Published : 24 Jan 2026, 01:44 AM
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন যেসব গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছিল, তার অনেকগুলোই নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন ওই কমিশনের সদস্য এবং নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী।
তার উপলব্ধি, বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থায় বড় কোনো সংস্কার আসলে হয়নি।
নির্বাচনি আচরণবিধি ভঙ্গের যে প্রবণতা, তাতেও খুব একটা পরিবর্তন দেখছেন না বহু বছর নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করা টুলী।
তিনি বলছেন, ‘আইন না মানার প্রবণতা’ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ‘খুবই প্রকট’ হয়ে দেখা দিয়েছে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের আলোচনা অনুষ্ঠান ইনসাইড আউটে যোগ দিয়ে জেসমিন টুলী বলেন, একটি ভালো নির্বাচন করার কোনো বিকল্প বাংলাদেশের সামনে এখন নেই। কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির যতটা উন্নতি হওয়া দরকার, তা এখনো ‘হয়নি’। ভোটের পরিবেশ যেমন হলে ভোটার নিরাপদ বোধ করতে পারে, সেই পরিবেশ এখনো তিনি দেখছেন না।
আচরণবিধি লঙ্ঘনের সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা, ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের সীমাবদ্ধতা, পোস্টাল ব্যালটের সাফল্য-ব্যর্থতা, নির্বাচনে এআই হুমকির মত বিষয়েও খোলামেলা আলোচনা করেছেন এই বিশেষজ্ঞ।

নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার ‘কতটুকু’
আওয়ামী লীগ আমলের তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের পর নির্বাচন ব্যবস্থায় সংস্কার করার জোর দাবি ছিল। নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন বেশ কিছু সুপারিশও করেছিল।
কিছু সুপারিশ নিয়ে নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধন করলেও ‘গুরুত্বপূর্ণ’ অনেকগুলো সুপারিশ গ্রহণ করেননি বা আংশিক গ্রহণ করেছে বলে জেসমিন টুলীর ভাষ্য।
তিনি বলেন, “আসলে সংস্কার কমিশন অনেকগুলো সুপারিশ দিয়েছিল নির্বাচন ব্যবস্থাকে সুষ্ঠু করার জন্য। তার মধ্যে প্রথমত ছিল ‘না’ ভোটের বিধানটা, যেটা ইলেকশন কমিশন আংশিক নিয়েছে।
“সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ছিল সব আসনে ‘না’ ভোট থাকবে। কিন্তু ইলেকশন কমিশন যেটা নিয়েছে তা হল, শুধুমাত্র যেখানে একক ক্যান্ডিডেট হবে সেখানেই ‘না’ ভোট হবে।”
সব আসনে ‘না’ ভোটের বিধান রাখার সুপারিশটি ‘খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল’ বলে মনে করেন সংস্কার কমিশনের এই সদস্য।
নির্বাচনি প্রচারে পোস্টার ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞার মত বেশ কিছু বিষয় ইসি নিজে থেকেই আচরণ বিধিমালার অন্তর্ভুক্ত করেছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
রাজনৈতিক দল ও তাদের নিবন্ধন নিয়ে সংস্কার কমিশন বেশ কিছু সুপারিশ করলেও নির্বাচন কমিশন তা ‘খুব একটা নেয়নি’ জানিয়ে টুলী বলেন, “সংস্কার কমিশন বলেছিল যে, কোনো রাজনৈতিক দল থেকে মনোনয়ন পেতে হলে প্রার্থীকে ওই দলের সদস্য হিসাবে তিন বছর থাকার বাধ্যবাধকতা থাকবে।
“এই বিধানটা ২০০৭-০৮ এ যখন একবার অর্ডিনেন্স করা হয়েছিল আরপিওর, সেখানে এটা ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে যখন ২০০৯ এ তা আইনে রূপান্তর করা হল তখন এই বিধানটা বাদ দিয়ে দেওয়া হল। এবারও এটা সুপারিশ ছিল, কিন্তু এই সুপারিশটা নেওয়া হয়নি।”
প্যানেল করে দলের তৃণমূলের সুপারিশের ভিত্তিতে নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার বিধান আরপিওতে অন্তর্ভুক্ত থাকলেও তার প্রয়োগ না হওয়ায় আক্ষেপ করেন নির্বাচন কমিশনের সাবেক এই কর্মকর্তা।
নির্বাচনে জয়ী হতে ভোটারদের দেওয়া মোট ভোটের ৪৫ শতাংশ পাওয়ার বাধ্যবাধকতা রাখার সুপারিশও সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকে করা হয়েছিল, তবে ইসি তা বিবেচনায় নেয়নি বলে জানান টুলী।
সংস্কার কমিশন ১০০ আসনের ভোটে সরাসরি নারী প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়ার সুপারিশ করলেও রাজনৈতিক দলগুলো সে সুপারিশকে ‘পাত্তা দেয়নি’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “বর্তমানে প্রায় ৬০টি পলিটিক্যাল পার্টির রেজিস্ট্রেশন দেওয়া আছে। ৫১টা রাজনৈতিক দল এবার ইলেকশন করছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে ৩০-৩১টা রাজনৈতিক দল কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি। আর কিছু দল (নারী) প্রার্থী দিয়েছে, তাও খুব কম।”
তবে রাজনৈতিক দলগুলো জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করলে স্ব স্ব দলের প্রতীকে ভোট করার বিধানের মত কিছু সুপারিশ ইসি গ্রহণ করেছে বলে জেসমিন টুলী জানিয়েছেন।
তবে সব মিলিয়ে তার আক্ষেপ, “আসলে (নির্বাচন ব্যবস্থায়) বড় কোনো সংস্কার হয়নি।”

