Published : 05 Apr 2026, 02:28 PM
পিরামিডের মত সূচালো শীর্ষ; আশপাশে বড় কোনো পর্বত নেই। প্রবল ঠান্ডা বাতাসের তোড়ে তাই বরফ সরে গিয়ে চূড়ার কালো অংশ বেরিয়ে পড়ে। সেই থেকে নাম তার মহা কালো বা ‘মাকালু’।
এবার বিশ্বের পঞ্চম সর্বোচ্চ উচ্চতার শৃঙ্গ মাউন্ট মাকালু অভিযানে যাচ্ছেন এভারেস্ট জয়ী ডা. বাবর আলী। এই পর্বতের অবস্থান হিমালয়ের ২৭ হাজার ৮৩৮ ফুট উচ্চতায়।
নেপালের মহালঙ্গুরের মাউন্ট মাকালু পরিচিত 'গ্রেট ব্ল্যাক ওয়ান' নামে। বিশ্বে আট হাজারি ১৪টি পর্বতের মধ্যে মাকালু পঞ্চম সর্বোচ্চ। বাবরেরও আট হাজারি পর্বত অভিযানে এটি পঞ্চম লক্ষ্য। অভিযানের নাম তাই ‘এক্সপেডেশন মাকালু: দ্যা ফিফথ ফ্রন্টিয়ার’।
এই অভিযানে শীর্ষ ছুঁতে পারলে তা হবে কোনো বাংলাদেশি পর্বতারোহীর মাকালুতে প্রথম সফল সামিট।
রোববার দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযানের বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়।
বাবর আলী বলেন, “আমি খুবই এক্সাইটেড, নতুন একটা জায়গায় যাচ্ছি। যদিও এটা এভারেস্ট রিজিয়নের খুব কাছে, কিন্তু লেস ক্লাইম্বড। বেস ক্যাম্পটাও লেস এক্সপ্লোরড। যারা ট্র্যাক করতে যান, তারাও খুব কম সংখ্যায় যান।
“মাকালু খুব পপুলার মাউন্টেনও না। এখানে অভিযানও কম হয়। সে তুলনায় নিজের সাথে একটু সময়ও পাওয়া যায় বেশি।”
এভারেস্টসহ বেশ কিছু পর্বত অভিযানে শেরপাদের জীবনযাত্রা দেখে অভ্যস্ত বাবর আলী বলেন, “এবার মাকালু অভিযানে ‘কিরাত’ বলে একটা কালচার দেখার সুযোগ হবে। আর আশা করব মাকালু যাতে আমায় অ্যালাউ করে।
“আমাদের দেশ থেকে সেখানে আগে অভিযান হলেও ক্লাইম্ব হয়নি। সবাই দোয়া করবেন, ঠিকঠাকভাবে ক্লাইম্ব করে ঠিকঠাকভাবে ফেরত আসতে পারি।”
মাউন্ট মাকালু অভিযানের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে জানতে চাইলে বাবর আলী বলেন, “এই পর্বতের বেস ক্যাম্প অনেক উঁচুতে, প্রায় ৫৭০০ মিটার। আর মাউন্ট মাকালু অনেকটা আইসোলেটেড। আশেপাশে অন্য উঁচু পর্বত না থাকায় প্রচুর হাওয়া থাকে। সেটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। খুব ঠান্ডা।

“আর আট হাজার মিটার যেহেতু ডেথ জোন। সেখানে পা স্লিপ করলে পড়ে দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকে। আর ডেথ জোনে ক্লাইম্ব করলে যেটা হয়, ইওর বডি ইজ ডায়িং স্লোলি, যতই অক্সিজেন ব্যবহার করুন।… এই চ্যালেঞ্জগুলো থাকে। আমি অনেকদিন ধরেই প্রস্তুতি নিচ্ছি।”
তিনি বলেন, “মানাসলু থেকে ফেরার পর থেকেই আমার মাথায় ছিল নাঙ্গা পর্বত। আনফরচুনেটলি নাঙ্গা পর্বত হচ্ছে না। আর পাকিস্তান খুব এক্সপেনসিভ। পর্বতারোহণে পয়সার যোগানটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আর এর সাথে পাকিস্তান-আফনাগিস্তান সীমান্তে উত্তেজনার ব্যাপারটা আছে।”
পর্বতারোহণকে ক্রীড়ার স্বীকৃতি দেয়ার দাবি জানিয়ে বাবর আলী বলেন, “আমরাও তো আসলে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করি। যখন কোনো একটা পর্বত চূড়ায় যাই, তখন ব্যাগ থেকে সবার আগে বের করি দেশের জাতীয় পতাকা।
