Published : 29 Jun 2026, 04:23 PM
বরেণ্য চিত্রশিল্পী, নাট্যনির্দেশক ও পাপেট চর্চার অন্যতম প্রাণপুরুষ ‘পাপেটম্যান’ খ্যাত মুস্তাফা মনোয়ারের প্রয়াণে শোকার্ত তার সতীর্থরা।
তার বিস্তৃত কর্ম পরিসরের নিয়ে অল্প কথায় তাকে মূল্যায়ন করাও কঠিন বলে মন্তব্য করেছেন কেউ কেউ।
তার চলে যাওয়াকে দেশের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে তুলে ধরে তারা বলেছেন, এই শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।
শিল্পীর মৃত্যুর খবর পেয়ে ধানমন্ডির বাসভবনে আসেন চিত্রশিল্পী রফিকুন্নবীর। সেখানে স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, “স্যার ছিলেন আমাদের দেশের সৃষ্টিশীল জগতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী ব্যক্তিত্ব। সাংস্কৃতিক জগতের একজন বিশিষ্টজন ছিলেন। তার এই মৃত্যু আমাদের দেশ ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। তার যে শূন্যতা তৈরি হল, তা পূরণ করা সহজ হবে না।”
মুস্তাফা মনোয়ারের বহুমাত্রিক প্রতিভার কথা তুলে ধরে রফিকুন্নবী বলেন, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সাথে তিনি জড়িত ছিলেন। এত এত কিছু যে, সেটা হিসাব করা অত্যন্ত কঠিন।
“দেশের সাংস্কৃতিক জগতের সৃজনশীল, সৃষ্টিশীল ব্যক্তিদের কথা যদি বলি, উনি শ্রেষ্ঠদের একজন। তার কর্মকাণ্ড ছবি আঁকা থেকে শুরু করে পাপেট, নাটকসহ বিভিন্ন দিকে বিস্তৃত ছিল। এসব কর্মকাণ্ডে তিনি এতটাই সিদ্ধহস্ত ছিলেন যে, তার মত এত বড় মাপের মানুষের মূল্যায়ন করা আমার পক্ষে কঠিন।”

পাপেটের মাধ্যমে মুস্তাফা মনোয়ার সমাজ ও দেশের চিত্র ফুটিয়ে তুলেছিলেন জানিয়ে তিনি আরও বলেন, “এই পাপেট শো-তে উনি দেশের সংস্কৃতি, দেশের মানুষ ও প্রকৃতিকে তুলে ধরতেন। এটা কেবল সাধারণ বিনোদনের জন্য করা, তেমনটা ছিল না। পাপেট শো-র মধ্য থেকে বিষয়টিকে অর্থবহ করার চেষ্টা করতেন এবং তিনি সফল হয়েছেন। দেশ-বিদেশে তার পাপেট প্রদর্শিত হয়েছে, পুরস্কার ও স্বীকৃতি এসেছে। তাই তার স্থানটি যে অপূরণীয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।”
‘আমাদের একজন অভিভাবক হারালাম’
বাসভবনে উপস্থিত ছিলেন চিত্রশিল্পী মনিরুজ্জামান। তিনি বলেন, অসুস্থ থাকাকালীনও মুস্তাফা মনোরয়ারের ভাবনায় ছিল দেশ ও কাল।
“উনি আমাদের এই সময়কার সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ শিল্পী ছিলেন। দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন। আমরা আসা-যাওয়ার মধ্যে ছিলাম, তাকে দেখেছি। মৃত্যুর আগেও উনি শয্যায় বসে বাংলাদেশ নিয়ে ভাবতেন। বাংলাদেশের সংস্কৃতি, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতেন এবং আমাদের সাথে সেই অসুস্থ অবস্থায়ও রস-তামাশা করতেন। ভালো লাগতো। আজ সকালে উনি অন্তিম যাত্রায় চলে গেলেন, আমরা আমাদের একজন অভিভাবক হারালাম।”
