Published : 10 Jul 2026, 09:46 PM
বছর খানেক আগে ঢাকার দয়াগঞ্জ এলাকায় কনস্টেবল হুমায়ুন কবীর হত্যার ঘটনায় তার স্ত্রীর সঙ্গে এক আত্মীয়র পরকীয়ার যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা। এ ষড়যন্ত্রে এমন এক স্বজনেরও সংশ্লিষ্টতার কথা বলা হচ্ছে, যার স্বামী নিহতের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা ধার নিয়েছিলেন।
হুমায়ুনকে মেরে ফেললে দেনার টাকা দিতে হবে না ধরে নিয়ে ওই নারী হত্যাকাণ্ডে অংশ নেন বলে অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে।
যাত্রাবাড়ী থানার এসআই আওলাদ হুসাইন গত ২৬ মার্চ ১১ জনের বিরুদ্ধে আদালতে এ অভিযোগপত্র জমা দেন। গত ১ জুলাই অভিযোগপত্র আমলে নিয়েছেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সারাহ ফারজানা হক।
গত বছরের ২৮ এপ্রিল সকালে দয়াগঞ্জ বটতলা এলাকার জজ মিয়ার বাড়ির ফটকের কাছ থেকে হুমায়ুন কবীরের লাশ উদ্ধার করে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ। তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশের পরিবহন বিভাগে জলকামান চালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
এ ঘটনায় তার স্ত্রী সালমা বেগম, সালমার উপপতি রাজিব হোসেন এবং সালমার ভাই মানিকের শ্যালকের স্ত্রী (বেয়াইন) মরিয়ম ওরফে মলির বিরুদ্ধে থানায় হত্যা মামলা করেন নিহতের মেজ ভাই খোকন হাওলাদার। তিনি এজাহারে অভিযোগ করেন, পরকীয়া প্রেমের জেরে হুমায়ুনকে খুন করা হয়।
পরে তদন্তে উঠে আসে, হত্যার নেপথ্যে পরকীয়ার পাশাপাশি দেনা-পাওনার বিষয়ও রয়েছে। নিহতের এক দেনাদারের স্ত্রী এ ঘটনায় সরাসরি জড়িত। খুনের জন্য পাঁচ লাখ টাকায় লোক ভাড়া করা হয়। চুক্তি হয়, সেই টাকা দেওয়া হবে হুমায়ুনের মৃত্যুর পর তারই চাকরির প্রাপ্য আর্থিক সুবিধা থেকে।
অভিযোগপত্রে যাদের আসামি করা হয়েছে, তারা হলেন—হুমায়ুনের স্ত্রী সালমা বেগম, তার পরকীয়া প্রেমিক রাজিব হোসেন (নিহতের ছোট ভাই আল মামুন হাওলাদারের শ্যালক), সালমার বেয়াইন মরিয়ম ওরফে মলি, মলির ভাই মিরাজ মুন্সীর স্ত্রী পলি বেগম, পলির বোনের ছেলে কায়েস হাওলাদার, কায়েসের সহযোগী ফজলে রাব্বি শুভ, রাফি খান, আকাশ, আশিক, সজিব ও সাব্বির।
তাদের মধ্যে সালমা, পলি ও রাফি কারাগারে রয়েছেন। জামিনে রয়েছেন রাজিব, মলি, কায়েস ও রাব্বি। আর আকাশ, আশিক, সজিব ও সাব্বির শুরু থেকেই পলাতক। তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে।
আসামিদের গ্রেপ্তার করা গেল কি না, সেই সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমার দিন আগামী ১৩ অগাস্ট রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই মহিন উদ্দিন।
যোগাযোগ করা হলে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আওলাদ হুসাইন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “পরকীয়া, আর্থিক লেনদেনসহ অনেক বিষয়কে কেন্দ্র করে হুমায়ুন কবীরকে হত্যা করা হয়। তদন্তে গিয়ে ১১ জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়।
“তাদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছি। এদের মধ্যে সাতজনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হই। চারজনকে গ্রেপ্তার করা যায়নি।”
মামলার বাদী হুমায়ুন কবীর পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার রামনগর গ্রামে পরিবার নিয়ে বসবাস করেন।

জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমরা আর কী চাইব, চাইলে কি জান (ভাইয়ের জীবন) ফেরত দিতে পারবে? আইন আইনের গতিতে চলবে।”
অভিযোগপত্রের তথ্য অনুযায়ী, হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে সালমার বিয়ে হয় ২০১০ সালে। তাদের ১৩ বছরের এক ছেলে ও সাত বছরের একটি মেয়ে রয়েছে।
তারা এখন খোকনের পরিবারের সঙ্গে বাউফলে থাকছেন, পড়াশোনা করেন সেখানকার স্কুলে।
খোকনের স্ত্রী রোজিনা শিলা বলেন, “আমরা হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই। আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা চাই। আমার ভাসুরের ছেলে-মেয়ে আমাদের সাথেই থাকছে। ছেলেটা ক্লাসে সেভেনে, আর মেয়ে থ্রিতে পড়াশোনা করছে।”
এক প্রশ্নের জবাবে শিলা বলেন, “ওরা তো ছোট মানুষ। কিছুই বলে না।
“মা-বাবা ছাড়া থাকে, মন তো খারাপ থাকবেই। যতই ভালোবাসি মা-বাবার সেই ভালোবাসা কি আমরা দিতে পারব?”
