Published : 10 May 2026, 01:23 PM
‘আমি শ্রী জোসেফ বিজয়’- তামিল ভাষায় এভাবেই শপথ নিয়েছেন তামিলনাড়ুর নতুন মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রশেখর জোসেফ বিজয় ওরফে থালাপতি; শপথ নেওয়ার পর হাততালিতে ফেটে পড়ে জনাকীর্ণ স্টেডিয়াম।
অভিনেতা থেকে রাজনীতিতে নাম লিখিয়েই যিনি বনে গেছেন জননেতা। থালাপতির দল তামিলাগা ভেট্টি কাজগমের (টিভিকে) সরকার রোববার চেন্নাইয়ে জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়াম শপথ গ্রহণ করে। অনুষ্ঠানে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী, অভিনেত্রী তৃষা কৃষাণসহ থালাপতির সমর্থকরা ছিলেন।
বিজয় থালাপতি ২০২৪ সালে যখন তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম (টিভিকে) নামের দল গড়েন, তবে তার বহু আগেই দক্ষিণী সিনেমার এই তারকার রাজনীতিতে নামার ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছিল। মূলত তার অভিনীতি সিনেমাগুলো এক্ষেত্রে অন্যতম ভূমিকা রেখেছিল। সিনেমায় শিশুশিল্পী হিসেবে শুরু করা থেকে মুখ্যমন্ত্রী, বিজয়ের জীবন যেন সিনেমার মতই নাটকীয়।
শুরু শিশুশিল্পী হিসেবে
ইন্ডিয়া ডটকম লিখেছে, বিজয়ের বাবা এস এ চন্দ্রশেখর ছিলেন তামিল নির্মাতা। চলচ্চিত্রের আবহেই বিজয়ের বড় হয়ে ওঠা। ১৯৮৪ সালের বাবার পরিচালিত সিনেমা ‘ভেটরি’তে শিশুশিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় তার।
২০১৭ সালে এক সাক্ষাৎকারে এস এ চন্দ্রশেখর জানিয়েছিলেন, ওই সিনেমায় অভিনয়ের জন্য বিজয়কে ৫০০ রুপি দেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, “৪২ বছর আগের এক শিশুশিল্পীই দক্ষিণ ইন্ডাস্ট্রিতে সবচেয়ে বড় তারকাদের একজন হয়ে উঠবে, সে সময় যা ভাবা হয়নি।”
ছেলের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা বিষয়টি তিনি আগেই আঁচ করতে পেরেছিলেন বলে মন্তব্য করেন চন্দ্রশেখর।
“বিজয় আমাকে একবার আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেছিল, ‘আমি একদিন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হব’।”
ছেলের সাফল্যকে ওই আত্মবিশ্বাসের ফল বলে মনে করেন চন্দ্রশেখর।
পারিশ্রমিক ৫০০ রুপি থেকে ২০০ কোটি
গেল কয়েক বছরে একটি সর্বভারতীয় সিনেমায় অভিনয় না করেও বক্স অফিসে আধিপত্য ধরে রেখেছেন বিজয়। দর্শকদের কাছ থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া মিললেও, ২০২৩ সালে মুক্তি পাওয়া অভিনেতার ‘লিও’ সিনেমাটি বিশ্বব্যাপী ৬০০ কোটি রুপি ঘরে তোলে। বিজয়ের জনপ্রিয়তার পারদ ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী হতে থাকে নব্বইয়ের দশকে। তবে ২০০৪ সালে মুক্তি পাওয়া ব্লকবাস্টার 'ঘিল্লি' তার ক্যারিয়ারের একটি বড় মোড় হিসেবে ধরা হয়। এই চলচ্চিত্রটি তাকে সাধারণ মানুষের কছে নিয়ে যায়। তাকে ‘গণ মানুষের নায়ক’ আখ্যা দেওয়া হয় সে সময়।
এরপর 'কোকিরি', 'কাভালান', 'নানবান', 'থুকাক্কি', 'মার্সাল', 'সরকার' এবং 'বিগিল'-এর মত চলচ্চিত্রগুলি বিজয়ের তারকাখ্যাতিকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। এমনকি সাম্প্রতিক বছরগুলিতেও, বিজয় সর্বভারতীয় চলচ্চিত্রের গতানুগতিক সূত্র অনুসরণ না করেই বক্স অফিসে বড় সাফল্য এনে চলেছেন। নিঃসন্দেহে তার বিশাল ভক্তগোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। ৫২ বছর বয়সি বিজয় নিজেকে ‘নির্ভরযোগ্য সুপারস্টার’ হিসেবে প্রমাণ করেছেন।
বিজয়ের আরেকটি সিনেমা ‘দ্য গ্রেটেস্ট অব অল টাইম’ বিশ্বব্যাপী ৪০০ কোটি টাকারও বেশি আয় করেছিল। এই পরিসংখ্যান থালাপথি বিজয়ের বিপুল জনপ্রিয়তা এবং দর্শকদের প্রেক্ষাগৃহে টেনে আনার ক্ষেত্রে তার শক্তিশালী ক্ষমতাকে তুলে ধরে।
রাজনীতিতে নিজেকে পুরোপুরি বিলিয়ে দেবেন বলে রুপালি পর্দাকে এর মধ্যে বিদায়ও জানিয়েছেন এই তারকা। দীর্ঘদিন সেন্সর জটিলতায় আটকে থাকার পর তার সর্বশেষ সিনেমা ‘জন নায়গন’ প্রেক্ষাগৃহে আসছে সামনে। ভারতের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম বলছে, শেষ সিনেমার জন্য জন্য তিনি প্রায় ২২০ কোটি রুপি নিয়েছেন। ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এমন উত্থান বিরল।
এনডিটিভি বলছে, দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিজয়ের সিনেমাগুলো রোমান্টিক, বিনোদনমূলক থেকে সামাজিক ও রাজনৈতিক গল্পের পথে হেঁটেছে। এসব সিনেমায় দুর্নীতি, শাসনব্যবস্থার সমস্যা, জনকল্যাণ এবং নাগরিক অধিকারের মতো বিষয়গুলো স্থান পেয়েছে।
অনেকের মতে, বিজয়ের রাজনীতিতে আসা কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং তা ছিল সেসব ধারণারই বাস্তবায়ন, যা তিনি বারবার পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন।
২০১০ সালের পর থেকেই বিজয় থালাপতির কিছু সিনেমায় স্পষ্ট রাজনৈতিক বা সামাজিক-রাজনৈতিক বার্তা দেখা যায়। প্রায়ই দুর্নীতি, শাসনব্যবস্থা, করপোরেট শোষণ এবং নাগরিক অধিকারকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হত সেসব সিনেমার গল্প।
তার শেষ সিনেমা ‘জানা নায়াগন ’২০২৩ সালের তেলুগ সিনেমা ‘ভগবন্ত কেশরী’র তামিল রিমেক। সিনেমার গল্প আবর্তিত হয়েছে জোরালো রাজনৈতিক বার্তা নিয়ে।

বিজয়ের টিভিকের যাত্রা শুরু হয় ২০২৪ সালে।
তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচনে ১০৮টি আসনে জিতে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন না পাওয়ায় সরকার গঠন করতে পারছিল না টিভিকে। বিজয় দুটি আসনে জয় পাওয়ায় টিভিকের বিধায়ক সংখ্যা ১০৭।
৫টি আসনে জয় পাওয়া কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করার পর তাদের মোট আসন দাঁড়ায় ১১২। কিন্তু সরকার গঠন করার জন্য বিধানসভার মোট ২৩৪ আসনের মধ্যে প্রয়োজন ছিল অন্তত ১১৮টি আসন।
শুক্রবার দুই বাম দল সিপিএম ও সিপিআই টিভিকের প্রতি সমর্থনের কথা ঘোষণা করে। এই দুই দলের চার আসন মিলিয়ে সংখ্যাটি ১১৬ থেকে ঠেকে। কিন্তু আরও দুই আসনের ঘাটতি রয়েই যায়।
শনিবার দ্রাবিড় তামিল জাতীয়তাবাদী দল ভিডুথালাই চিরুথাইগাল কাচ্চির (ভিসিকে) ও ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লিগ (আইইউএমএল) টিভিকের প্রতি শর্তহীন সমর্থন জানায়। বিধানসভায় এই দুই দলের প্রত্যেকের দুইটি করে আসন থাকায় তাদের সমর্থনে টিভিকের নেতৃত্বাধীন জোটের মোট আসন ১২০টিতে পৌঁছে যায়। এতে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ১১৮ এর ‘ম্যাজিক ফিগার’ পার হয়ে যায় তারা।
এর মধ্য দিয়ে চার দিন ধরে চলা রাজনৈতিক অচলাবস্থার অবসান হয়।
আরও পড়ুন:
তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হলেন বিজয়, শপথের মঞ্চে রাহুল গান্ধী
তামিলনাড়ুর থালাপতি বিজয় নিলেন মুখ্যমন্ত্রীর শপথ
সিনেমাই বিজয়ের রাজনীতিক হওয়ার ক্ষেত্র তৈরি করেছিল
তামিল নাড়ুতে প্রথমবারেই বাজিমাত থালাপতি বিজয়ের