Published : 25 Jun 2026, 11:57 PM
চট্টগ্রাম নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৮টিতে জরিপ চালিয়ে প্রায় ২৭ শতাংশ বাড়িতে ডেঙ্গুর বাহক এইডিস মশার লার্ভা পেয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ, যা স্বাভাবিকের চেয়ে ৫ গুণ বেশি।
আর কন্টেইনার ইনডেক্সে (বিভিন্ন ধরণের পাত্রে) এইডিস মশার লার্ভার উপস্থিতির হার পাওয়া গেছে ৩৩ শতাংশের বেশি।
জরিপে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নগরীর আটটি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া সংক্রমণের জন্য ‘ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে জরিপকারী দল।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় ‘ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়া রোগের বাহক এইডিস মশার সার্ভে’ শীর্ষক জরিপটি পরিচালনা করে স্বাস্থ্য বিভাগ।
স্বাস্থ্য বিভাগের চট্টগ্রাম দপ্তরের বিভাগীয় কীটতত্ত্ববিদ মো. মফিজুল হক শাহর নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি দল ৮ জুন থেকে ২০ জুন এই জরিপ পরিচালনা করে। তারা বুধবার এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালককে জমা দেয়।
‘এইডিস মশার ঘনত্ব পরিমাপ ও আচরণগত পরিবর্তন জানার জন্য’ নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৮টিতে এই জরিপ চালানো হয়।
এসব ওয়ার্ডের ৩৭০টি বাড়ির মধ্যে ৯৯টি বাড়িতে, অর্থাৎ প্রায় ২৭ শতাংশ বাড়িতে এইডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে।

পাশাপাশি ৩৪৫টি কনটেইনারের মধ্যে ১১৪টি বা ৩৩ শতাংশ কনটেইনারে লার্ভা মিলেছে। এর মধ্যে প্লাস্টিক কনটেইনার–যেমন বালতি, মগ, গামলা, ড্রাম, বাটি ও কৌটাতে সবচেয়ে বেশি লার্ভা পাওয়া গেছে।
এছাড়া মাটির পাত্র, পানির ট্যাংক, নির্মাণাধীন ভবন, আন্ডারগ্রাউন্ড ফ্লোর, ভাঙা ভ্যান গাড়ি, লিফট হোল, ককশিট এবং টিনের ক্যানের ভিতর এইডিস মশার লার্ভা মিলেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, হাউজ ইনডেক্স ৫ শতাংশের নিচে এবং কনটেইনার ইনডেক্স ২০ শতাংশের মধ্যে থাকলে তাকে স্বাভাবিক বলা যায়।
সে হিসেবে বন্দর নগরীতে হাউজ ইনডেক্স স্বাভাবিক মাত্রার ৫ গুণের বেশি এবং কনটেইনার ইনডেক্স নির্ধারিত মানের চেয়ে ১৩ শতাংশ পয়েন্ট বেশি।
জরিপে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নগরীর আটটি ওয়ার্ডকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেগুলো হল- ১০ নম্বর উত্তর কাট্টলী, ৩ নম্বর পাঁচলাইশ, ২ নম্বর জালালাবাদ, ১৭ নম্বর পশ্চিম বাকলিয়া, ১৯ নম্বর দক্ষিণ বাকলিয়া, ৩৯ নম্বর দক্ষিণ হালিশহর, ৩৪ নম্বর পাথরঘাটা এবং ৩২ নম্বর আন্দরকিল্লা ওয়ার্ড।
জানতে চাইলে কীটতত্ত্ববিদ মো. মফিজুল হক শাহ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বর্ষা মৌসুমে কোনো পাত্রে যদি তিন দিনের বেশি পানি জমে থাকে এবং সেই কনটেইনার যদি এইডিশ মশা পায় তাহলে লার্ভা হবেই।

“বর্ষার শুরুতে পরিস্থিতি দেখতে আমরা এই জরিপ পরিচালনা করলাম। ইনডেক্স অনুসারে পরিস্থিতি ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বলতে পারেন। তবে এখনো মারাত্মক আকার ধারণ করেনি।”
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ‘জনসচেতনতা’ সবচেয়ে বেশি জরুরি জানিয়ে তিনি বলেন, “এই শহরে আপনি-আমি সবাই বসবাস করি। কারো একার পক্ষে এইডিস মশার প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। সবাইকে সচেতন হতে হবে। মশার বংশ বিস্তারের কোনো সুযোগ দেওয়া যাবে না।”
জরিপে যত লার্ভা পাওয়া গেছে, তার মধ্যে ৮০ শতাংশ এইডিস ইজিপটাই এবং বাকি ২০ শতাং এইডিস অ্যালবোপিকটাস ধরনের।
এইডিস মশার বিস্তার প্রতিরোধে জরিপ দল চারটি সুপারিশ করেছে। এরমধ্যে আছে- বাড়িঘর ও কর্মস্থান পরিষ্কার রাখা, সব ধরনের প্লাস্টিক কনটেইনার অপসারণ, সুউচ্চ ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ড ও নির্মাণাধীন ভবনে নজরদারি, লার্ভিসাইড ও অ্যাডাল্টিসাইডের সময়োপযোগী প্রয়োগ এবং মশা নিধনে কীটনাশকের সঠিক প্রয়োগ।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে সিটি করপোরেশনকে জানানো হয়েছে। এইডিস মশার বিস্তার রোধে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।”

একই মতামত জানিয়ে সিটি মেয়র শাহাদাত হোসেন বিডিনিউজ টোয়ন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ডেঙ্গু প্রতিরোধে নাগরিক সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। যেসব বাড়ি বা স্থাপনায় মশার লার্ভা পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
“নগরী যে ওয়ার্ডগুলোকে ডেঙ্গুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে সেসব এলাকায় বিশেষ ক্রাশ প্রোগ্রাম পরিচালনা করা হবে।”
প্রতি শনিবার অন্তত ১০ মিনিট সময় দিয়ে বাসাবাড়ি ও আশপাশের জমে থাকা পানি পরিষ্কার করার আহ্বান জানিয়ে মেয়র বলেন, “সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই ডেঙ্গুমুক্ত ও স্বাস্থ্যসম্মত চট্টগ্রাম গড়ে তোলা সম্ভব।”
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি জুন মাসের প্রথম ২৫ দিনে জেলায় ৮৫ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে, যা চলতি বছরের যে কোনো মাসের চেয়ে বেশি এবং মে মাসের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। মে মাসে আক্রান্ত হয়েছিল ৩৭ জন।

জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে ২৬১ জন; তাদের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে।
গত কয়েক বছরের মধ্যে ২০২৩ সালে চট্টগ্রাম জেলায় ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ ১০৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল।