১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

পঞ্চদশ সংশোধনী: হাই কোর্টের রায় বদলালো না আপিল বিভাগ

হাই কোর্ট পঞ্চদশ সংশোধনীর কিছু অংশ বাতিল ঘোষণা করায় নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফেরার পথ তৈরি হয়।

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 09 Jul 2026, 12:23 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:37 PM

সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী আংশিক বাতিল করে হাই কোর্ট যে রায় দিয়েছিল, তা বহাল রেখেছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।

প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ বৃহস্পতিবার সকালে এ রায় ঘোষণা করে।

রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, “হাই কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে বদিউল আলম মজুমদার সাহেবসহ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে যে আপিল করা হয়েছিল, সে আপিলগুলো ডিসমিস করে দিয়েছেন (আপিল বিভাগ)। অর্থাৎ হাই কোর্টের রায়টি বহাল থাকল।”

পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ২০১১ সালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্ত করার পাশাপাশি সংবিধানের ৫৪টি ক্ষেত্রে সংযোজন, পরিমার্জন ও প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ কয়েকজনের করা একটি রিট আবেদনের নিষ্পত্তি করে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর পঞ্চদশ সংশোধনীর কিছু অংশ বাতিল ঘোষণা করে হাই কোর্ট।

ওই রায়ের ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফেরার পথ তৈরি হয়। কিন্তু তাতে সন্তুষ্ট না হয়ে পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের দাবিতে হাই কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে রিটকারীপক্ষ। কারণ তাদের মতে, আংশিক বাতিলের ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সম্পূর্ণ কার্যকর হয়নি এবং প্রধান উপদেষ্টার শপথের বিধানটি ফিরে আসেনি।

পাশাপাশি নওগাঁর বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেন এ মামলায় পক্ষভুক্ত হয়ে আলাদাভাবে আপিল করেন। এছাড়া জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার আরেকটি আপিল করেন এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি নামের একটি সংগঠন লিভ টু আপিল করে শুনানিতে অংশ নেয়।

গত সোমবার থেকে তিন দিনের শুনানিতে পক্ষগুলো তাদের মতামত তুলে ধরে। এরপর বৃহস্পতিবার আপিল বিভাগ যে সিদ্ধান্ত দিল, তাতে হাই কোর্টের রায়ের কোনো পরিবর্তন ঘটল না।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, “হাই কোর্ট ডিভিশন চারটি বিষয়ের ওপর অবজারভেশন দিয়েছিল। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে ফিরে আসা, গণভোট ফিরে আসা এবং সংবিধানের সাতের ‘ক’, সাতের ‘খ’ এবং সুপ্রিম কোর্টের যে রিটের যে ক্ষমতা, সেই ক্ষমতা।

“তো আলটিমেটলি এই রায়ের ফলে হাই কোর্টের যে রায়, সেই রায়টি বহাল থাকল। অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরে এল। আর বাকিগুলো এখন সংসদে, পরে যেটা হাইকোর্ট ছেড়ে দিয়েছিল, সেটা আলটিমেটলি সংসদের সিদ্ধান্ত।"

আদালতে সুজন সম্পাদকসহ চার ব্যক্তির পক্ষে আইনি লড়াই করেন আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া, তার সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী কারিশমা জাহান ও রেদুয়ানুল করিম।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেলের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির।

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির পক্ষে আইনজীবী ইমরান এ সিদ্দিক এবং মোফাজ্জল হোসেনের পক্ষে আইনজীবী এ এস এম শাহরিয়ার কবির শুনানি করেন।

ইন্টারভেনার বা তৃতীয় পক্ষ হিসেবে যুক্ত একটি সংগঠনের পক্ষে আইনজীবী এহসান এ সিদ্দিক এবং ইন্টারভেনার হিসেবে আইনজীবী হামিদুল মিসবাহ শুনানিতে অংশ নেন।

রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল এবং অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক।

কী ছিল হাই কোর্টের রায়ে?

২০১১ সালের ৩০ জুন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী বিলটি পাস হয় এবং ওই বছরের ৩ জুলাই রাষ্ট্রপতি তাতে অনুমোদন দিয়ে গেজেট প্রকাশ করেন।

এই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ৫৫টি ক্ষেত্রে সংযোজন, পরিমার্জন ও প্রতিস্থাপন আনা হয়েছিল।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ছিল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বাতিল করা। এতে নির্বাচনের বিধান হিসেবে পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে অর্থাৎ মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই দলীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিষয়টি সংযোজন করা হয়।

পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ইসির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালত কোনো নির্দেশ দিতে পারবে না বলে বিধান যুক্ত করা হয়েছিল।

এছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং সংবিধানে জাতীয় চার মূলনীতি—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনা হয়।

জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন সংখ্যা ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০ এ উন্নীত করা হয়।

অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকে রাষ্ট্রদ্রোহ অপরাধ বিবেচনায় নিয়ে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধানও যুক্ত করা হয় এই সংশোধনীতে।

পাশাপাশি সংবিধানে বঙ্গবন্ধুর ১৯৭১ সালের সাতই মার্চের ভাষণ, ছাব্বিশে মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা ও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা ফেরানোর দাবি জোরালো হয় এবং ওই বছরের ১৮ আগস্ট সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, তোফায়েল আহমেদ, এম হাফিজ উদ্দিন খান, জোবাইরুল হক ভূঁইয়া ও জাহরা রহমান হাই কোর্টে প্রথম রিট আবেদনটি করেন।

