Published : 15 Mar 2026, 02:03 PM
অস্কার যুদ্ধে একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেওয়া চিত্রনাট্য, অন্যদিকে ত্রিশের দশকের মিসিসিপিকে কেন্দ্র করে নির্মিত গভীর গবেষণাভিত্তিক ঐতিহাসিক ড্রামা এখন মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।
বিবিসি লিখেছে, অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডস কর্তৃপক্ষ চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট ২৪ শাখায় অস্কার ঘোষণা করলেও, আসরের মূল আকর্ষণ ‘সেরা সিনেমা’। মনোনয়নে ১০টি সিনেমার নাম আসলেও সবগুলো ছাপিয়ে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে নেমেছে রায়ান কুগলারের ‘সিনার্স’ ও পল টমাস অ্যান্ডারসনের ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’।
গেল জানুয়ারিতে মনোনয়ন পর্বে ‘সিনার্স’ সিনেমাটির জয়জয়কার হয়েছে। ১৬টি বিভাগে মনোনয়ন পেয়ে একক কোনো সিনেমা হিসেবে সর্বোচ্চ মনোনয়নের নতুন রেকর্ড গড়েছে হরর চলচ্চিত্রটি।
এই সিনেমার নিটক প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক থ্রিলার 'ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার' পেয়েছে ১৩ শাখায় মনোনয়ন।
তবে ব্রিটিশ একাডেমি অব ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন আর্টস (বাফটা) পুরস্কারে বাজিমাত করাসহ আরও কিছু জয়ের পর শক্ত অবস্থানে আছে লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও অভিনীত 'ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার' সিনেমাটি। আর চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের প্রত্যাশা এই সিনেমা পরিচালনার জন্য পল টমাস অ্যান্ডারসন অবেশেষে অস্কারজয়ীর খাতায় নাম লেখাতে চলেছেন।
আবার অ্যাকাডেমির ভেতরেও মাইকেল বি. জর্ডান অভিনীত ‘সিনার্স’ নিয়ে উৎসাহ রয়েছে। তাই রায়ান কুগলারের এই সিনেমাটি যে ইতিহাস তৈরি করবে না, তা বলা যাচ্ছে না।
‘সিনার্স’ এর জন্মকথা
মার্ভেলের ‘ব্ল্যাক প্যান্থার’ ফ্র্যাঞ্চাইজির মাধ্যমে খ্যাতি পাওয়া কুগলার ‘সিনার্স’ এর চিত্রনাট্য লিখেছেন মাত্র দুই মাসে। তবে এর পেছনে ছিল বহু বছরের ইতিহাস। মিসিসিপি ডেল্টার লোককথা, দাসপ্রথা-পরবর্তী সংস্কৃতি, ব্লুজ সংগীতের ইতিহাস- এসবের গভীর ছাপ রয়েছে ‘সিনার্স’ এ।
প্রায় ১০ কোটি ডলার বাজেট ছিল সিনেমা বানানোর জন্য। শুরুতে বহু মানুষ সংশয় প্রকাশ করেন ‘সিনার্স’ এর সাফল্য নিয়ে। কারো কারো শঙ্কা ছিল যে সিনেমাটি নাকি হলিউডকেই ‘ধ্বংস’ করে দিতে পারে।
বিনিয়োগ করায় ওয়ার্নার ব্রাদার্সকেও অনেকে ‘উন্মাদ’ বলেছিলেন। এছাড়া কুগলারকে সিনেমার ফাইনাল কাটের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দেওয়ায় ও ২৫ বছর পর ছবিটির সম্পূর্ণ স্বত্ব তার হাতে তুলে দেওয়ার চুক্তিও করা হয়।

এজন্য অনেকে ঘটনাটি স্টুডিও ব্যবস্থার জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত মনে করেছিলেন। কেউ কেউ বলেছিলেন, এই সিনেমাই হতে পারে স্টুডিও সিস্টেমের শেষ অধ্যায়।