“বিশ্বাস করি, আমি কোনো উঁচু জায়গায় পৌঁছালে আমার দেশও খানিকটা উপরে পৌঁছায়। তাই আহ্বান থাকবে, এই অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসেও যাতে খানিকটা নজর দেয় সরকার।”
সংবাদ সম্মেলনে ভার্টিকাল ড্রিমার্সের প্রেসিডেন্ট ও অভিযানের ব্যবস্থাপক ফরহান জামান বলেন, “পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ চলমান। তাই ঝুঁকি নিয়ে বাবরকে নাঙ্গা পর্বতে পাঠানো যায় না। ৮৪৮৫ মিটার মাকালু নেপালের মহালাঙ্গুর হিমালয়ে।
“মাকালু অর্থ গ্রেট পিরামিড। মাকালু স্ট্যান্ডস এলোন। সেখানে প্রচুর বাতাস। তুষার ধসের প্রবণতা থাকে বাতাসের কারণে। চূড়ার অংশ পিরামিডের মত। বাতাসে ঘন ঘন বরফ ঝরে পড়ে যায়, তাই শীর্ষ অংশ কালো। মহা কালো থেকে নাম হয়েছে- মাকালু।”
তিনি বলেন, ১৯৫৫ সালে পর্বতারোহী লিওনেল টেরি ও ইয়ান কোজি প্রথম মাকালু সামিট করেন। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রথম অভিযান হলেও তা সফল হয়নি। ১৭ বছর পর এবার বাবর সেখানে যাচ্ছেন।

“বাবরের এই অভিযানের খরচ প্রায় ১৫ লাখ টাকা। সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। বিশ্বে পর্বতারোহণ ক্রীড়া হিসেবে স্বীকৃত। বাংলাদেশে এটা এখনো ‘বেড়াতে যাওয়া’। ফান্ডের অভাবে অনেকে সামিটে যেতে পারছে না। আশা করি সরকার এ বিষয়ে নজর দেবে।”
মাউন্ট মাকালুর উদ্দেশ্যে ৭ এপ্রিল ঢাকা ছাড়বেন বাবর আলী। এরপর নেপালে গিয়ে পর্বতারোহণের অনুমতি ও প্রস্তুতি শেষে দেশটির রাজধানী কাঠমাণ্ডু থেকে টুমলিংটার উদ্দেশ্যে রওনা হবেন।
সেখান থেকে প্রায় ১১-১২ দিন ট্র্যাক করে পৌঁছাবেন বেস ক্যাম্পে। এরপর শুরু হবে মূল অভিযান। সবকিছু ঠিক থাকলে মে মাসের দ্বিতীয় বা তৃতীয় সপ্তাহে মাকালু চূড়ায় পৌঁছাবেন বাবর।
ফরহান জামান বলেন, “নেপালে এখন খুব বৃষ্টি হচ্ছে। বরফে ট্র্যাকগুলো ঢেকে আছে। আশা করি ভাগ্যদেবী সহায় হবে।”
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ভার্টিক্যাল ড্রিমার্সের উপদেষ্টা শিহাব উদ্দিন রিয়াজ এবং স্পন্সর প্রতিষ্ঠান ভিজুয়াল নিটওয়্যারের স্বত্বাধিকারী আহমেদ নূর ফয়সাল।
পর্বতারোহণ ক্লাব ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স এই অভিযানের আয়োজন করছে। স্পন্সর প্রতিষ্ঠান হিসেবে আরো আছে স্যাম বন্ড, মাই হেলথ ও চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনী।
২০২২ সালে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে হিমালয়ের দুর্গম চূড়া আমা দাবালাম আরোহণ করেন বাবর আলী। এরপর ২০২৪ সালের এক অভিযানে বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট এবং চতুর্থ সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট লোৎসে পৌঁছান।
২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে তিনি আরোহণ করেন বিশ্বের দশম সর্বোচ্চ পর্বত অন্নপূর্ণা-১ এ। একই বছর সেপ্টেম্বরে কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়াই তিনি আরোহণ করেন বিশ্বের অষ্টম উচ্চতম শৃঙ্গ মাউন্ট মানাসলুতে।
সে হিসেবে মাউন্ট মাকালু হতে যাচ্ছে বাবর আলীর আট হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার কোনো পর্বতে পঞ্চম অভিযান।