Published : 28 Dec 2025, 08:56 AM
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীরা ২৫ লাখ টাকা ব্যয় করতে পারবেন, তবে আড়াই লাখের বেশি হলে জনপ্রতি ১০ টাকা হারে ব্যয়ের সুযোগ রয়েছে।
এবার আড়াই লাখের নিচে ভোটার রয়েছে তিনটি আসনে; যেগুলোয় ২৫ লাখের বেশি অর্থ খরচ করার সুযোগ নেই।
বাকি ২৯৭ আসনের প্রার্থীরা ২৫ লাখ টাকার বেশি খরচ করতে পারবেন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ অর্থ খরচের সুযোগ রয়েছে গাজীপুর-২ আসনের প্রার্থীদের। তারা সর্বোচ্চ ৮০ লাখ ৪৩ হাজার ৩৩০ টাকা পর্যন্ত ব্যয়ের সুযোগ পাচ্ছেন।
৩০০ সংসদীয় আসনে এবার ভোটার রয়েছে ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি।
তফসিল ঘোষণার পর রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ থেকে ভোট পর্যন্ত প্রার্থীদের যাবতীয় ব্যয়ের বিবরণী জমা দিতে হয়। নির্ধারিত ব্যয়সীমার মধ্যে এ খরচ দেখাতে হবে। ভোটে অংশ নেওয়া দলগুলোরও ব্যয়সীমা রয়েছে নির্বাচনি আইনে।
১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচন হবে; জুলাই জাতীয় সনদের উপরে একই দিন গণভোটও রয়েছে।
তফসিল অনুযায়ী, ২৯ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র জমার সময় শেষ হবে। প্রার্থিতা প্রত্যাহার করা যাবে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত। পরের দিন প্রতীক বরাদ্দ পাবেন প্রার্থীরা। সেক্ষেত্রে ভোটে থাকা সব প্রার্থীকে নির্বাচনি ব্যয়ের হিসাব দিতে হবে।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধন করে সংসদ নির্বাচনে এবার ভোটার প্রতি ১০ টাকা খরচ নির্ধারণ করে প্রার্থীর ব্যয়সীমানা বাড়ানো হয়েছে।
৩০০ আসনের মধ্যে এবার সর্বনিম্ন ভোটার রয়েছে ঝালকাঠি-১ আসনে; ২ লাখ ২৮ হাজার ৪৩১ জন। আর সর্বোচ্চ ভোটার রয়েছে গাজীপুর-২ আসনে; ৮ লাখ ৪ হাজারের বেশি।
শুক্রবার জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা ব্যয় করা যাবে। যে আসনের ভোটার সংখ্যা বেশি, সংশ্লিষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী ব্যয় করবেন ভোটার প্রতি ১০ টাকা, যেটা বেশি হয়।”
ভোটার প্রতি ১০ টাকার ব্যয়ের বিষয়টির ব্যাখ্যায় সংশ্লিষ্টরা বলেন, কোনো আসনে ভোটার আড়াই লাখের কম থাকলে সংশ্লিষ্ট আসনের প্রার্থী সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা ব্যয় করতে পারবেন। তার বেশি হলে ভোটারপ্রতি খরচ করা যাবে ১০ টাকা হারে।

ভোটার তারতম্য
>> ২ থেকে ৩ লাখ ভোটার রয়েছে, এমন নির্বাচনি এলাকা ২০টি
>>৩ লাখ থেকে ৪ লাখ ভোটার রয়েছে, এমন নির্বাচনি আসন রয়েছে ১০৩টি
>> ৪ থেকে ৫ লাখ ভোটারের আসন রয়েছে ১১৪টি
>>৫ লাখ থেকে ৬ লাখ ভোটার রয়েছে ৫২টি আসনে
>> ৬ থেকে ৭ লাখ ভোটারের আসন সংখ্যা ৭টি
>> ৭ থেকে ৮ লাখ ভোটার রয়েছে তিনটি আসনে; ঢাকা-১৯, গাজীপুর-১ ও নোয়াখালী-৪
>> ৮ লাখের বেশি ভোটার রয়েছে কেবল গাজীপুর-২ আসনে
ভোটার বেশি যে আসন
১৯৫ গাজীপুর-২ ৮০৪৩৩৩
১৯৪ গাজীপুর-১ ৭২০৯৪০
