটকের শুটিং হাউসগুলো ভাড়া দিলে তাদের দায়িত্ব হয় হাউসটা ও ওয়াশরুম ক্লিন রাখা। কিন্তু তারা ভাবেন, শুটিং হাউস নোংরা থাকলেই কী। আমরা দিনের পর দিন সেটাই মেনে নিচ্ছি। যেই জায়গায় কাজ করে আমরা অন্ন জোগাই সেটা পবিত্র করে রাখতে তো অসুবিধা নেই। অপরিষ্কার, নোংরা কেন থাকবে। এটা নিয়ে আমি সারাজীবন লড়াই করে এসেছি। একটা পরিষ্কার শুটিং হাউস, ওয়াশরুম আমাকে কেউ দেয়নি। অথচ দিনে দিনে শুটিং বাড়ছে, ইন্ডাস্ট্রি বড় হচ্ছে। শুটিংয়ের খাবার যা দেওয়া হয় সেটার উন্নতি নেই, খুব স্বাস্থ্যকর খাবার আসে না। বেসিক নিয়মগুলো এখানে ঠিক মত মানা হয় না।
গ্লিটজ: কাজের সময়সীমা এবং ছুটির ব্যাপারে আপনার কী মতামত?
আফসানা মিমি: ইন্ডাস্ট্রিতে কাজের একটা সময়সীমা থাকা উচিত। আমাদের কোনো ছুটি নেই। অন্তত সাপ্তাহিক ছুটি দেওয়া সম্ভব না হলে ১৫ দিনের বা মাসিক ছুটি থাকা প্রয়োজন, যেদিন সব কাজ বন্ধ থাকবে। আমি অভিনয়শিল্পী হিসেবে মাসে সাতদিন কাজ করি, কিন্তু আমার ক্রু তো ৩০ দিন কাজ করছে। তাদের কোনো বিশ্রাম নেই। আমি নিজেও যখন একই দলে ডিরেকশন দিই, কাজ শেষ করতে করতে রাত হয়ে যায়। এটা ভালো নয়।
কাজের শুরু ও শেষ সময় নির্দিষ্ট থাকা উচিত। আমাদের পাশের দেশে এটা শক্তিশালীভাবে মেনে চলা হয় । ফাসর্ট শিফট, সেকেন্ড শিফট হিসেবে কাজ করে তারা। আমরা যেহেতু আবাসিক এলাকায় কাজ করি, তাই অবশ্যই সময়সীমা মেনে চলতে হবে। নাটকের বাজেট বাড়ালে এসব হয়ত ঠিক হয়ে যাবে।
আমাদের যে সংগঠনগুলো আছে, সেগুলো এমনিতেই খুব চমৎকার। কিন্তু সংগঠনগুলো টিভি নাটকের কী দাম হবে, একটা কাজের জন্য কত টাকা মিনিমাম দিতে হবে, সেটা নির্ধারণ করে দিতে পারে। আমাদের নাটকের কোনো মার্কেট প্রাইজ নেই৷ আমার কাছে সবসময় মনে হয় একটা বেইজ মার্ক থাকা দরকার, যেন সেই মানের নিচে না যায়। আমাদের সকলের আরও বেশি দায়িত্ব রয়েছে এই ইন্ডাস্ট্রিটা গুছাতে।
গ্লিটজ: আগামীর পরিকল্পনা কী?
আফসানা মিমি: সুযোগ থাকলে ভালো কিছু কাজ করা। নিজের উন্নয়ন ঘটানো। আত্মিক, মানসিক ও শিক্ষার উন্নয়ন ঘটানো। এর বাইরে আমার তেমন কোনো ভাবনা চিন্তা নেই।