Published : 14 Aug 2025, 04:35 PM
যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত নেত্রী শামীমা নূর পাপিয়া ও তার স্বামী মফিজুর রহমান সুমনের অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলায় সাড়ে তিন বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত।
বৃহস্পতিবার এ রায় ঘোষণা করেন ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক আবু তাহের।
কারাদণ্ডের পাশাপাশি পাপিয়া ও সুমনকে পাঁচ লাখ টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে ছয় মাসের কারাদণ্ড হয়েছে।
এদিন জামিনে থাকা পাপিয়া আদালতে হাজির হন। সুমনকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়।
দুদকের তরফে কৌঁসুলি মাহমুদ হোসেন জাহাঙ্গীর মামলাটি রায়ের পর্যায় থেকে অধিকতর শুনানির জন্য আবেদন করেন। পাপিয়া ও সুমনের তরফে তাদের আইনজীবী শাখাওয়াত উল্লাহ ভূঁইয়াও শুনানি করেন। দুপুর ১টা ২০ মিনিট থেকে শুরু হওয়া শুনানি চলে ২টা ২০ মিনিট পর্যন্ত।
এরপর এক ঘণ্টা ১০ মিনিটের বিরতি দিয়ে বিকাল সাড়ে ৩টায় পুনরায় শুনানি শুরু হয়। ৪টা ১০ মিনিটের দিকে আদালত রায় ঘোষণা করে।
আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয়। পরে আসামিপক্ষের আবেদনে পাপিয়াকে বিশেষ বিবেচনায় কারাগারে না পাঠানোর আদেশ দেন বিচারক। তবে অন্য মামলায় গ্রেপ্তার থাকায় সুমনকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।
পাপিয়া দম্পতির আইনজীবী শাখাওয়াত উল্লাহ ভূঁইয়া বলেন, “এ মামলায় তাদের ২০২০ সালের ১৫ ডিসেম্বর গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ২০২৪ সালের ২০ জুন পাপিয়া কারামুক্ত হন। তবে অপর আসামি মফিজুর গ্রেপ্তারের পর থেকেই কারাগারে রয়েছেন।
“আদালত তাদের যে সাজা দিয়েছেন, সেই মেয়াদের সাজা তারা আগেই শেষ করেছেন। পাপিয়াকে কারাগারে না পাঠিয়ে আমরা তার মুক্তি চেয়ে আবেদন করি। পরে আদালত বিশেষ বিবেচনায় আমাদের আবেদনটি মঞ্জুর করেছেন। তাকে কারাগারে যেতে হয়নি। আদালতের দেওয়া সাজা তারা ইতোমধ্যেই ভোগ করে ফেলেছেন। আমরা রায়ের পর্যবেক্ষণ দেখে আপিলের সিদ্ধান্ত নেব।”
রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে দুদকের আইনজীবী মাহমুদ হোসেন জাহাঙ্গীর বলেন, “এ মামলায় সর্বোচ্চ সাজা ছিল ১০ বছর। আদালত তাদের সাড়ে তিন বছরের সাজা দিয়েছেন।
“এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলব। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আপিল করা হবে।”

সোয়া ৬ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০২০ সালের ৪ অগাস্ট দুদকের উপপরিচালক শাহীন আরা মমতাজ এ মামলা দায়ের করেন।
তদন্ত শেষে পরের বছরের মার্চ মাসে পাপিয়া ও তার স্বামী মফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন দুদক কর্মকর্তা শাহীন আরা মমতাজ।
