Published : 04 Jul 2026, 02:58 AM
পেনাল্টি শুটআউটে মিশরের চতুর্থ শটে বল জালে পাঠিয়েই জার্সি খুলে ফেললেন হোসাম আব্দেলমেগিদ। এক ছুটে কর্নার ফ্ল্যাগের কাছে গিয়ে লাফিয়ে হুঙ্কার ছাড়লেন তিনি। মাঝমাঠ থেকে ছুটে গেলেন সতীর্থরা। ডাগআউট থেকে ছুটলেন অন্যরা। একেকজন লাফিয়ে পড়লেন আব্দেলমেগিদের ওপরে। চলতে থাকল তাদের উল্লাস। মিশরীয় ফুটবলে লেখা হলো নতুন ইতিহাস- বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচে প্রথম জয়!
ডালাসে শুক্রবার শেষ বত্রিশের ম্যাচে নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ে ১-১ সমতার পর, টাইব্রেকারে ৪-২ গোলে জিতেছে মিশর।
৯২ বছর পর, এবার বিশ্বকাপের নকআউটে পর্বে ওঠে আফ্রিকার দলটি। এখন নকআউটে প্রথম জয়ও পেল তারা।
এর আগে বিশ্বকাপে একটিই নকআউট ম্যাচ খেলেছিল ‘ফারাও’ নামে পরিচিত দলটি। ১৯৩৪ সালে হাঙ্গেরির বিপক্ষে শেষ ষোলোয় ৪-২ গোলে হেরেছিল তারা। সেবার অবশ্য কোনো গ্রুপ পর্ব ছিল না, সরাসরি নকআউট।
অস্ট্রেলিয়ার নকআউটে জয়ের অপেক্ষা বাড়ল আরও। এর আগে দুইবার শেষ ষোলোয় হেরেছিল তারা- ২০০৬ সালে ইতালির বিপক্ষে ১-০ গোলে ও ২০২২ সালে আর্জেন্টিনার কাছে ২-১ গোলে।
মূল ম্যাচে খুব বেশি সুযোগ তৈরি করতে পারেনি কোনো দলই। মিশর এগিয়ে যায় শুরুতেই। দ্বিতীয়ার্ধে আত্মঘাতী গোলে সমতায় ফেরে অস্ট্রেলিয়া। সেই স্কোরলাইন অপরিবর্তিত থাকে অতিরিক্ত সময়েও।
টাইব্রেকারে অস্ট্রেলিয়ার চার শটের দুটি ব্যর্থ হয়- একটি উড়ে যায় ক্রসবারের ওপর দিয়ে, একটি লাগে ক্রসবারে।
মিশরের চার শটের সবকটিই খুঁজে পায় ঠিকানা। ১২০ মিনিটের লড়াইয়ে জ্বলে উঠতে না পারলেও, টাইব্রেকারে পানেনকা শটে বল জালে পাঠান মিশর ফুটবলের পোস্টার বয় ও সেরা তারকা মোহামেদ সালাহ।
জয়ের পর গ্যালারিতে সমর্থকদের সঙ্গে আনন্দে মেতে ওঠেন মিশরের ফুটবলাররা। সালাহর চোখে দেখা যায় আনন্দাশ্রু।
ম্যাচের শুরুটা দারুণ হতে পারত অস্ট্রেলিয়ার। পঞ্চম মিনিটে ২৫ গজ দূর থেকে ক্রিস্টিয়ান ভোলপাতোর বাঁ পায়ের জোরাল শটে বল ক্রসবারের ওপরে পড়ে বাইরে যায়।
ত্রয়োদশ মিনিটে প্রথম উল্লেখযোগ্য সুযোগে এগিয়ে যাওয়ার আনন্দে মাতে মিশর। অস্ট্রেলিয়ার বক্সের বাইরে বাঁ দিকে ফ্রি-কিক পায় মিশর। শঙ্কা উড়িয়ে শুরুর একাদশে নামা সালাহর ছোট করে নেওয়া ফ্রি-কিকে আশুরের শট বাধা পায় রক্ষণে। তবে বল বিপদমুক্ত করতে পারেনি অস্ট্রেলিয়া। বক্সের বাইরে থেকে কারিম হাফেজের ক্রসে দূরের পোস্টে হেডে বল জালে পাঠান অরক্ষিত ইমাম আশুর।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে ২৮ বছর বয়সী এই উইঙ্গারের গোল হলো দুটি এবং দুটিই চলতি বিশ্বকাপে। প্রথমটি করেছিলেন গ্রুপ পর্বে বেলজিয়ামের বিপক্ষে।
৯২ বছর পর বিশ্বকাপের নকআউটে গোল পেল মিশর। সবশেষ পেয়েছিল ওই ১৯৩৪ সালে। বিশ্বকাপের এই ধাপে কোনো দেশের দুই গোলের মাঝে দীর্ঘতম সময়ের ব্যবধান এটিই। আগের দীর্ঘতম ব্যবধান ছিল নরওয়ের ৮৮ বছর।
