Published : 10 Aug 2023, 03:29 PM
দেশের শান্তি শৃঙ্খলার পরিপন্থি এবং জননিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় নতুন জঙ্গি দল জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়াকে নিষিদ্ধ করেছে সরকার।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের রাজনৈতিক-২ শাখা এ সংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে বুধবার প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।
সেখানে বলা হয়েছে, “সরকারের কাছে এ মর্মে প্রতীয়মান হয় যে, জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া নামক জঙ্গি দল/সংগঠনটির ঘোষিত কার্যক্রম দেশের শান্তি শৃঙ্খলার পরিপন্থি।
“ইতোমধ্যে দল/সংগঠনটির কার্যক্রম জননিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে বিবেচিত হওয়ায় বাংলাদেশে এর কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হল।”
র্যাবের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, তারাই জঙ্গি সংগঠনটির কার্যক্রম সমন্ধে তথ্য পাওয়ার পর এটিকে নিষিদ্ধ করার জন্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করে।
এ নিয়ে বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা ও উগ্র ইসলামি সংগঠন হিসাবে নয়টি সংগঠনকে নিষিদ্ধ করা হল।
অন্য আটটি সংগঠন হল- জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি), জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ (জেএমজেবি), হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ (হুজি), শাহাদাৎ-ই আল-হিকমা, হিযবুত তাহরীর, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, আনসার আল ইসলাম এবং আল্লাহর দল।
নিষেধাজ্ঞার ইতিহাস
নিষিদ্ধ আট সংগঠনের মধ্যে জেএমবিসহ চারটি দল নিষিদ্ধ হয় ২০০৫ সালে। বোমা হামলা চালিয়ে বিচারক হত্যার দায়ে জেএমবির শীর্ষনেতা শায়খ আব্দুর রহমান ও সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলাভাইকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়।
উগ্রপন্থা প্রচারের জন্য ২০০৯ সালে নিষিদ্ধ করা হয় হিযবুত তাহরীরকে।
পুলিশ ও র্যাবের সাঁড়াশি অভিযানের মধ্যে নেতৃত্বশূন্য জঙ্গি সংগঠনগুলোর কর্মকাণ্ড কিছুটা ঝিমিয়ে পড়লেও ২০১৩ সালে ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার হত্যাকাণ্ডের পর আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের তৎপরতার খবর আসে।
সংগঠনটির আমির মুফতি জসীমউদ্দীন রাহমানী ওই মামলার রায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কারাভোগ করছেন। তার দুই অনুসারীর মৃত্যুদণ্ড, একজনের যাবজ্জীবন এবং আরও চারজনের বিভিন্ন মেয়াদের সাজার রায় এসেছে।
২০১৫ সালের মে মাসে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম নিষিদ্ধ হওয়ার পর এর সদস্যরাই সেনাবাহিনীতে ব্যর্থ অভ্যুত্থানচেষ্টার পরিকল্পনাকারী বরখাস্ত মেজর জিয়াউল হকের নেতৃত্বে আনসার আল ইসলাম নামে তৎপরতা চালিয়ে আসছিলেন। একের পর এক জঙ্গি হামলা ও হত্যার প্রেক্ষাপটে ২০১৭ সালের মার্চে আনসার আল ইসলামকেও সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
আল্লাহর দল গঠিত হয়েছিল ১৯৯৫ সালে। ২০০৪ সালের শেষের দিকে সংগঠনটি জেএমবির সঙ্গে একীভূত হয়। পরের বছর ১৭ অগাস্ট সারাদেশে জেএমবির বোমা হামলাতেও আল্লাহর দলের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যায়।
এরপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে জেএমবি দুর্বল হয়ে পড়লে আল্লার দল আবার সক্রিয় হয় এর আমির মতিন মেহেদীর নেতৃত্বে। ২০১৪ সালে আল্লার দলের নাম পরিবর্তন করে ‘আল্লার সরকার’ রাখা হয়। তবে এরপর কয়েক বছর দলটির দৃশ্যমাণ কোনো তৎপরতা ছিল না।
২০১৯ সালে জেএমবির সহযোগিতায় ‘আল্লাহর দল’ সারা দেশে নতুন করে সংগঠিত হয়ে উঠছে বলে খবর আসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে। দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ওই সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত আমির ইব্রাহিম আহমেদ হিরোসহ আট জ্যেষ্ঠ নেতা র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হন। এরপর ওই বছর ৬ নভেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আল্লাহর দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