হত্যার ছক
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, আত্মীয়তার সূত্র ধরে রাজিব দুই বছর ধরে হুমায়ুনের বাসায় নিয়মিত যাতায়াত করতেন। এর মধ্যে বছর খানেক ধরে সালমা ও রাজিবের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক চলছিল। এ নিয়ে হুমায়ুন দম্পতির ঝগড়া-বিবাদ লেগেই থাকতো।
তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এসআই আওলাদ জানিয়েছেন, সালমা তার পারিবারিক কলহের কথা রাজিব ও মলিকে জানান। আত্মীয়তার সুবাদে মলির সঙ্গে সালমার সুসম্পর্ক ছিল। সালমারা যে বাড়ির তৃতীয় তলায় থাকতেন, তার চতুর্থ তলায় ভাড়া থাকতেন মলিরা।
ঘটনার তিন-চার বছর আগে হুমায়ুনের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা ধার নেন মলির স্বামী, প্রবাসী বাবুল মুন্সী। সেই টাকা সময় মত পরিশোধ না করায় হুমায়ুনের সঙ্গে মলির ঝগড়া হয়।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, হুমায়ুনকে হত্যা করলে একদিকে সালমার সঙ্গে রাজিবের সম্পর্কে বাধা থাকবে না, অন্যদিকে মলিদের আর ধারের টাকা ফেরত দিতে হবে না—এমন ভাবনা থেকে এই কনস্টেবলকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন সালমা ও মলি।
ঘটনার দুই মাস আগে মলি মোবাইলে পলিকে বলেন, সালমাকে অনেক মারধর করে থাকেন তার স্বামী হুমায়ুন। এজন্য তাকে খুন করতে ৩-৪ জন ভাড়াটে খুনির দরকার। তখন পলি এ কাজের জন্য তার বোনের ছেলে কায়েসের সঙ্গে মলির যোগাযোগ করিয়ে দেন।
অভিযোগপত্রের তথ্যানুযায়ী, কায়েস ভাড়াটিয়া তিন খুনি শুভ, আশিক ও সজিবকে নিয়ে মলির বাসায় আসেন। সেখানে আসেন রাজিবও। সালমা ও অন্য আসামিরা সেই সাক্ষাতে হুমায়ুনকে হত্যার বিষয়ে আলোচনা করেন। তবে পরিকল্পনার সিদ্ধান্তহীনতার জন্য কায়েস, শুভ, আশিক ও সজিব বরিশালে ফেরত যান।
এর দিন দশেক বাদে শুভকে ফোন করেন পলি। তবে শুভ সাড়া না দেওয়ায় কায়েসের মাধ্যমে পলি যোগাযোগ করে শুভকে সাক্ষাৎ করতে বলেন। এরপর বরিশালে শুভ ও পলির সাক্ষাৎ হয়। হুমায়ুনকে হত্যা করতে ফের শুভর সহযোগিতা চান পলি।
তদন্ত কর্মকর্তা আওলাদ জানান, হত্যা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে শুভ ও তার তিন সহযোগী ১৯ এপ্রিল বরিশাল থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। তাদেরকে বাস টিকেট করে দেওয়ার পাশাপাশি এক হাজার টাকা দেন পলি। ঢাকার সায়েদাবাদে পৌঁছানোর পর শুভদের গ্রহণ করে মলির বাসায় নিয়ে যান রাজিব।
তার দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে দুজন করে আলাদাভাবে চারতলার ওই বাসায় ওঠেন। রাজিব বাসা থেকে বের হয়ে হ্যান্ড গ্লাভস, রশি ও পাইপ কিনে আনেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী পরদিন সজিব ও সাব্বির আসেন। হত্যায় ব্যবহারের জন্য ৪০ হাজার টাকা দিয়ে পিস্তল সংগ্রহ করতে ২১ এপ্রিল বাড্ডায় যান রাকিব, রাজিব ও আকাশ। তবে তারা তা সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হন। এরপর শুভ ও রাজিব অস্ত্র হিসেবে যাত্রাবাড়ী থেকে একটি দা কিনে আনে।

এরপর হুমায়ুন হত্যায় শুভ ও রাফির একাধিক চেষ্টা ব্যর্থ হয় জানিয়ে অভিযোগপত্রে বলা হয়, পরে সালমা তাদের বলেন, হুমায়ুন সাধারণত ভোর ৫টার দিকে কর্মস্থলের উদ্দেশে বাসা থেকে বের হন। বাসার সামনে রিকশা গ্যারেজে সবসময় লোকজন থাকে। এ কারণে কিছুটা দূরে নির্জন এলাকায় হত্যার সিদ্ধান্ত নেন আসামিরা।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শুভ ও রাফি যাত্রাবাড়ীর একটা হোটেলে অবস্থান করেন, সেখানকার ভাড়া বাবদ শুভকে ৫০০ টাকা দেন রাজিব। তবে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হওয়ায় শুভ ও রাফি সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেননি। পরে আসামিরা হুমায়ুনকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করে গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যার পরিকল্পনা করে।
