Published : 04 May 2026, 08:52 PM
পাঁচটি আট হাজারি পর্বত চূড়ায় সফল অভিযানকারী বাবর আলীর মতে, পর্বত আরোহনে সফল হতে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা দরকার, কিন্তু সেই সঙ্গে দরকার ‘তীর্থযাত্রীর মত’ একটি মন।
শনিবার ভোরে নেপালের মহালাঙ্গুর হিমালয়ে আট হাজার ৪৮৫ মিটার উচ্চতার মাউন্ট মাকালু শীর্ষে প্রথমবারের মত বাংলাদেশের পতাকা ওড়ান বাবর।
সেদিনই তিনি নেমে আসতে শুরু করেন। শনিবার বিকেলে পৌঁছে যান বেস ক্যাম্পে। এরপর সোমবার টেলিফোনে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দেওয়া সাক্ষাতকারে নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন এভারেস্টজয়ী বাবর।
এবারের যাত্রায় সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ কি ছিল বাবরের সামনে?
উত্তরে তিনি বলেন, “এ ধরনের আট হাজারি পর্বতে আসলে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয় অতি উচ্চতা। এর সাথে থাকে বাতাস এবং ঠান্ডা। বাতাস এবং ঠান্ডা–এগুলো আসলে সব পর্বতেই থাকে। তবে এই পর্বতের ক্ষেত্রে এটা অনেক বেশি ছিল।
“আমরা যেরকম ধারণা করেছিলাম, এরচেয়ে অনেক বেশি ঠান্ডা এবং খুবই উইন্ডি ছিল। একইসাথে এই পর্বতের আবহাওয়া অনেকটুকু মিসটিক। খুবই অস্বাভাবিক আচরণ করেছে পুরোটা সময়। অন্যসময় ওয়েদারের জন্য আমরা যেসব ওয়েবসাইটের উপর নির্ভর করি, এবার অনেক বেশি বেগ পেতে হয়েছে। খুবই রহস্যময় আচরণ করেছে এবারের ওয়েদার।”
নেপালি শব্দ ‘মাকালু’ অর্থ মহা পিরামিড। সেখানে প্রচুর বাতাসের কারণে তুষার ধসের প্রবণতা থাকে। চূড়ার অংশ পিরামিডের মত। বাতাসে ঘন ঘন বরফ ঝরে পড়ে, তাই শীর্ষ অংশ কালো। মহা কালো থেকে নাম হয়েছে- মাকালু।
মাকালু বা মহা কালু এক ‘নি:সঙ্গ পবর্ত’। বাবর আলীকে মাকালু কীভাবে গ্রহণ করল?
এ পর্যন্ত পাঁচটি আট হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার পর্বতে আরোহনকারী বাবর বলেন, “যে কোনো পর্বত আরোহনের জন্য স্কিল আর এক্সপেরিয়ান্স যেমন দরকার; একইসাথে পাহাড় বা প্রকৃতি আপনাকে গ্রহণ করছে কিনা সেটা খুব ইমপর্টেন্ট। আমরা অনেকে হয়ত খুব কলোনিয়াল মাইন্ড সেট নিয়ে পাহাড়ে আসি যে, আমি এটা জয় করতে চাই।
“আমি পারসোনালি যেভাবে পাহাড়ে আসি, অনেকটুকু তীর্থযাত্রীর মন নিয়ে। এবং সেই তীর্থযাত্রীর মনটুকু আসলে থাকা দরকার। যখন তীর্থযাত্রীর মন নিয়ে পাহাড়ে আসবেন, তখন সমপণটুকু আপনার কাছে থাকবে। যখন সো কল্ড জয় করতে আসবেন, সেটা একদম ভিন্ন ব্যাপার।”
তিনি বলেন, “আমি ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি উচ্চতার একজন মানুষ। আমি কীভাবে ২৭ হাজার ৮৩৮ ফুট উঁচু একটা মাউন্টেন, সেটা জয় করতে পারি? আমি অল্প সময়ের জন্য সেটা ছুঁতে পারি।
“প্রকৃতিকে তো আসলে আমরা কখনোই জয় করতে পারি না। মানুষ হয়ত খুব অল্প সময়ের জন্য সেটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। আমার কাছে মনে হয়, সমর্পিত হতে জানাটা খুবই জরুরি পাহাড়ের কাছে।”