১৯২ ঢাকা-১৯ ৭৪৭০৭০
২৭১ নোয়াখালী-৪ ৭০০৩৩৯
কম ভোটার
১২৫ ঝালকাঠী-১ ২২৮৪৩১
৯০ যশোর-৬ ২২৯১৬৩
১২৯ পিরোজপুর-৩ ২৪১৩৬১
১০১ খুলনা-৩ ২৫৪৪০৯
ঢাকার বিভিন্ন আসনে ভোটার
১৭৪ ঢাকা-১ ৫৪৫১৪০
১৭৫ ঢাকা-২ ৪১৯২১৫
১৭৬ ঢাকা-৩ ৩৬২১৫৯
১৭৭ ঢাকা-৪ ৩৬২৫০৬
১৭৮ ঢাকা-৫ ৪১৯৯৯৬
১৭৯ ঢাকা-৬ ২৯২২৮৩
১৮০ ঢাকা-৭ ৪৮৭১৬০
১৮১ ঢাকা-৮ ২৭৫৪৬৮
১৮২ ঢাকা-৯ ৪৬৯৩৫৮
১৮৩ ঢাকা-১০ ৩৮৮৬৬১
১৮৪ ঢাকা-১১ ৪৩৯০৭৮
১৮৫ ঢাকা-১২ ৩৩৩৩২০
১৮৬ ঢাকা-১৩ ৪০১০০৭
১৮৭ ঢাকা-১৪ ৪৫৬০৪৪
১৮৮ ঢাকা-১৫ ৩৫১৭১৮
১৮৯ ঢাকা-১৬ ৪০০৪৯৯
১৯০ ঢাকা-১৭ ৩৩৩৭৭৫
১৯১ ঢাকা-১৮ ৬১৩৮৪৪
১৯২ ঢাকা-১৯ ৭৪৭০৭০
১৯৩ ঢাকা-২০ ৩৭৬৬৩৯
এবার ৪৩ হাজারের বেশি ভোটকেন্দ্র থাকবে, ভোটকক্ষ থাকবে আড়াই লাখের মতো। রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সহকারি রিটার্নিং কর্মকর্তা ছাড়াও নির্বাহী হাকিম, বিচারিক হাকিমসহ ভোটের দায়িত্বে থাকবে অনেক লোকবল।
ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা থাকবে ৯ থেকে ১০ লাখ। ৭ থেকে ৮ লাখ থাকবে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্য।
কোন আসনে কত ভোটার:
ভোটের ব্যয়ের একাল-সেকাল
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) প্রথম সংসদ নির্বাচনের সময় প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয় নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও মাঝখানে তা ছিল না।
১৯৭২ সালে ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ হয়। এরপর ১৯৮৭ সালে সীমা তুলে দেওয়া হয়। ফের নির্বাচনি ব্যয়ের বিধানযুক্ত করা হয় ১৯৮৫ সালে।
১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে তিন লাখ টাকা, ২০০১ সালে পাঁচ লাখ টাকা, ২০০৮ সালে ১৫ লাখ টাকা ও ২০১৩ সালে ২৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয় আরপিওতে।

সবশেষ ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ভোটার প্রতি ১০ টাকা নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর নির্বাচনি ব্যয় সর্বোচ্চ পঁচিশ লাখ টাকা বহাল ছিল। সব সংসদীয় আসনের জন্য ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা একই।
দেশে ২ লাখ ভোটারের নির্বাচনি আসন যেমন রয়েছে, তেমনি সাত লাখেরও আছে। ভোটার সংখ্যার তারতম্যের মধ্যে একই ব্যয়সীমাকে অনেকে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিবেচনায় নিয়ে ব্যয় বাড়ানোর উদ্যোগ আসে।
এমন প্রেক্ষাপটে প্রার্থীর ব্যয় ভোটার প্রতি ১০ টাকা হারে সর্বোচ্চ করে আরপিও সংশোধন হয়। এর মধ্য দিয়ে কমপক্ষে ২৫ লাখ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৮০ লাখ টাকার বেশি সুযোগ তৈরি হয় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, ফল গেজেট আকারে প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে প্রত্যেক প্রার্থীকে নির্বাচনি ব্যয়ের বিবরণী দাখিল করতে হয়। এছাড়া ফল প্রকাশের ৯০ দিনের মধ্যে ব্যয়ের বিবরণী দাখিল করতে হয় অংশগ্রহণকারী দলগুলোকে।