তবে অস্কারে ১৬টি মনোনয়ন জিতে ‘সিনার্স’ ইতোমধ্যেই বহুল আলোচিত একটি সিনেমা।
‘দ্য গার্ডিয়ান’ লিখেছে ‘সিনার্স’ একদিকে এটি যেমন হরর সিনেমা, অন্যদিকে ব্লুজ সংগীতনির্ভর মিউজিক্যাল, আবার একই সঙ্গে গ্যাংস্টার থ্রিলার। অর্থাৎ ত্রিশের দশকের মিসিসিপিকে কেন্দ্র করে নির্মিত গভীর গবেষণাভিত্তিক ঐতিহাসিক ড্রামা হল ‘সিনার্স’।
এই হরর সিনেমার পটভূমি জিম ক্রো যুগের দক্ষিণ আমেরিকা। অভিনয়শিল্পীদের বড় অংশই কৃষ্ণাঙ্গ। ১৯৩০-এর দশকে মিসিসিপিতে ফিরে এসে একটি 'জুক জয়েন্ট' চালু করা দুই যমজ ভাইয়ের চরিত্রে অভিনয় করে সেরা অভিনেতা বিভাগে মনোনয়ন পেয়েছেন মাইকেল বি জর্ডান। সিনেমার গল্পে দেখা যায়, তাদের সেই 'জয়েন্ট'-এ হানা দেয় রক্তচোষা ভ্যাম্পায়াররা।

২০২৫ সালের ১৭ এপ্রিল প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়ে ‘সিনার্স’ আলোচনায় আসে দ্রুত। চিত্রনাট্যটি যেন অলৌকিকভাবে পুর্নজন্ম ঘটনায়। খুব দ্রুতই বিশ্বজুড়ে ৩৬৮ মিলিয়ন ডলার আয় করে ফেলে। এর মধ্য দিয়ে ‘সিনার্স’ গত ১৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে সফল মৌলিক (অরিজিনাল) সিনেমা হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে দশম সর্বোচ্চ আয় করা আর-রেটেড চলচ্চিত্র হয় ‘সিনার্স’। আর এই তালিকায় ‘টার্মিনেটর ২’ কিংবা ‘হ্যাংওভারস’ সিনেমাকেও টপকে গিয়েছে ‘সিনার্স’।
সমালোচকদের ভাষ্য, কুগলার ইতিহাসের ভার ও ধর্মীয় প্রতীকগুলোকে সিনেমার ভেতরে এমনভাবে মিশিয়ে দিয়েছেন, যাতে মূল গল্পের গতি ব্যাহত না হয়। যা তিনি করে থাকেন বরাবরের মত।
আর মূল যমজ ভাইয়ের চরিত্রাভিনেতা মাইকেল বি. জর্ডান যেন নতুন করে নিজেকে আবিষ্কার করেছেন।
যদিও মাইকেলের ক্যারিয়ার দীর্ঘ পরিসরের ও সমৃদ্ধ। ‘সিনার্স’ সিনেমা দিয়ে কুগলারের সঙ্গে তৃতীয়বার জুটি বেঁধেছেন এই অভিনেতা
তবু এই ছবিতে দ্বৈত চরিত্রে, স্মোকস্ট্যাক যমজ ভাই হয়ে নিজের জাত চিনিয়েছেন মাইকেল। শরীরী ভাষা ও কণ্ঠের সূক্ষ্ম পরিবর্তনের মাধ্যমে দুই ভাইকে আলাদা করে তুলেছেন নিজের দক্ষতায়।
যুক্তরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থাকে প্রশ্ন তোলে ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’
‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’ সিনেমায় বিনোদনে মোড়কে রাজনৈতিক গল্প বলে গেছেন হলিউডের পরিচালক পল টমাস অ্যান্ডারসন।
১৯৯০ সালে প্রকাশিত টমাস পিনচনের উপন্যাস ‘ভাইনল্যান্ড’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সিনেমাটি বানিয়েছেন তিনি। যে সিনেমার সঙ্গে এই সময়ের যুক্তরাষ্ট্রের বাস্তবতার সাদৃশ্য মেলে। সিনেমার পরতে পরতে বিপ্লব, অভিবাসন, দুর্নীতি, সংঘর্ষ, শ্বেতাঙ্গদের আধিপত্য উঠে এসেছে।
একটি ঘোষণা, আকস্মিক হামলা, তারপর গল্প আর থামেনা; এর মধ্যে সন্তানের জন্য বাবার ভালোবাসা ও মায়ের অন্তর্ধান- প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চলতে থাকে ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’।
২০২৩ সালের জুনে প্রাথমিকভাবে সিনেমাটির কাজ শুরু হলেও পুরোদমে শুটিং চলতে থাকে ২০২৪ সালের ২২ জানুয়ারি।

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গায় হয়েছে দৃশ্যধারণের কাজ। প্রাথমিক নাম ছিল ‘দ্য ব্যাটল অব বাকটান ক্রস’। পরে কিছু জটিলতা এড়াতে এটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’।
বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সিনেমাটিকে ‘সমাজের আয়না’ বলে অভিহিত করেছেন মূল চরিত্রাভিনেতা লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও।
তার ভাষ্যে, “আমাদের সংস্কৃতির বিভাজন আর চরম মেরুকরণকে দেখায় এই সিনেমা। যদিও সিনেমার নির্দিষ্ট কোনো বার্তা নেই, তবে চরমপন্থার একধরনের প্রভাব এখানে কাজ করেছে।”
এই সিনেমায় রাজনৈতিক ব্যঙ্গ, ব্ল্যাক কমেডি ও অ্যাকশন আছে, যার প্রশংসা করেছেন সমালোচকেরা।
দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে, এই সিনেমা অসন্তোষ, প্রতিবাদ আর সমাজের বাইরে থাকা একাকী নায়কের গল্প, যা আজকের আমেরিকায় দেখা যায় না।
এ সিনেমার মুখ্য ভূমিকায় অভিনয়ের জন্য ২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পারিশ্রমিক নিয়েছেন লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও।
১৭৫ মিলিয়ন ডলারের বাজেটে নির্মিত এই সিনেমাটি পরিচালক অ্যান্ডারসনের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী প্রকল্প বলা হচ্ছে।

ডিক্যাপ্রিও প্রংশসা করে বলেছিলেন, “অ্যান্ডারসন সব সময় দারুণ সিনেমা বানান, তবে এবার যেন নিজেকে ছাড়িয়ে গেছেন।”
‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’ শুরুতেই মনোযোগ কেড়ে নেয়। সিনেম,আর প্রথম আধঘণ্টার এক বিপ্লবী লড়াই দেখা যায়, যার প্রতিক্রিয়া চলতে থাকে বাকি সময়ধরে। অপহরণ, পালানো, ধাওয়া আর দিশাহারা এক বাবার মেয়েকে খুঁজে বেড়ানোর গল্পে পুরো সময়ে দর্শক আবিষ্ট হয়ে থাকে।
গার্ডিয়ান লিখেছে, হলিউডের বড় স্টুডিওগুলো যেখানে সুপারহিরো, সিক্যুয়েলের পেছনে অর্থলগ্নি করছে, সেখানে ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’ এর মত সিনেমা নিঃসন্দেহে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম।
এই সিনেমা যুক্তরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থাকে প্রশ্ন তোলা এমন ব্যয়বহুল সিনেমা, যা ওয়ার্নার ব্রাদার্সের মতো স্টুডিও প্রযোজনা করেছে, সেটাও বিস্ময় জাগায়।
আরও পড়ুন-
অস্কার উঠছে কাদের হাতে, অপেক্ষায় ডলবি থিয়েটার
অস্কারের মনোনয়নে রেকর্ড ভেঙেছে হরর সিনেমা 'সিনার্স
অস্কার ২০২৬: মনোনয়নে যারা এবং যেসব সিনেমা
অস্কার ২০২৬: এসব তথ্য জানেন কজনা
অস্কার ২০২৬: শ্যালামে, ডিক্যাপ্রিও নাকি জর্ডান, শেষ হাসি হাসবে কে
রবার্ট ডাউনি জুনিয়র, অ্যান হ্যাথওয়ের সঙ্গে ফের অস্কার মঞ্চে প্রিয়
অস্কার ২০২৬: তবে কি বাকলিই চমক দেখাবেন?