Published : 06 May 2026, 10:54 AM
বিজয় থালাপতি ২০২৪ সালে যখন তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম নামের দল গড়েন, তার বহু আগেই দক্ষিণী সিনেমার এই তারকার রাজনীতিতে নামার ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছিল। মূলত তার অভিনীতি সিনেমাগুলো এক্ষেত্রে অন্যতম ভূমিকা রেখেছিল।
এনডিটিভি বলছে, দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিজয়ের সিনেমাগুলো রোমান্টিক, বিনোদনমূলক থেকে সামাজিক ও রাজনৈতিক গল্পের পথে হেঁটেছে। এসব সিনেমায় দুর্নীতি, শাসনব্যবস্থার সমস্যা, জনকল্যাণ এবং নাগরিক অধিকারের মতো বিষয়গুলো স্থান পেয়েছে।
অনেকের মতে, বিজয়ের রাজনীতিতে আসা কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং তা ছিল সেসব ধারণারই বাস্তবায়ন, যা তিনি বারবার পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন।
২০১০ সালের পর থেকেই বিজয় থালাপতির কিছু সিনেমায় স্পষ্ট রাজনৈতিক বা সামাজিক-রাজনৈতিক বার্তা দেখা যায়। প্রায়ই দুর্নীতি, শাসনব্যবস্থা, করপোরেট শোষণ এবং নাগরিক অধিকারকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হত সেসব সিনেমার গল্প।
তার শেষ সিনেমা ‘জানা নায়াগন’ ২০২৩ সালের তেলুগু ছবি ‘ভগবন্ত কেশরী’র তামিল রিমেক। সিনেমার গল্প আবর্তিত হয়েছে জোরালো রাজনৈতিক বার্তা নিয়ে।
থামিজান (২০০২)
বিজয়ের যে রাজনীতিতে ঝোঁক ছিল, প্রথম তার ইঙ্গিত মেলে 'থামিজান' সিনেমায়। এখানে তিনি তিনি বিচার বিভাগ ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করা এক তরুণ আইনজীবীর চরিত্রে অভিনয় করেন। সিনেমায় নাগরিক দায়িত্ব, আইনি সচেতনতা এবং নৈতিক শাসনের ওপর আলোকপাত করা হয়েছিল। দুই হাজার সালের শুরুতে মুক্তি পাওয়া সিনেমায় বিজয়ের আদর্শবাদী সংস্কারক হিসেবে ভাবমূর্তি তৈরি হয়, যা তার পরের সিনেমাগুলোতেও ঘুরেফিরে এসেছে।
থুপ্পাক্কি (২০১২)
এ আর মুরুগাদোস পরিচালিত সিনেমাটি সন্ত্রাসী স্লিপার সেল খুঁজে বের করা একজন সেনা কর্মকর্তাকে নিয়ে। নির্বাচনি রাজনীতির বিষয় না হলেও এখানে একটি শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী ও সন্ত্রাসবিরোধী আখ্যান ছিল, যা ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিষয়ক উদ্বেগের ওপর আলোকপাত করে। এতে নায়ককে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যিনি প্রাতিষ্ঠানিক ত্রুটি সংশোধন করেন।
থালাইভা (২০১৩)
নেতৃত্ব এবং জনদায়িত্বকে কেন্দ্র করে নির্মিত গল্পে বিজয় প্রবেশ করেন ‘থালাইভা’ সিনেমা দিয়ে। এই সিনেমায় দেখানো হয়ম একজহন সাধারণ মানুষকে ক্ষমতা বসতে বাধ্য করা হয়। এর ট্যাগলাইন, ‘নেতৃত্ব দেওয়ার সময় এসেছে’ রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেয় এবং তামিলনাড়ুতে এর মুক্তি বিলম্বিত হয়। এতেই বোঝা যায়, সে সময়ে সিনমোটির বিষয়বস্তু কতটা সংবেদনশীল ছিল।
কাথি (২০১৪)
বিজয়ের রাজনৈতিক সিনেমার সম্ভবত সবচেয়ে বহুল আলোচিত উদাহরণ ‘কাথি’। এটির পরিচালকও এ আর মুরুগাদোস। সিনেমায় কৃষকের আত্মহত্যা, ভূমি অধিগ্রহণ, করপোরেট শোষণ এবং পানির অধিকারের মতো বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।
