Published : 26 Jan 2024, 08:34 PM
সাধারণ যাত্রী সেজে, কখনো ভাড়াটে লোক নিয়ে কিংবা কর্মকর্তাদের যোগসাজশে বছরের পর বছর ধরে একটি চক্র রেলের টিকেট কালোবাজারি করে আসছিল বলে জানিয়েছে র্যাব।
এ বাহিনীর আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেছেন, অসাধু উপায়ে টিকেট বিক্রি রোধে সরকার কঠোর হলেও জালিয়াতির মাধ্যমে যাত্রীদের পরিচয়পত্র দিয়ে চক্রটি বিপুল পরিমাণ টিকেট কেটে তা চড়া দামে বিক্রি করে আসছিল।
কারসাজির এই তদন্তে নেমে সম্প্রতি ঢাকার কমলাপুর ও বিমানবন্দর এলাকা থেকে ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব; বিষয়টি নিয়ে শুক্রবার দুপুরে কারওয়ান বাজারে র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে বিস্তারিত তুলে ধরেন মঈন।
গ্রেপ্তাররা হলেন- মো. সেলিম (৫০), মো. আনোয়ার হোসেন ওরফে কাশেম (৬২), অবনী সরকার সুমন (৩৫), মো. হারুন মিয়া (৬০), মো. মান্নান (৫০), মো. আনোয়ার হোসেন ওরফে ডাবলু (৫০), মো. ফারুক (৬২), মো. শহীদুল ইসলাম বাবু (২২), মো. জুয়েল (২৩), মো. আব্দুর রহিম (৩২), উত্তম চন্দ্র দাস (৩০), মো. মোর্শিদ মিয়া ওরফে জাকির (৪৫), আব্দুল আলী (২২) ও মো. জোবায়ের (২৫)।
তাদের কাছ থেকে এক হাজারের বেশি টিকেট জব্দের কথা জানিয়ে খন্দকার আল মঈন বলেন, ঢাকা-কক্সবাজার রুটে ‘কক্সবাজার এক্সপ্রেস’ ও ‘পর্যটক এক্সপ্রেস’ নামের দুটি ট্রেন চালুর পর টিকেটের চাহিদা বেড়ে যায়। অনলাইনে বা কাউন্টারে টিকেট বিক্রি শুরুর সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে যায়। কিন্তু কালোবাজারিদের কাছ থেকে আবার দুই-তিন গুণ বেশি দামে এ রুটের টিকেট বিক্রি হতে দেখা যায়।
র্যাব বলছে, কমলাপুর রেলস্টেশনে টিকেট সিন্ডিকেটের ‘হোতা’ সেলিম। আর বিমানবন্দর স্টেশনের সিন্ডিকেট প্রধান উত্তম। তাদের নেতৃত্বে সহযোগীরা কাউন্টারে বিভিন্ন যাত্রী, রেলস্টেশনের কুলি, স্টেশনের আশেপাশের এলাকার টোকাই, রিকশাওয়ালা ও দিনমজুরদেরকে টাকা দিয়ে লাইনে দাঁড় করিয়ে টিকেট সংগ্রহ করে।
“এক্ষেত্রে চারটি করে টিকেট সংগ্রহ করার বিনিময়ে তাদের প্রত্যেককে ১০০ টাকা করে দেওয়া হয়। এছাড়া কাউন্টারে থাকা কিছু অসাধু টিকেট বুকিং কর্মচারীদের দিয়ে যাত্রীদের এনআইডি সংগ্রহ করে পরে সেগুলো দিয়ে টিকেট কাটা হয়। এভাবে চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ট্রেনের টিকেট কালোবাজারি করে আসছিল,” বলেন মঈন।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “ঈদ, পূজা, সাপ্তাহিক ছুটিসহ বিশেষ ছুটির দিনে রেলস্টেশর অসাধু কর্মচারী এবং অনলাইনে টিকেট বিক্রির প্ল্যাটফর্ম ‘সহজ ডটকমের’ অসাধু কর্মকর্তাদের মাধ্যমে যাত্রীদের এনআইডি ব্যবহার করে টিকেট কেটে আসছিল গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের দিয়েও তারা অনলাইনে টিকেট কেটে সেগুলো সংগ্রহ করত।
“এরপর রেলস্টেশনে টিকেট না পাওয়া যাত্রীদের কাছে চড়া দামে সেসব টিকেট বিক্রি করা হত। ঈদ ও বিভিন্ন ছুটিকে কেন্দ্র করে তারা প্রতিটি টিকেটের জন্য তিন-চারগুণ বেশি টাকা আদায় করত। লাভের অংশ পেত রেলের অসাধু কর্মকর্তারাও।”
সেলিম ৩৫ বছর ধরে টিকেট কালোবাজারি করে আসছে জানিয়ে র্যাব বলছে, তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় টিকেট কালোবাজারির সাতটি মামলা রয়েছে। এর আগে কারাভোগও করেছেন। জামিনে বের হয়ে ফের একই কাজে জড়িয়েছেন তিনি।
রেল ও সহজের কেউ জড়িত থাকলে তাদের কেন গ্রেপ্তার করা হয়নি জানতে চাইলে র্যাব-৩ এর সিনিয়র সহকারী পরিচালক আরিফুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তারা যে জড়িত, সেটা গ্রেপ্তাররা র্যাবকে বলেছে। তাদের কথা থেকে উঠে এসেছে কীভাবে তারা কালোবাজারিতে সম্পৃক্ত। বিষয়টি জানার পর আমি নিজেই রেল কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি এবং পরবর্তীতে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
টিকেট কালোবাজারিতে কর্মীদের জড়িত থাকার অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করলে সহজ ডটকমের চিফ অপারেটিং অফিসার সন্দীপ দেবনাথ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এভাবে আমাদের কেউ এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা নয়। আর আমরাও টিকেট কালোবাজারির বিরুদ্ধে সোচ্চার।
“তারপরও যদি কেউ কোনো অংশে অপরাধ করে থাকে, তাদের বিরুদ্ধে সহজ ডটকম ও আইন শৃঙ্খলাবাহিনী অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে। সহজ সব ধরনের সহযোগিতা করবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে।”
তবে এ বিষয়ে রেল কর্মকর্তাদের বক্তব্য বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানতে পারেনি। কমলাপুর রেলস্টেশনের ম্যানেজার মাসুদ সারোয়ার এবং জনসংযোগ কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলামকে ফোন করা হলে তারা ধরেননি। এসএমএস পাঠিয়েও তাদের সাড়া পাওয়া যায়নি।