প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ১৯ অগাস্ট রুল জারি করে বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি শশাঙ্ক শেখর রায়ের হাই কোর্ট বেঞ্চ। পঞ্চদশ সংশোধনী কেন অবৈধ হবে না, তা জানতে চাওয়া হয় সেই রুলে।

পরে অক্টোবরে নওগাঁর রানীনগরের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা মো. মোফাজ্জল হোসেন পঞ্চদশ সংশোধনীর ১৭টি ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আরেকটি রিট আবেদন করেন।

এই দ্বিতীয় রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ২৯ অক্টোবর বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর হাই কোর্ট বেঞ্চ রুল জারি করে।

পরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন সংগঠ এ মামলায় যুক্ত হয়। রুল শুনানির পর্যায়ে আদালতকে আইনি সহায়তা করতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, গণফোরাম, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশসহ বেশ কিছু সংস্থা ও বিশিষ্ট ব্যক্তি ইন্টারভেনার হিসেবে যুক্ত হন।

২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর হাই কোর্ট বেঞ্চ পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে রিট মামলার রায় ঘোষণা করে।

ওই রায়ে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্তি-সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ ধারা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করা হয়।

পাশাপাশি পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত ৭ক, ৭খ, এবং ৪৪ (২) অনুচ্ছেদ বাতিল ঘোষণা করা হয়।

এছাড়া সংবিধানে গণভোটের বিধান বিলুপ্তি সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ৪৭ ধারা বাতিল ঘোষণা করে দ্বাদশ সংশোধনীর ১৪২ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করা হয়।

আদালত রায়ে বলা হয়, পঞ্চদশ সংশোধনী আইনটি পুরোপুরি বাতিল করা হয়নি, বরং বাকি বিধানগুলোর বিষয়ে আগামী জাতীয় সংসদ জনগণের মতামত নিয়ে সংশোধন বা পরিবর্তন করতে পারবে।

২০২৫ সালের ৮ জুলাই প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর্যবেক্ষণে হাই কোর্ট গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় তুলে ধরে।

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে নির্বাচন ব্যবস্থাকে ‘দলীয়করণের’ মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো 'গণতন্ত্র' ও 'জনগণের সার্বভৌমত্ব' ধ্বংস করা হয়েছে।

হাই কোর্ট বলে, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে যুক্ত হয়েছিল ‘সাধারণ মানুষের ঐকমত্য এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবির ফসল’ হিসেবে। এই ব্যবস্থা বাতিলের ফলে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে নাগরিকদের ভোটাধিকার ‘হরণ’ করা হয়, যা শেষ পর্যন্ত জুলাই-অগাস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের জন্ম দেয়।

পর্যবেক্ষণে ৭ (ক) অনুচ্ছেদ সম্পর্কে আদালত বলে, অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের অভিযোগে সর্বোচ্চ শাস্তির যে বিধান যুক্ত করা হয়েছিল, তা অত্যন্ত অস্পষ্ট এবং ‘ভিন্নমত দমনের’ একটি হাতিয়ার। এটি নাগরিকদের বাকস্বাধীনতার মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করেছে।

৭ (খ) অনুচ্ছেদের মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক বিধানাবলি চিরতরে সংশোধন অযোগ্য করার বিষয়টিকে আদালত ‘সংবিধান পরিপন্থি’ বলে সিদ্ধান্ত দেয়, কারণ এটি ভবিষ্যৎ সংসদের ক্ষমতা খর্ব করার পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টের বিচারিক পর্যালোচনার ক্ষমতাকেও বাধাগ্রস্ত করে।

এছাড়া ৪৪ (২) অনুচ্ছেদ বাতিল করার যুক্তিতে আদালত বলে, হাই কোর্টের ক্ষমতা অন্য কোনো আদালতকে দেওয়ার বিধানটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ এবং এটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থি।

আদালত পর্যবেক্ষণ দেয়, পঞ্চদশ সংশোধনী পাসের ক্ষেত্রে ‘চরম তাড়াহুড়ো’ করা হয়েছিল। সংসদীয় বিশেষ কমিটিকে সংবিধান সংশোধনের সুপারিশ করার দায়িত্ব দেওয়া হলে তারা প্রথমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে সর্বসম্মত সুপারিশ করেছিল।

কিন্তু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পরই সেই সুপারিশ পরিবর্তন করে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিলের চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়।

বিলটি সংসদে উপস্থাপনের পর সংসদীয় কমিটিকে ১৪ দিন সময় দেওয়া হলেও মাত্র ৪ দিন পর কোনো আলোচনা ছাড়াই বিল ফেরত দেওয়া হয় এবং সংসদে বিনা বিতর্কে তা পাস করা হয়।

হাই কোর্ট বলেছে, আপিল বিভাগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পরবর্তী দুই মেয়াদের জন্য বহাল রাখার যে আদেশ দিয়েছিল, তৎকালীন সরকার ও আইনপ্রণেতারা তা ‘সম্পূর্ণ উপেক্ষা’ করেছিলেন, যা আদালতের আদেশের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।