Published : 09 Jul 2026, 02:19 PM
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে ২০২৩ সালের পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের প্রার্থীদের ফল কোটার পরিবর্তে মেধার ভিত্তিতে প্রকাশের রায় দিয়েছে আপিল বিভাগ।
একই সঙ্গে এ মামলার ১৫১ জন রিটকারীকে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে আইন অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়ার এবং ইতোমধ্যে নিয়োগ পাওয়া ৬ হাজার ৫৩১ জনের নিয়োগ বহাল রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করে।
এতে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের ৪৬ হাজার ১৯৯ জন প্রার্থীর ফল পুনরায় প্রকাশ করতে বলা হয়েছে। আগের ৮৪ শতাংশ কোটার পরিবর্তে সুপ্রিম কোর্টের কোটা সংস্কার সংক্রান্ত মামলার রায়ের আলোকে ৯৩ শতাংশ মেধার ভিত্তিতে এ ফল নতুন করে মূল্যায়ন করতে হবে।
রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ১৫১ জন রিটকারী প্রার্থী সরাসরি বা ঢালাওভাবে নিয়োগ পাবেন না।
আদালত তাদের নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা বিবেচনার নির্দেশনা দিয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, “এ কথা সত্যি যে, পূর্বে ১৫১ জনকে চাকরি দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। আজ আদালত সে নির্দেশনা বহাল রাখলেও তা হবে ‘ইন অ্যাকর্ডেন্স উইথ ল বা আইন অনুযায়ী।”
রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা বলেন, “আমি মাননীয় প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এই মামলা চলাকালীন ওই ১৫১ জন রিট আবেদনকারীর চূড়ান্ত ফলাফল শিট দেখাই। আমি আদালতকে বলেছি, এই ১৫১ জনের মধ্যে যদি আমরা মেধার ভিত্তিতেও ফলাফল প্রকাশ করি, তাহলে মাত্র ১৭ জন কোয়ালিফাই বা উত্তীর্ণ হন।”
রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, “আমার এই বক্তব্যের পর মাননীয় প্রধান বিচারপতি এবং অন্যান্য বিচারপতিগণ দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেছেন, আমরা যে আদেশটি দিচ্ছি, সেটি হচ্ছে ইন অ্যাকর্ডেন্স উইথ ল। অর্থাৎ, আইন অনুযায়ী কেউ যদি যোগ্য প্রার্থী হয়ে থাকেন ওই ১৫১ জনের মধ্যে, তবেই তাদের ক্ষেত্রে আপিল বিভাগের আজকের এই আদেশটি কার্যকর হবে।”
মামলাটি নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে পাওয়া নির্দেশনার কথা তুলে ধরে অ্যাটর্নি জেনারেল কাজল বলেন, “আমি এই মামলার চূড়ান্ত শুনানির পূর্বে সরকারের নীতি-নির্ধারকদের সঙ্গে কথা বলেছি। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী জনাব আ ন ম এহছানুল হক মিলন এমপি, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মাননীয় প্রতিমন্ত্রী জনাব ববি হাজ্জাজ এমপি এবং মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গে কথা বলে সরকারের পক্ষ থেকে আমি প্রোপার ইন্সট্রাকশন বা নির্দেশনা নিয়ে আদালতে এসেছিলাম।”
রিটকারীদের পক্ষে মামলা পরিচালনাকারী জ্যেষ্ঠ আইনজীবী তাজুল ইসলাম মামলার পটভূমি তুলে ধরে বলেন, “২০২৩ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের জন্য একটি সার্কুলার জারি করা হয়েছিল। তখনকার সময়ে বিদ্যমান কোটা পদ্ধতি অনুযায়ী সেখানে ৮৪ শতাংশ কোটার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার বিধান ছিল।
“এই বৈষম্যমূলক কোটা পদ্ধতিকে চ্যালেঞ্জ করে এবং জুলাই বিপ্লবের পর সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক ঘোষিত ৯৩ শতাংশ মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের জাজমেন্টের আলোকে নিয়োগ প্রদানের দাবি জানিয়ে ১৫১ জন চাকরিপ্রত্যাশী হাই কোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেন।”
আইনজীবী তাজুল বলেন, “ওই রিটের শুনানির পর হাই কোর্ট বিভাগ পূর্বের কোটাভিত্তিক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে অবৈধ ঘোষণা করেন এবং রিটকারী ১৫১ জনকে নিয়োগ প্রদানের নির্দেশ দেন।
“পরবর্তীতে সরকারপক্ষ হাই কোর্টের এই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে আপিল বিভাগে আবেদন করে। আজ চূড়ান্ত শুনানি শেষে আপিল বিভাগ সরকারের সেই আপিল নিষ্পত্তি করে এই গুরুত্বপূর্ণ রায় প্রদান করলেন।”
ফল পুনঃমূল্যায়নের বিষয়ে এ আইনজীবী বলেন, “ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে ওই নিয়োগ পরীক্ষার লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া ৪৬ হাজার ১৯৯ জন প্রার্থীর মৌখিক পরীক্ষার ফলসহ পুরো ফলাফল মেধার ভিত্তিতে নতুন করে পুনর্মূল্যায়ন করে প্রকাশ করা হবে।
“রিটকারী ১৫১ জন প্রার্থীর পক্ষে গত বছরের ৩ মার্চ সরকারও আদালতে একটি অ্যাফিডেভিট বা হলফনামা দাখিল করেছিল। সুতরাং সরকারের সেই প্রতিশ্রুতি ও অ্যাফিডেভিটের ভিত্তিতেই তাদের মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হবে, যা সুপ্রিম কোর্টের কোটা-সংক্রান্ত রায় মেনেই হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হবে।”
ইতোমধ্যে নিয়োগপ্রাপ্তদের বহাল রাখার যৌক্তিকতা এবং নতুন করে মামলার সুযোগ নিয়ে তাজুল ইসলাম বলেন, “৬ হাজার ৫৩১ জনের নিয়োগ বাতিল করা হলে প্রশাসনিকভাবে একটি বড় বিশৃঙ্খলা তৈরি হতো। সে কারণে আদালত ‘কমপ্লিট জাস্টিস’ বা পূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচারের স্বার্থে তাদের নিয়োগ বহাল রেখেছেন।”
রিটকারীদের আইনজীবী তাজুল বলেন, “নতুন করে কারও মামলা করে নিয়োগ পাওয়ার সুযোগ নেই। এই রায়টি সুনির্দিষ্টভাবে বিচারাধীন মামলার ক্ষেত্রে এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রযোজ্য হবে।
“যে বিষয়গুলো ইতোমধ্যে চূড়ান্ত বা কনক্লুডেড হয়ে গেছে, সেগুলো চূড়ান্ত বলেই গণ্য হবে।”