এর মধ্যে সালমার পরকীয়ার বিষয়টি আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে জানাজানি হলে ২৫ এপ্রিল তাদের বাসায় সালিশ বৈঠক করেন হুমায়ুনের মামা আব্দুল জলিল, সালমার ভাই ও মলি।
বৈঠকে পরকীয়ার বিষয়টি ‘প্রমাণিত হয়’ জানিয়ে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, সালমা ওই পারিবারিক বৈঠকে কথা দেন, রাজিবের সঙ্গে তিনি আর সম্পর্ক রাখবেন না।
এর তিন দিন বাদে মাথায় হুমায়ুন হত্যাকাণ্ড ঘটে।
হত্যা যেভাবে
এসআই আওলাদ হুসাইন জানান, পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৭ এপ্রিল দুপুরে সালমা ও পলি যাত্রাবাড়ীর শহীদ ফারুক রোডের একটি ফার্মেসি থেকে ৩-৪ টি ঘুমের ওষুধ নিয়ে মলির বাসায় যান। পলি ওষুধগুলো গুঁড়া করে সালমাকে দেন।
রাত সাড়ে ১০টার দিকে হুমায়ুন বাসায় ফেরেন। সালমা তাকে ঘুমের ওষুধ মিশ্রিত খাবার খেতে দেন। পরে মলি ও পলি ওই বাসায় গিয়ে হুমায়ুনকে নিস্তেজ দেখে চারতলায় উঠে যন। রাত আড়াইটার দিকে মলি, পলি, শুভ, রাফি তৃতীয় তলায় হুমায়ুনের বাসায় আসেন। শুভ ও রাফি হাতে গ্লাভস পরে নেন। সালমা তার বাচ্চাদের শয়নকক্ষের দরজা বাইরে থেকে আটকে দিয়ে হুমায়ুনের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। তখন কনস্টেবল পুরোপুরি বেহুঁশ ছিলেন।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, সালমা গামছা দিয়ে প্রথমে হুমায়ুনের দুই পা এবং পরে দুই হাত বেঁধে ফেলেন। শুভ ও রাফি ওই কক্ষে এলে সালমা ভেতর থেকে দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে দেন। দরজার বাইরে পাহাড়ায় থাকেন মলি ও পলি।
রাফি খাটের উপরে উঠে হুমায়ুনের গলার নিচ দিয়ে রশি ঢুকিয়ে গিঁট দেন, রাফি বাম পাশ থেকে ও রাফি ডান পাশ থেকে রশির মাথা ধরে টান দেন। সালমা হুমায়ুনের পা চেপে ধরে রাখেন। শুভ ডান হাঁটু দিয়ে এবং রাফি বাম পা দিয়ে হুমায়ুনের শরীর চেপে ধরে জোরে রশি টান দেন। হুমায়ুনের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর শুভ নিহতের মোবাইল ফোন নিয়ে মলির বাসায় চলে যান।
শুভ ও রাফি সেখানে ধূমপান করেন, তাদের হাতে পাঁচ হাজার টাকা ধরিয়ে দেন মলি। তিনি বলেন, চুক্তি মোতাবেক হুমায়ুনের চাকরির প্রাপ্য আর্থিক সুবিধা হাতে এলে তখন পাঁচ লাখ টাকা দেওয়া হবে।
খানিক বাদে তারা সবাই তিনতলায় ফিরে যান। হুমায়ুনের গলায় বাঁধা রশি ও হাত-পায়ে বাঁধা গামছা খুলে দেন শুভ ও রাফি। রাফির সহায়তায় শুভ তার বাম কাঁধে লাশ তুলে বাসার নিচতলায় কেচি গেইটের সামনে আসেন। মলি গেইট খুলে দেয়। রিকশা গ্যারেজ খোলা থাকায় হুমায়ুনের লাশ বাসার সামনে ফেলে বরিশালে চলে যান শুভরা।
সালমা ও মলি উপরে চলে আসেন। হত্যার বিষয়টি লুকাতে সালমার বাসার বাইরে তালা ঝুলিয়ে মলি নিজের বাসায় যান।
যোগাযোগ করা হলে সালমা বেগমের আইনজীবী কামাল হোসেন বলেন, “সালমা বেগমের জামিন শুনানির জন্য আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি।”
পরকীয়াসহ অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পরে যোগাযোগ করতে বলেন।