সংস্কৃতি ও বাংলাদেশের প্রতিটি অঙ্গনে মুস্তাফা মনোয়ারের অবদান অনস্বীকার্য তুলে ধরে মনিরুজ্জামান বলেন, “শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের হাত ধরে '৪৭ পরবর্তী বাংলাদেশে আসা, '৫২-র ভাষা আন্দোলন, '৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ, বিটিভি প্রতিষ্ঠা— সব কাজের সাথেই উনি প্রথম সারিতে ছিলেন। শহীদ মিনারের যে বড় লাল সূর্যটা আপনারা দেখেন, উনার তত্ত্বাবধায়নেই কতিপয় শিল্পীকে নিয়ে তা করা হয়েছিল। তখন ইমদাদ হোসেনসহ আরো অনেকেই ছিলেন। তাদেরকে নিয়ে প্ল্যানটা কিন্তু তারই ছিল, যে একটা সূর্য দিতে হবে— কোথায় যেন খালি খালি মনে হয়। এই চিন্তাভাবনাগুলো তার ভিতরে ছিল এবং উনি আমাদেরকে অনেক সমৃদ্ধ করে গেছেন। বর্তমান সময়েও তাঁর মতো অভিভাবকের আমাদের দরকার ছিল।”

‘তিনি আমার গুরু’
মুস্তাফা মনোয়ার হচ্ছেন অভিনেত্রী নিমা রহমানের ছোট মামা। তবে আত্মীয়তার সম্পর্কের বাইরেও তাদের মধ্যে ছিল গভীর এক শিক্ষক-শিষ্যের সম্পর্ক।
মামা ও গুরুর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন নিমা রহমান।
তিনি বলেন, “আমার ছোট মামা হয়। কিন্তু বড় কথা, তিনি আমার গুরু। আমার জীবনের অনেক কিছুই তার কাছ থেকে শেখা। আজ কী বলব, কিছুই বলতে পারছি না।”
তার পাশেই বসে ছিলেন অভিনেতা তারিক আনাম খান।
শিল্পীকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে আসেন চারুপীঠ সংস্কৃতির সাথে যুক্ত লেখক ও সংগীতশিল্পী শামস মনোয়ার। নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করে তিনি বলেন, “মুস্তাফা মনোয়ার চাচা আমার বাবার একেবারেই ছোটবেলার বন্ধু। উনি ছিলেন আমার উৎসাহের প্রদীপ। আমার প্রতিটি বইমেলাতে, আমার যখন বই বের হতো উনি আসতেন। একবারও আমাকে মানা করেননি। শুধু একবার উনি অসুস্থ ছিলেন (তাই আসতে পারেননি)। এক কথায় বলতে হয় যে, আমি খুব মর্মাহত। উনি ছিলেন উৎসাহের প্রদীপ।”
দীর্ঘদিন ধরে নানা রোগে ভুগে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে এই সব্যসাচী শিল্পীর মৃত্যু হয়। মুস্তাফা মনোয়ারের বয়স হয়েছিল ৯১ বছর।
মুস্তাফা মনোয়ারের মরদেহ মঙ্গলবার নেওয়া হবে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) প্রাঙ্গণে। সেখানে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।
এরপর বিটিভি থেকে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে মরদেহ নিয়ে আসা হবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মরদেহ দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সেখানেই রাখা হবে বলে জানিয়েছেন চিত্রশিল্পী মনিরুজ্জামান।
তিনি আরও জানিয়েছেন শহীদ মিনার থেকে মরদেহ নেওয়া হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে, সেখানে জানাজা সম্পন্ন হবে। জানাজা শেষে মরদেহ আধা ঘণ্টার জন্য নেওয়া হবে তার প্রিয় কর্মস্থল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে। তারপর বিকালে বনানী কবরস্থানে সমাহিত করা হবে মুস্তাফা মনোয়ারকে।
আরও পড়ুন-
মুস্তাফা মনোয়ার: শিল্পের জন্য এক জীবন