Published : 03 Jul 2026, 08:23 PM
চট্টগ্রামে এখনো গড়ে প্রতিদিন ৫০ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে; আর ডেঙ্গু নিয়ে আসছেন ৯ থেকে ১০ জন।
হামের সংক্রমণ না কমলেও বাড়তে শুরু করেছে ডেঙ্গুর সংক্রমণ, যা ভাবিয়ে তুলেছে সংশ্লিষ্টদের।
স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, আশপাশের জেলা থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে এখনও অনেক রোগী আসছে। এতে তাদের কাছে মনে হয়েছে, সংক্রমণ এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
সংক্রমণ না কমার একটা বড় কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, আক্রান্তরা ‘আইসোলেশন প্রটোকল’ ঠিকঠাক পাচ্ছেন না।
অন্যদিকে ডেঙ্গু মোকাবেলার ক্ষেত্রে চিকিৎসা প্রস্তুতির পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে জোর দেওয়ার কথা বলেছেন এ নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা।
প্রস্তুতির অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে শনিবার চালু হচ্ছে আলাদা ডেঙ্গু ওয়ার্ড। এছাড়া এইডিসের লার্ভা নিয়ন্ত্রণে বাসাবাড়িতে অভিযানের ঘোষণা দিয়েছে সিটি করপোরেশন।
কমছে না হামের রোগী
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, বৃহস্পতিবার জেলায় হামের উপসর্গ নিয়ে রোগী ভর্তি হয়েছে ৫৮ জন। এরমধ্যে ৫৬ জন ভর্তি হয়েছে নগরীর হাসপাতালগুলোতে।
গত জুনে গড়ে প্রতিদিন ৫০ জন করে রোগী হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হয়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি ৬৯ জন ভর্তি হয় ২৮ জুন।
মার্চের চতুর্থ সপ্তাহ থেকে চট্টগ্রামে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে শিশু ভর্তি শুরু হয়। সেই থেকে বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) পর্যন্ত ৩ হাজার ৮৭১ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তারমধ্যে ১ হাজার ৬০৪ জনই ভর্তি হয়েছে গত জুন মাসে।
এরআগে মে মাসে ১ হজার ৩৮১ জন এবং এপ্রিলে ৭২৩ জন হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। মার্চ মাসে ওই সংখ্যা ছিল ৫৫ জন।
চট্টগ্রাম জেলায় সবচেয়ে বেশি হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে রোগী চিকিৎসা নেয় চমেক হাসপাতালে।
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দিন বলেন, শুক্রবার হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে রোগী ভর্তি আছেন ১১২ জন।
এ বিষয়ে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “চট্টগ্রাম বিভাগীয় শহর হওয়ায় আশপাশের তিন পার্বত্য জেলা, কক্সবাজার, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলা থেকে রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসছেন।
“এ কারণে রোগীর সংখ্যা বেশি হচ্ছে। চট্টগ্রাম নগরীতে হামের উপসর্গ ও হাম আক্রান্ত রোগী এখনো আছে। তবে উপজেলাগুলোতে সংখ্যা কমে এসেছে। আশা করি নগরীতেও সংক্রমণ কিছুদিনের মধ্যে কমে আসবে।”

দৈনিক হিসেবে উপজেলাগুলোতে শহরের তুলনায় কম রোগী ভর্তির দাবি করা হলেও মাসিক হিসেবে উপজেলাতেও চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর সংখ্যা আগের দুই মাসের তুলনায় বেড়েছে।
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এপ্রিল মাসে ৭ জন, মে মাসে ১২ জন এবং জুন মাসে ২২ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছে।
জানতে চাইলে ফটিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মুহাম্মদ তৌহিদুল আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “জ্বর, সর্দি-কাশিসহ হামের বিভিন্ন উপসর্গ নিয়ে রোগীরা আসছে। তবে নমুনা পরীক্ষায় তাদের হাম শনাক্ত হয়নি।
“আমাদের হাসপাতালে যারাই হামের উপসর্গ নিয়ে আসছে, তাদের আলাদা রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।”
টিকা দেওয়ার পরও রোগী না কমার বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, “হামের টিকা দেওয়ার আগেই যে আউটব্রেকটা হয়ে গিয়েছিল সেখান থেকে কমতে তিন-চার মাস সময় লাগতে পারে। টিকা দেওয়ার আগেই যদি শরীরে জীবাণু সংক্রমণ হয়ে থাকে, তাহলে টিকা দেওয়ার পরেও আক্রান্ত হতে পারে।”
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দিন বলেন, “আক্রান্ত অনেকে পরিস্থিতি জটিল হওয়ার পর হাসপাতালে আসছে। এছাড়া আক্রান্তরা সঠিকভাবে আইসোলেশনে থাকছে না। কোভিডের মতো আইসোলেশন প্রটোকল অনুসরণ করা হলে সংক্রমণ আরো কম থাকত।”
চট্টগ্রাম জেলায় এখন পর্যন্ত হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে ৩৩১ জন। যার মধ্যে ২৭৬ জন নগরীর বাসিন্দা। হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ১২ জন এবং হামে মৃত্যু হয়েছে তিনজনের।

চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গু
বর্ষা মৌসুম শুরুর সঙ্গে সঙ্গে চট্টগ্রামে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে।
জুন মাসে জেলায় ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয় ১২২ জন, যা চলতি বছর এক মাসে সর্বোচ্চ। জুলাই মাসের প্রথম দুই দিনে আরো ১৯ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার পর্যন্ত জেলায় চলতি বছর চিকিৎসা নেওয়া মোট ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ৩১৯ জন।
হামের সংক্রমণ চলার মধ্যেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধি স্বাস্থ্য ঝুঁকি ‘দ্বিগুণ’ বাড়াতে পারে বলে মনে করেন সিভিল সার্জন জাহাঙ্গীর আলম।
জুন মাসে জরিপ চালিয়ে নগরীর ২৭ শতাংশ বাড়িতে এইডিস মশার উপস্থিতির প্রমাণ পেয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। নগরীর ৮টি ওয়ার্ডকে রেড জোন হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়েছে জরিপের ফলাফলের ভিত্তিতে।
তবে চট্টগ্রামের সিটি মেয়র শাহাদাত হোসেনের মতে, নগরীতে এবার ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক কম।
এর পক্ষে তথ্য তুলে ধরে মেয়র শাহাদাত হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “চট্টগ্রাম জেলায় এ বছর এখন পর্যন্ত যারা ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের মধ্যে ১১৮জন নগরীর বাসিন্দা। এছাড়া ১২৯ জন উপজেলার এবং ৭০ জন অন্যান্য জেলার বাসিন্দা।
“ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকার তুলনায় এবং চট্টগ্রামে আগের বছরগুলোর তুলনায়ও এবার ডেঙ্গু রোগী এখনো কম। তারপরও যেসব এলাকায় বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে সেগুলোতে মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যক্রম শুরু হয়েছে।”
প্রস্তুতি নেওয়ার কথা জানিয়ে সিভিল সার্জন জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “চমেক হাসপাতালে পৃথক ডেঙ্গু ওয়ার্ড করা হচ্ছে।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দিন বলেন, “হাসপাতালের ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে ৫০ শয্যার পৃথক ডেঙ্গু ওয়ার্ড প্রস্তুত করা হয়েছে। শনিবার অর্থমন্ত্রী এটি উদ্বোধন করবেন।
“ডেঙ্গুর মূল চিকিৎসা ফ্লুইড ট্রিটমেন্ট। আমাদের কাছে পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম আছে।”
আরো পড়ুন