সঙ্গী যারা
এবারের অভিযানে ইয়াংডু নামের এক সারমেয়ও ছিল বাবরদের দলের সঙ্গী। ইয়াংডুর সঙ্গ কতটা উপভোগ করেছেন, সেই গল্পও শোনালেন এই বাংলাদেশি অভিযাত্রী।
তিনি বলেন, “ইয়াংডুর সাথে আমাদের প্রথম পরিচয় হয় লাংমালে খারকা বলে একটা জায়গায়। খারকা মানে ঘাসের ময়দান। যেখানে শীতের পরে বসন্তে অথবা বর্ষার পরে শরতের সময় যারা ইয়াক বা চমরি গাই পালে অথবা ভেড়া পালে তারা তাদের পশুগুলোকে নিয়ে আসে যাতে তাদের খাবারের সংস্থান হয়।
“সেটা প্রায় ৪৩০০ মিটার উচ্চতার জায়গা। ওখান থেকে আরেকটা দলের সাথে সে বেস ক্যাম্পে আসে। সেখান থেকে যখন আমরা হাইয়ার বেস ক্যাম্পে রওনা দিই তখন খেয়াল করি ইয়াংডু আমাদের সাথে চলছে। বেস ক্যাম্পে যতদিন আছি পুরো সময়টুকু সাথে ছিল।”
পর্বতের সেই উঁচু অংশে ইয়াংডু খাবার পানির সমস্যায় পড়েছিল জানিয়ে বাবর বলেন, রোদ উঠলে অল্প বরফ গললে হয়ত সে পানি খেতে পারছিল। পুরো যাত্রায় ইয়াংডুর সঙ্গটা ছিল এক আশীর্বাদ।
“কারণ মাকালুতে খুব বেশি অভিযান হয় না। খুব অল্প লোকজন। এরমধ্যে দারুণ বিশ্বস্ত প্রাণীর সঙ্গ পাওয়াটা দারুণ ব্যাপার।”
এবার মাকালু অভিযানে বাবরের দলে অভিযাত্রী ছিলেন মোট ছয়জন। তাদের মধ্যে দুজন ফরাসি, একজন ইউক্রেইনিয়ান, একজন রাশিয়ান এবং অন্যজন দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিক।
তাদের মধ্যে বাবরসহ তিনজন শেষ পর্যন্ত মাকালু চূড়ায় পৌঁছাতে পেরেছেন। দুজন অভিযানের মাঝপথে ফিরে গেছেন। বাকি একজন আগামী বুধবার চূড়ার উদ্দেশে রওনা হবেন।
দুই মৃত আরোহীর খোঁজে এক শেরপা
প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে মাকালু চূড়ায় পৌঁছাতে পারা বিশেষ কিছু। এই অর্জনের পর কেমন লাগছে জানতে চাইলে বাবর বলেন, “নিঃসন্দেহে যে কোনো পর্বতের চূড়ায় উঠতে পারটা দারুণ একটা অনুভূতি। আমি সবসময় বিশ্বাস করি, একটি উঁচু পবর্তের চূড়ায় আমি উঠলে আমার সাথে দেশ একটু খানিকটা হলেও উপরে ওঠে।
“আমরা হিমালয়ের এত কাছে এবং পুরো দেশটা আসলে হিমালয়ের দান বলা যায়। সে জায়গায় আমাদের একদমই কন্ট্রিবিউশন কম। হিমালয়ের এত কাছে হয়েও ওরকম সুযোগ হয়ে ওঠেনি। শুধু মাকালু না, যে কোনো পর্বত চূড়ায় দেশের পতাকা হাতে দাঁড়াতে পারাটা নিঃসন্দেহে দারুণ একটা অনুভূতি।”
মাকালুর পর কোন পর্বতে অভিযানে যেতে চান বাবর? এই অভিযাত্রী বললেন, এখনই বলা মুশকিল।
“পৃথিবীর ১৪টা আট হাজার মিটারের মধ্যে সাতটাই ক্লাইম্ব হয় নেপাল থেকে। পাঁচটা আমি ইতোমধ্যে ক্লাইম্ব করে ফেলেছি। দুটো তিব্বতে রয়েছে, বাকি পাঁচটা রয়েছে পাকিস্তানে।
“দেখা যাক, সবকিছু মিলে গেলে ইটস হাই টাইম টু গো টু পাকিস্তান। পাকিস্তানেও অনেক চ্যালেঞ্জিং মাউন্টেইন আছে। সে চ্যালেঞ্জটুকু নিতে আমি প্রস্তুত। বাকিটা আসলে সময় বলে দেবে।”
এবারের মাকালু অভিযানের বিশেষ কোন অভিজ্ঞতার কথা মনে থাকবে বাবরের?