কারা এই জামাতুল আনসার
কুমিল্লা ও ঢাকার সাত কলেজছাত্র ২০২২ সালের ২৩ অগাস্ট বাসা থেকে বেরিয়ে আর না ফেরায় থানায় জিডি করেছিল পরিবার। পরে জানা যায়, নিরুদ্দেশ ওই তরুণদের কয়েকজনকে শেষবার দেখা গিয়েছিল চাঁদপুরে।
অক্টোবরের শুরুতে কয়েকজনকে উদ্ধার করে র্যাব জানায়, ওই তরুণরা নতুন এক জঙ্গি সংগঠনে যুক্ত হয়ে সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য ঘর ছেড়েছিলেন।
ওই সময় জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার নাম প্রথমবার সামনে আসে। জঙ্গি সংগঠনটি নিয়ে এরপর নানা ধরনের তথ্য দিয়ে আসছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
র্যাব বলছে, হরকাতুল জিহাদ, জেএমবি এবং আনসার আল ইসলামের বেশ কিছু সদস্য ২০১৭ সালে নতুন এই উগ্রবাদী সংগঠনের কার্যক্রম শুরু করে। পরে ২০১৯ সালে ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’ নামে কার্যক্রম পরিচালনা করতে থাকে।
এদিকে কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট বা কেএনএফ নামে পাহাড়ের একটি সশস্ত্র দলের তৎপরতার খবর বেশ কয়েক মাস ধরেই আলোচনায় আসছিল। পাহাড়িরা কেএনএফ সংগঠনটিকে ‘বম পার্টি’ নামে চেনে। নিজেদের তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রান্তিক অঞ্চলের অনগ্রসর জনজাতিগুলোর ‘প্রতিনিধিত্বকারী’ হিসেবে তুলে ধরে।
এ সংগঠন ‘কুকি-চিন রাজ্যে’ নামে একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল চায়; যেখানে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরারা থাকবে না; থাকবে বম, খিয়াং, পাংখুয়া, লুসাই, খুমি ও ম্রোরা।
দুই দফায় জামাতুল আনসারের ১২ জনকে গ্রেপ্তারের পর র্যাবের তরফ থেকে বলা হয়, নতুন এ জঙ্গি সংগঠনকে পাহাড়ের দল বম পার্টি পৃষ্ঠপোষকতা করছে। পাহাড়ে তাদের প্রশিক্ষণও চলছে।

নতুন জঙ্গি দলের ‘পাহাড়ি যোগের’ তথ্য সামনে আসার পর অক্টোবরে পার্বত্য চট্টগ্রামে সমন্বিত অভিযান শুরু করার কথা জানায় র্যাব; যার অংশ হিসেবে দুর্গম এলাকায় প্রচারপত্র বিলি, মাইকিংও শুরু হয়।
জঙ্গিদের অবস্থানের তথ্য প্রদানকারীকে এক লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয় ওই লিফলেট। পাশাপাশি জঙ্গিদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানো হয় সেখানে।
এর মধ্যে বান্দরবান ও রাঙামাটির দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে অভিযান চালিয়ে ১০ জনকে গ্রেপ্তারের পর ২১ অক্টোবর র্যাবের এক সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, কেএনএফ এর প্রতিষ্ঠাতা নাথান বমের সাথে ২০২১ সালে জামাতুল আনসারের আমিরের সমঝোতা হয়। পার্বত্য অঞ্চলে কেএনএফ’র ছত্রছায়ায় জামাতুল আনসার সদস্যদের ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য তাদের মধ্যে চুক্তিও হয়। সেই চুক্তি অনুযায়ী প্রতি মাসে তিন লাখ টাকা দেওয়ার পাশাপাশি কেএনএফ সদস্যদের খাবার খরচ বহন করে জামাতুল আনসার।
এরপর ২৭ অক্টোবর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) তরফ থেকে বলা হয়, জামাতুল আনসারের মূল ব্যক্তি শামিন মাহফুজ, যিনি রংপুর ক্যাডেট কলেজ থেকে বহিষ্কৃত একজন সাবেক শিবির কর্মী।

সিটিটিসি প্রধান আসাদুজ্জামান সেদিন বলেন, কেএনএফ বা বমপার্টির প্রধান নাথান বম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। অন্যদিকে জামাতুল আনসারের বর্তমান আমীর শামিন মাহফুজ ছিলেন সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তারা খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন।
“জামাতুল আনসারের প্রশিক্ষণের ব্যাপারে যখন দুর্গম জায়গা খোঁজা হচ্ছিল তখন শামিন মাহফুজ জানতে পারে তার বন্ধুই বমপার্টির প্রধান। এরপরে তারা যোগাযোগ শুরু করে এবং কক্সবাজারের একটি হোটেলে বসে টাকার বিনিময়ে প্রশিক্ষণের বিষয়ে চুক্তি হয়।”
এ বছর ২৩ জুন ঢাকার ডেমরা থেকে শামিন মাহফুজ ও তার স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করার কথা জানায় সিটিটিসি।
এ বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, ২০১৪ সালে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যাওয়ার পর বন্দি থাকা নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবি, হুজি, আনসার আল ইসলামের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে শামিনের সখ্য গড়ে ওঠে। ২০১৮ সালে জামিনে মুক্তি পেয়েই শামিন নতুন সংগঠনের কার্যক্রম শুরু করেন। ২০২২ সালের শুরুতে পাহাড়ের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে বসে তিনি সংগঠনের নাম দেন ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া'।
তার এক মাস পর ২৪ জুলাই মুন্সিগঞ্জের লৌহজংয়ে এক বাড়ি ঘিরে অভিযান চালিয়ে মো. আনিসুর রহমান ওরফে মাহমুদসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। এ বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়, কুমিল্লার আনিসুরই জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার আমির। তার সঙ্গে লেখক-প্রকাশক হত্যায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জঙ্গি জিয়াউল হকেরও যোগাযোগ ছিল।