দলগুলোর কাছে নির্ধারিত সময়ে ব্যয় রিটার্ন জমা দিতে চিঠিও দিয়ে থাকে ইসি।
দলের ব্যয় কত
কোনো দলের প্রার্থী ২০০ জনের বেশি হলে সর্বোচ্চ ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা, প্রার্থীর সংখ্য ১০০ থেকে ২০০ জনের কম হলে ব্যয় করতে পারবে ৩ কোটি টাকা। কোনো দলের প্রার্থীর সংখ্যা ৫০ থেকে ১০০ হলে দেড় কোটি টাকা এবং ৫০ জনের কম হলে সর্বোচ্চ ৭৫ লাখ টাকা ব্যয় করতে পারবে।
ব্যয় রিটার্ন
নির্বাচনি আইন অনুযায়ী সব প্রার্থীকে নির্ধারিত সময়ে ব্যয়ের রিটার্ন দাখিল করতে হবে। ব্যর্থ হলে অথবা এই আদেশ লঙ্ঘন করলে জরিমানাসহ দুই বছর থেকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয় বিবরণী দাখিলের সুবিধার্থে ভোটের পরে এক মাস সকাল ৯টা হতে বিকাল ৫টা পর্যন্ত রিটার্নিং কর্মকর্তা (জেলা প্রশাসক) ও জেলা নির্বাচন অফিসারের কার্যালয় খোলা রাখা হয়।
এবার নির্বাচনি আইন ও বিধিতে সংস্কার আনা হয়েছে।
পোস্টার ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে, নির্দিষ্ট সংখ্যক বিলবোর্ড ব্যবহারসহ সোশাল মিডিয়ায় প্রচারণার সুযোগ রয়েছে। নির্বাচনি ব্যয়ের মধ্যে সার্বিক বিষয় তুলে ধরে নির্ধারিত ছকে তা রিটার্নিং অফিসারের কাছে জমা দিতে হবে।

বিধানাবলী লংঘনের অপরাধ ও শাস্তি
আরপিও মেনে প্রার্থীর জমা দেওয়া বিবরণী বা সম্পূরক বিবরণীতে তুলে ধরা উৎস ছাড়া অন্য কোনো উৎস হতে নির্বাচনি ব্যয় নির্বাহ করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
আরপিও অনুযায়ী-
>>নির্বাচনি এজেন্ট ব্যতীত অন্য কারও মাধ্যমে অর্থ খরচ, নির্বাচনি ব্যয়ের জন্য নির্ধারিত সীমা অতিক্রম ইত্যাদি বিধান লংঘন করলে শাস্তিযোগ্য অপরাধ সংগঠিত হবে।
>> কোনো বিধান লঙ্ঘন করে ব্যবহৃত অর্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর নির্ধারিত পরিমাণের অধিক নির্বাচনি খরচ বলে গণ্য হবে এবং আরপিও লঙ্ঘন হিসেবে ধরা হবে।
>> নির্বাচনি ব্যয় নির্বাহের জন্য সম্ভাব্য উৎসের বিবরণী মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দাখিল না করলে অথবা নির্বাচনি ব্যয়ের রিটার্ন ফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে না করলে বা এ সংক্রান্ত নিয়মাবলী পরিপালন না করলে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হবে।
>> নির্বাচনি এজেন্ট ব্যতীত অন্য কারও মাধ্যমে অর্থ খরচ করা, নির্বাচনি ব্যয়ের সীমা অতিক্রম বা কতিপয় নিষিদ্ধ কার্যক্রম গ্রহণ করলে দুই থেকে সাত বছরের কারাদন্ড হতে পারে।
>> নির্বাচনি ব্যয় নির্বাহের লক্ষ্যে সম্ভাব্য উৎসের বিবরণী ও ব্যয়ের রিটার্ন দাখিল না করলে অথবা এ সংক্রান্ত বিধিবিধান পরিপালন না করলে দুর্নীতিমূলক অপরাধ বলে গণ্য হবে। এজন্য দুই থেকে সাত বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।
আরও পড়ুন
তফসিল ঘোষণা: সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ১২ ফেব্রুয়ারি
এবারও ভোটারপ্রতি খরচ করা যাবে গড়ে ১০ টাকা