সেখানে পাঁচ কোটি ৮৪ লাখ ১৮ হাজার ৭১৮ টাকার অবৈধ সম্পদ নিজেদের দখলে রাখার অভিযোগ আনা হয় পাপিয়া ও তার স্বামীর বিরুদ্ধে। এরপর ২০২১ সালের ৩০ নভেম্বর আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় আদালত।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, ২০১৯ সালের ১২ অক্টোবর থেকে গত ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত গুলশানের ওয়েস্টিন হোটেলের প্রেসিডেনসিয়াল স্যুট এবং চেয়ারম্যান স্যুটসহ ২৫টি কক্ষে অবস্থান করে খাবার, মদ, স্পা, লন্ড্রি, বারের খরচ বাবদ তিন কোটি ২৩ লাখ ২৪ হাজার ৭৬১ টাকার বিল নগদে পরিশোধ করেন পাপিয়া।
ওয়েস্টিন হোটেলে থাকার সময় তিনি প্রায় ৪০ লাখ টাকার কেনাকাটা করেছেন, যার কোনো বৈধ উৎস তিনি তদন্তের সময় দেখাতে পারেননি।
এছাড়া ২০১৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে মাসে ৫০ হাজার টাকা করে ৩০ লাখ টাকা বাসা ভাড়া দিয়েছেন। গাড়ির ব্যবসায় এক কোটি টাকা এবং নরসিংদীতে কেএমসি কার ওয়াশ সলিউশনে ২০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন।
বিভিন্ন ব্যাংকে পাপিয়া ও তার স্বামীর নামে ৩০ লাখ ৫২ হাজার ৯৫৮ টাকা জমা আছে উল্লেখ করে মামলায় বলা হয়, দুদকের অনুসন্ধানে এসব অর্থের বৈধ কোনো উৎস পাওয়া যায়নি।
২০২০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পাপিয়া ও তার স্বামী মফিজুর রহমানকে ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ঢাকা ও নরসিংদীতে পাপিয়ার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে বিপুল সম্পদের খোঁজ পাওয়ার কথা জানায় র্যাব।
অভিযানে তাদের বাসা থেকে নগদ ৫৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা এবং মফিজুর রহমান সুমনের নামে হোন্ডা সিভিএ ২০১২ মডেলের একটি গাড়ি জব্দ করা হয়, যার দাম ২২ লাখ টাকা।
সে সময় র্যাবের তরফ থেকে বলা হয়, পাপিয়া গুলশানের ওয়েস্টিন হোটেল ভাড়া নিয়ে ‘অসামাজিক কার্যকলাপ’ চালিয়ে যে আয় করতেন, তা দিয়ে হোটেলে বিল দিতেন কোটি টাকার ওপরে।
সব মিলিয়ে তাদের নামে ছয় কোটি ২৪ লাখ ১৮ হাজার ৭১৮ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ রয়েছে উল্লেখ করে দুদকের মামলায় বলা হয়, এসব অর্থ তারা অপরাধজনক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আয় করেছেন।
গ্রেপ্তারের পর পাপিয়া ও তার স্বামীর বিরুদ্ধে শেরেবাংলা নগর থানায় অস্ত্র ও মাদক আইনে দুটি মামলা করে র্যাব। বিমানবন্দর থানায়ও তাদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইন-১৯৭৪ এর অধীনে একটি মামলা দায়ের করা হয়। আর গুলশান থানায় মুদ্রা পাচার প্রতিরোধ আইনে সিআইডি আরেকটি মামলা করে। পরে দুদক পাপিয়ার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করে।
এর মধ্যে ২০২০ সালের ১২ অক্টোবর অস্ত্র মামলায় পাপিয়া ও সুমনের ২০ বছরের কারাদণ্ড হয়। আর অর্থ পাচারের মামলায় গত ২৫ মে পাপিয়ার চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয় আদালত। তবে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় পাপিয়ার স্বামী মফিজুর রহমান ওরফে সুমন চৌধুরীসহ সহযোগীরা খালাস পান।
আরও পড়ুন
অর্থপাচার মামলায় পাপিয়ার ৪ বছরের কারাদণ্ড
অবৈধ সম্পদ: পাপিয়া-সুমনের বিচার শুরু
'৫ কোটি টাকার সম্পদ লুকিয়েছেন' পাপিয়া ও তার স্বামী