এখানে কৃষির সংকট এবং করপোরেট জবাবদিহিতা নিয়ে বিজয়ের দীর্ঘ বক্তৃতা দেখানো হয়েছে, যা দর্শক এবং আন্দোলনকারী বিভিন্ন গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে গভীর প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়। সিনেমাটির প্রভাব এতটাই ছিল যে, তামিলনাড়ুতে রাজনৈতিক সচেতনতা নিয়ে আলোচনায় প্রায়ই এর নাম আসে।
মার্সাল (২০১৭)
এই সিনেমায় বিজয়ের রাজনীতির প্রতি আগ্রহ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এতে চিকিৎসাক্ষেত্রে দুর্নীতি ও বৈষম্যের সমালোচনা, জিএসটি ও জননীতি সম্পর্কিত বিতর্কিত সংলাপ ছিল, যা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি হয়।
সরকার (২০১৮)
‘সরকার’ এমন একটি সিনেমা, যেখানে বিজয় থালাপতির বাস্তব জীবনের গল্পের ইঙ্গিত দেয়। সিনেমার গল্প অঅবর্তিত হয়েছে একজন প্রবাসী ভারতীয় (এনআরআই) ব্যবসায়ীকে ঘিরে, যিনি ভোট দিতে ভারতে ফিরে এসে ভোট জালিয়াতি আবিষ্কার করেন। পরে তিনি নিজেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
সিনেমায় ভোটাদের অধিকার, নির্বাচনি দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক সংহতির কথা বলে, যা তরুণ দর্শকদের মনে দাগ কাটে। তামিলনাড়ু নির্বাচনে বিজয়ের দলের বিজয়ের পর ‘সরকার’ সিনেমা এবং বাস্তবতার মধ্যেকার সাদৃশ্য গণমাধ্যমে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
বিগিল (২০১৯)
নারী ফুটবলার ও খেলোয়াড়দের নানা সামাজিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে নির্মিত এই সিনেমা। সরাসরি রাজনৈতিক না হলেও, এই সিনেমা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়ে বিজয় থালাপতির মনোযোগ আরও পাকাপোক্তভাবে প্রমাণ করে।
মাস্টার (২০২১)
‘মাস্টার’ সিনেমায় উঠে এসেছে শিশুদের বিচার ব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং শাস্তির পরিবর্তে পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয়তার কথা। কীভাবে বড় বড় অপরাধীরা তরুণদের প্রভাবিত করে এবং পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যর্থতার কথাও এসেছে এই সিনেমায়।
লিও (২০২৩)
ততটা রাজনৈতিক না হলেও এই সিনেমায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধ কাঠামো বিষয় এসেছে। বিজয় যে জটিল ও চ্যালেঞ্জিং চরিত্রে কাজ করতে আগ্রহী ছিলেন, সেটির প্রমাণ দেয় এই সিনেমা।
মোটাদাগে বিজয় থালাপতির সিনেমাগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। ক্যারিয়ারের শুরুতে- বেশিরভাগ রোমান্টিক ও পারিবারিক সিনেমা, ২০১০ সালের পর- সামাজিক সচেতনামূলক অ্যাকশন সিনেমা এবং ২০১০ এর দশকের পর- রাজনৈতিক গল্পে নির্মিত সিনেমা (মার্সাল, সরকার, কাথি)।
বিজয়ের সিনেমাগুলো পর্যালোচনায় দেখা যায়, তার পুরো ক্যারিয়ারে সুস্পষ্টভাবে রাজনৈতিক সিনেমা কম হলেও ধীরে ধীরে তার ‘নেতা’ ভাবমূর্তি গঠনে সেগুলোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বলা যায়, বিজয়ের সিনেমাগুলো খুব কমই নিখাদ রাজনৈতিক, বরং অনেকগুলো শক্তিশালী সামাজিক-রাজনৈতিক বার্তায় মোড়া বাণিজ্যিক বিনোদনমূলক ছবি।
সিনেমার চরিত্রগুলো সময়ের সাথে সাথে তাকে সাধারণ মানুষের রক্ষক, জননেতার ভাবমূর্তি তৈরিতে এবং অভিনেতা থেকে বাস্তবের রাজনীতিক হিসেবে তার উত্তরণে সহায়তা করেছে।