সমতায় ফিরতে আক্রমণে মনোযোগ দেয় অস্ট্রেলিয়া। তবে প্রথমার্ধে গোলরক্ষক বরাবর একটি শট ছাড়া উল্লেখযোগ্য কিছু করতে পারেনি তারা।
দ্বিতীয়ার্ধের খেলা শুরু হতেই ব্যবধান দ্বিগুণ হতে পারত। সতীর্থের পাস ধরে বক্সে ঢুকে পড়েন ওমার মার্মুশ। গোলরক্ষক এগিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ওয়ান-অন-ওয়ানে বাইরে মারেন ম্যানচেস্টার সিটির স্ট্রাইকার।
৪৯তম মিনিটে অস্ট্রেলিয়ার বক্সে প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষে মাথায় আঘাত পান মিশরের ডিফেন্ডার মোহামেদ হেনি। প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছিল, জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন তিনি! স্ট্রেচার পাঠানো হয় মাঠে। তবে পরে উঠে দাঁড়ান হেনি।
৫৫তম মিনিটে তার আত্মঘাতী গোলেই সমতায় ফেরে অস্ট্রেলিয়া। বাঁ দিক থেকে অস্ট্রেলিয়ার ফ্রি-কিক বক্সে সবার ওপরে লাফিয়ে হেডে ক্লিয়ারের চেষ্টায় নিজেদের জালেই বল পাঠিয়ে দেন তিনি।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে এক আসরে দুটি আত্মঘাতী গোল করলেন হেনি। প্রথমটি করেছিলেন বেলজিয়ামের বিপক্ষে।
এবারের বিশ্বকাপে মোট আত্মঘাতী গোল হলো ১৩টি, যা এক আসরে সর্বোচ্চ। পেছনে পড়ে গেল ২০১৮ রাশিয়া আসরের ১২টি।
স্কোরলাইনে সমতা ফেরার পর, দুই দলের কারো মাঝে গোলের জন্য মরিয়া ভাব দেখা যাচ্ছিল না তেমন। তাই পরিষ্কার সুযোগও মিলছিল না।
পাঁচ মিনিট যোগ করা সময়ের চতুর্থ মিনিটে মিশর দ্বিতীয় গোল পেয়েই যাচ্ছিল প্রায়। উড়ে আসা ক্রসে বক্সে রামি রাবিয়ার জোরাল হেড নিশ্চিতভাবেই জালে জড়াতে যাচ্ছিল, কিন্তু অস্ট্রেলিয়া গোলরক্ষক প্যাট্রিক বিচ লাফিয়ে উঠে এক হাতে বল ক্রসবারের ওপর দিয়ে বাইরে পাঠিয়ে দেন!
ম্যাচের ত্রয়োদশ মিনিটে গোল করার পর লক্ষ্যে এটি ছিল মিশরের প্রথম শট!
ওই কর্নারের পর গোলরক্ষক বরাবর দুর্বল শট করেন সালাহ। আর একেবারে শেষ সময়ে হাইসেম হাসানের একটি শট বক্সে হাঁটু দিয়ে আটকে দেন অস্ট্রেলিয়া ডিফেন্ডার হ্যারি সুটার।
অতিরিক্ত সময়ের শুরুতে ভালো একটি সুযোগ পান সালাহ, ম্যাচে যা তার প্রথম উল্লেখযোগ্য সুযোগ। কিন্তু বক্সে আলগা বল পেয়ে কাছ থেকে উড়িয়ে মারেন তিনি। তার মুখে ফুটে ওঠে এক বিষণ্ণ হাসি।
অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধে আর কোনো উল্লেখযোগ্য সুযোগ কেউ পায়নি।
পেনাল্টি শুটআউট ভাবনায় রেখে ১১৮তম মিনিটে ২২ বছর বয়সী বিচকে তুলে পোস্ট সামলানোর জন্য অভিজ্ঞ ম্যাট রায়ানকে নামান অস্ট্রেলিয়া কোচ। তবে, আসরে এর আগে এক মিনিটও না খেলা ৩৪ বছর বয়সী এই গোলরক্ষক কিছুই করতে পারেননি। অস্ট্রেলিয়াও পারেনি লক্ষ্য পূরণ করতে। ইতিহাস গড়ার উচ্ছ্বাসে মাতে মিশর।
শেষ ষোলোয় আর্জেন্টিনা অথবা কেইপ ভার্ডের মুখোমুখি হবে মিশর।
ফ্রেমে বন্দি মিশরের বাঁধভাঙা উল্লাস আর অস্ট্রেলিয়ার একরাশ হতাশা