Published : 17 Apr 2026, 11:50 PM
চট্টগ্রামের ‘ফুসফুস’ সিআরবি এলাকায় হাসপাতাল স্থাপনের প্রকল্প ‘পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগের’ খবরে ফের আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন নাগরিক অধিকার কর্মী ও পরিবেশবাদীরা।
শনিবার দুই দিনের সফরে চট্টগ্রাম আসছেন সড়ক পরিবহন ও রেল মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। রোববার বিকেল ৪টায় তার সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং (সিআরবি) এলাকায় প্রস্তাবিত হাসপাতালের স্থান পরিদর্শনের কথা রয়েছে।
বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর চট্টগ্রামে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সিআরবি রক্ষার ডাক দিয়েছেন।
তাদের যুক্তি, চট্টগ্রামের প্রাণকেন্দ্রে সবুজে ঘেরা ওই জমিতে অবকাঠামো নির্মাণ করতে গেলে গাছপালা কাটা পড়বে এবং অনিন্দ্য সুন্দর ওই পরিবেশ নষ্ট হবে।
এ বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে শুক্রবার সন্ধ্যায় বৈঠক করেছে ‘সিআরবি রক্ষা মঞ্চ’। আগামী রোববার সিআরবি এলাকায় মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশের ডাক দিয়েছে সংগঠনটি।
২০২১ সালের জুলাই মাসে এ প্রকল্পের জমি হাসপাতাল নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলে প্রতিবাদ ও আন্দোলন শুরু হয়। টানা ১৫ মাস ধরে সেই আন্দোলন চলে।
সেই আন্দোলনে ‘নাগরিক সমাজ, চট্টগ্রাম’ এবং ‘সিআরবি রক্ষা মঞ্চ’সহ বেশ কিছু সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন অংশ নিয়েছিল।
এক পর্যায়ে তখনকর আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী, সংসদ সদস্যসহ স্থানীয় অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের নেতা সিআরবিতে হাসপাতাল না করার পক্ষে অবস্থান নেন।
টানা ৪৮০ দিন ধরে চলা সেই আন্দোলনের মুখে এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগ সরকার সিআরবিতে হাসপাতাল প্রকল্প বাস্তবায়ন না করার ঘোষণা দেয়।
ওই আশ্বাসে ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে সেই আন্দোলন শেষ হয়। প্রায় তিন বছর চার মাস পর সিআরবিতে হাসপাতাল প্রকল্পের বিষয়টি আবারও সামনে এল।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ট্র্যাক) মো. মনিরুজ্জামান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে (পিপিপি) প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ের সঙ্গে ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড কোম্পানির একটি চুক্তি হয়েছিল।

“সেটি ৫০ বছরের চুক্তি। সেখানে ৫০০ শয্যার একটি হাসপাতাল এবং ১০০ আসনের একটি মেডিকেল কলেজ করার কথা ছিল। তখন জমি হস্তান্তরের সময় পরিবেশবাদীদের আন্দোলনের কারণে আর তা হয়নি।”
রোববার রেলপথ মন্ত্রী ওই প্রকল্পের স্থানটি পরিদর্শন করবেন জানিয়ে মনিরুজ্জামান বলেন, “মন্ত্রী মহোদয় পরিদর্শনে আসবেন, সেটা জানি। তবে প্রকল্পের বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানি না।”
হাসপাতাল প্রকল্পের জন্য চুক্তি হওয়া সেই ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজের সঙ্গে এ বিষয়ে নতুন করে রেলওয়ের কোনো যোগাযোগ হয়নি বলেও জানান তিনি।
এর মধ্যে বৃহস্পতিবার রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের সদর দপ্তর সিআরবি এলাকায় প্রস্তাবিত ওই হাসপাতাল প্রকল্প সংলগ্ন সাত রাস্তার মোড়ে থাকা ২০টি দোকান উচ্ছেদ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পূর্ব রেলের কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, “এটা আমাদের নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযানের অংশ।”
রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের সদর দপ্তর-সিআরবি এলাকার ৬ একর জমিতে প্রস্তাবিত হাসপাতালটি নির্মাণের কথা রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (করপোরেট অ্যাফেয়ার্স) কায়েস খলিল খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এখন পর্যন্ত নতুন করে কোনো কিছু আমরা ওয়াকিবহাল নই। সেটা সরকারের প্রকল্প, সরকার জানে। সুনির্দিষ্টভাবে এই হাসপাতাল প্রকল্পের বিষয়ে সরকার বা রেলওয়ের সাথে আমাদের এখন পর্যন্ত কথা হয়নি।
“চুক্তিটি ছিল ৫০ বছরের। আজ পর্যন্ত সরকার আমাদের অফিসিয়ালি বলেনি যে সেখানে হাসপাতাল হবে না।”
কায়েস খলিল খান বলেন, “চুক্তির শর্তাদি আমরা পালন করেছি। কিছু ডিপোজিটও সরকারকে তখন দিয়েছিলাম। এছাড়া আমাদের কিছু আনুষাঙ্গিক খরচও হয়েছিল। চুক্তি মতে আমাদের দিক থেকে যেটা করার, সেটা তখন আমরা করেছি।”

এদিকে সিআরবিতে প্রস্তাবিত হাসপাতালের স্থানে রেলমন্ত্রীর পরিদর্শনের সূচি জানাজানি হলে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়।
সিআরবি রক্ষায় আন্দোলনকারীদের অন্যতম সৈয়দ হাসান মারুফ রুমি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সিআরবিতে হাসপাতালের নামে স্থাপনা চট্টগ্রামবাসী অতীতের মত প্রতিহত করবে। সিআরবি শুধু চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রই নয় এটি আমাদের কৌশলগত উন্মুক্ত স্থান এবং ঐতিহ্যেরও অবিচ্ছেদ্য অংশ।
“রোববার মন্ত্রী সিআরবি পরিদর্শনের কথা রয়েছে। আমরা রোববার সিআরবিতে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করব। পাশাপাশি ঢাকাতেও আমরা সেদিন প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করব।”
সিআরবি রক্ষা মঞ্চের আহ্বায়ক, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক ডা. মাহফুজুর রহমান ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “জরুরি ভিত্তিতে আমরা মঞ্চের সভায় বসেছি করণীয় ঠিক করতে। সিআরবি দখলের জন্য সেখানে হাসপাতাল প্রকল্প করতে চায় একটি গোষ্ঠী।
“সিআরবিতে ৫০০ শয্যার হাসপাতাল এবং ১০০ আসনের মেডিকেল কলেজ করলে ওই এলাকায় একের পর এক স্থাপনা হবে। ধীরে ধীরে সেখানে রেলওয়ের যত জমি আছে সব ওই প্রকল্পের অধীনে চলে যাবে। চট্টগ্রাম শহরে রেলের অনেক জমি আছে। সিআরবিতেই কেন হাসপাতাল করতে হবে? আমরা আন্দোলনের ডাক দিচ্ছি।”
জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির চট্টগ্রাম মহানগরীর যুগ্ম সমন্বয়কারী আরিফ মঈনুদ্দিন শুক্রবার এক ফেইসবুক পোস্টে লেখেন, “সিআরবিতে আমরা হাসিনাকে হাসপাতাল করতে দিই নাই। তারেক রহমান, আপনাকেও দেব না। সিআরবি চট্টগ্রামের ফুসফুস। এখানে হাত দিয়েন না।”
এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সংগঠক মো. জোবাইরুল হাসান আরিফ শুক্রবার এক ফেসবুক পোস্টে লেখেন, “চট্টগ্রামের সিআরবিতে যারা হাসপাতাল করতে চায় তাদের উল্টো হাসপাতালে ভর্তি করানো উচিত। কেমন মানসিকতা থেকে পুরো চট্টগ্রাম হসপিটালাইজড হয়ে যাক এমনটা চায় তাও গবেষণার বিষয়।
“খোদ আওয়ামী লীগের এমপি-মন্ত্রীরা চট্টগ্রামের ফুসফুস কেটে হাসপাতাল করার পরিকল্পনার সাথে নাই বলে পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছিল। এখান থেকে শিক্ষা না নিয়ে উল্টো দেখি এসেছে নতুন শিশু (সরকার)! তার প্ল্যানকে কিভাবে স্থান ছেড়ে দিবে চাটগাঁইয়ারা!”