তিনি বললেন, “ফাইনাল সামিটে আমি আর আং কামি শেরপা যাচ্ছিলাম। আমাদের সাথে আরেকজন যাচ্ছিল– রিনজে শেরপা। আমরা চূড়ার উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলাম। আর রিনজের আরেকটা উদ্দেশ্য ছিল।
“সেটা হচ্ছে গত জানুয়ারির শীতকালীন অভিযানে এই পাহাড়েই দুজন আরোহী প্রাণ হারিয়েছে–একজন শেরপা এবং একজন ইরানি পর্বতারোহী। রিনজে আসলে যাচ্ছিল ওদের ডেডবডিটা খোঁজার জন্য।”
সেই অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বাবর বলেন, “আমরা যেতে যেতে ভাবছিলাম, জীবন কত অদ্ভূত বৈপরীত্যে ভরা। এটা খুবই বিশেষ অভিজ্ঞতা। আমরা রুট খুঁজছিলাম, আর রিনজে খুঁজছিল আশেপাশে ওয়াইড ভয়েড, সেটার মধ্যে কালো কোনো কিছু চোখে পড়ে কিনা।”
২০২৪ সালে একই অভিযানে বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট (২৯,০৩৫ ফুট) ও চতুর্থ সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট লোৎসে (২৭,৯৪০ ফুট) আরোহণ করেন বাবর। একই অভিযানে দুটি আট হাজার মিটার পর্বত আরোহণের কৃতিত্ব নেই আর কোনো বাংলাদেশি পর্বতারোহীর।
২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে তিনি বিশ্বের দশম সর্বোচ্চ পর্বত অন্নপূর্ণা-১ (২৬,৫৪৫ ফুট) আরোহণ করেন। একই বছরের সেপ্টেম্বরে কৃত্রিম অক্সিজেনের সাহায্য ছাড়াই আরোহণ করেন বিশ্বের অষ্টম উচ্চতম পর্বত মাউন্ট মানাসলু (২৬,৭৮১ ফুট)।
মাউন্ট মাকালু চৌদ্দটি আট হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার পর্বত শিখর স্পর্শের স্বপ্নের পথে বাবরের পঞ্চম সাফল্য।
পুরনো খবর-
মাকালু চূড়া ছুঁয়ে অনন্য উচ্চতায় বাবর
মাউন্ট মাকালুর চূড়া ছোঁয়ার অপেক্ষায় বাবর
বাবরের লক্ষ্য এবার 'গ্রেট ব্ল্যাক ওয়ান' মাউন্ট মাকালু
কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়াই মানাসলু চূড়ায় বাবর, প্রথমবারেই সফল তানভীর
অন্নপূর্ণা-১ শীর্ষে প্রথম বাংলাদেশি বাবর আলী
এভারেস্টজয়ী বাবর আলী এবার লোৎসে জয়ের অপেক্ষায়
এভারেস্টচূড়ায় বাংলাদেশের পতাকা ওড়ালেন বাবর আলী