নগরীর এম এ আজিজ স্টেডিয়ামের পশ্চিম পাশের সড়ক ধরে কদমতলীর দিকে এগিয়ে গেলে পাহাড়ে ঘেরা রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সদর দপ্তর সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং (সিআরবি)।
সড়কের ডান পাশে পাহাড়ের ওপর সিআরবি ভবন। আর বাঁ পাশে বর্তমান রেলওয়ে হাসপাতাল। সিআরবি ভবনের সামনের মোড়টি সিআরবি সাত রাস্তার মোড় নামে পরিচিত। এখান থেকে সাতটি ছোট বড় রাস্তা বিভিন্ন দিকে চলে গেছে।
সিআরবি মোড় থেকে টাইগার পাস, কদমতলী ও জিএম বাংলোমুখী সড়কগুলোর দুপাশে আছে শতবর্ষী রেইন ট্রি ও বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। টাইগারপাস ও জিএম বাংলোমুখী সড়কের মাঝে বড় মাঠে থাকা শিরীষ গাছের তলায় প্রতি বছর হয় বর্ষবরণের অনুষ্ঠান।
সড়কের বাম পাশে বর্তমান রেলওয়ে হাসপাতাল, পাশের খালি জমি, রেলওয়ে হাসপাতাল কলোনি রোড এবং এই রাস্তাটির দুপাশে থাকা জমি নিয়ে মোট ছয় একর জমিতে হাসপাতালটি নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
২০১৩ সালের ১৪ আগস্ট অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির (সিসিইএ) সভায় প্রকল্পটি পিপিপিতে বাস্তবায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। গত বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি পিপিপি প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয় সিসিইএ সভায়। সর্বশেষ ২০২০ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী চূড়ান্ত অনুমোদন দেন।
এরপর ২০২০ সালের ১৮ মার্চ ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের সাথে সঙ্গে চুক্তি করে বাংলাদেশ রেলওয়ে। তারপর ২০২১ সালের শুরুতে নির্ধারিত জমির সামনে প্রকল্পের একটি সাইনবোর্ড লাগানো হয়।
এই প্রকল্পের পরিকল্পনা ও সহযোগী সংস্থা বাংলাদেশ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব কর্তৃপক্ষ (পিপিপি)। কার্যনির্বাহী সংস্থা বাংলাদেশ রেলওয়ে এবং বাস্তবায়ন ও পরিচালনা করবে ‘ইউনাইটেড চট্টগ্রাম হাসপাতাল লিমিটেড’।
প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ ধরা হয়েছে ১২ বছর। প্রকল্পের আওতায় ১০০ আসনের একটি মেডিকেল কলেজ, ৫০ আসনের একটি নার্সিং ইনস্টিটিউট এবং দুই ধাপে মোট ৫০০ শয্যার একটি হাসপাতাল নির্মাণ করা হবে। এতে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা খরচ হবে। ৫০ বছর পর প্রকল্পের পুরো মালিকানা পাবে রেলওয়ের।
ওই চুক্তির পর প্রজেক্ট ডেভেলপমেন্ট এবং প্রিমিয়াম বাবদ রেলওয়েকে প্রায় আট কোটি টাকা পরিশোধ করেছিল ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ।
রিলেটেড লিংক-
'সিআরবিতে হাসপাতাল হচ্ছে না' খবরে সন্তোষ, মহাসমাবেশের ডাক
সিআরবিতে হাসপাতাল নিয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন প্রধানমন্ত্রী: রেলমন্ত্রী
সিআরবিতে হাসপাতাল প্রকল্প, বিরোধিতা নানা প্রশ্নে
সিআরবিতে হাসপাতাল হতে দেবেন না বঙ্গবন্ধুকন্যা, আশা অনুপম সেনের