রাজনৈতিক দলগুলো ‘সংস্কৃতি থেকে বের হতে পারেনি’
নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হয়েছে বৃহস্পতিবার। কিন্তু তার আগেই প্রায় সবগুলা দলের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ‘আচরণ বিধি’ লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠছে।
রাজনৈতিক দলগুলো ‘আগের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে না পারায়’ আচরণ বিধি লঙ্ঘনের হিড়িক লেগেছে বলে মনে করছেন নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ও নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী।
তিনি বলেন, “এই আচরণবিধি ভঙ্গ, আচরণ বিধিমালা আর যেভাবে বাস্তবায়ন করার কথা, ইলেকশন কমিশন সেভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে না। এই সবকিছুর দিকে যদি আমরা গভীরভাবে তাকাই, তাহলে দেখা যায় যে এটা আমাদের রাজনীতির সংস্কৃতির সাথে মিলে আসছে।”
প্রতীক বরাদ্দের পর ২২ জানুয়ারি থেকে ভোটের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু কথা থাকলেও তফসিল ঘোষণার পর থেকেই অনেক প্রার্থী প্রচার শুরু করেছেন। সে বিষয়টি তুলে ধরে জেসমিন টুলী বলেন, “এই প্রচারণার সাথে কিন্তু আরও একটা জিনিসের সম্পর্ক আছে, সেটা হলো খরচ। খরচের ব্যাপারটাও আছে আইনের মধ্যে বাধ্যবাধকতা যে, কোন প্রার্থী কত টাকা খরচ করতে পারবে বা কোন রাজনৈতিক দল কত টাকা খরচ করতে পারবে।”
নির্বাচন কমিশন যে অর্থে আইনগুলো করে, সেই অর্থে তা প্রয়োগ করতে পারে না মন্তব্য করে সাবেক এই অতিরিক্ত সচিব বলেন, “কারণ প্রতিটা রাজনৈতিক দলই তা (আইন) ভাঙে, প্রতিটা প্রার্থী তা ভাঙে।”

দুই ‘শোকজ’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানার বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ বেশ আলোচনা জন্ম দিয়েছে। জেলা প্রশাসক কেন তাকে শোকজ করলেন, সেই প্রশ্ন তুলেছেন বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত এ নেত্রী।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ জেসমিন টুলী মনে করছেন, রুমিন যে ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে ‘ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও অসৌজন্যমূলক আচরণ’ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে, তিনি জেলা প্রশাসকের অধীন হওয়ায় রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে ডিসিই শোকজ করেছেন।
তিনি বলেন, “জেলা প্রশাসক ওখানকার রিটার্নিং অফিসার। রিটার্নিং অফিসার ইলেকশনের আচরণ বিধিমালা লঙ্ঘনের জন্য ব্যবস্থা নিতে পারেন।”
এদিকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচার চালিয়ে ব্যানার টাঙানোয় জাতীয় নাগরিক পার্টির-এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও দলটির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে কারণ দর্শাতে বলা হয়, যা নিয়ে দলটির পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া জানানো হয়।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ জেসমিন টুলী বলছেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারের জন্য নয়, বরং ওই ব্যানারে দলীয় প্রতীক ব্যবহার করার জন্য নাহিদ ইসলাম ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বিরুদ্ধে আচরণ বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
“‘হ্যাঁ’-‘না’র পক্ষে প্রচার চালাচ্ছিল, কিন্তু তারা তাতে প্রতীকটা (শাপলা কলি) তো ব্যবহার করতে পারে না (কারণ তখনও ভোটের প্রচারের আনুষ্ঠানিক সময় শুরু হয়নি)। প্রতীকটা তাদের দলীয় প্রতীক এবং এই প্রতীক নিয়ে তারা সংসদ সদস্য নির্বাচনে রাজনৈতিক দল হিসাবে মাঠে কাজ করবে।”

নাহিদ ও পাটোয়ারীকে ইসির শোকজের পর এনসিপির মুখপাত্র ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া “আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগে সবার আগে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে শোকজ করা উচিত ছিল” বলে মন্তব্য করেন।
জেসমীন টুলী বলেন, কোন একজন প্রার্থী ‘অন্যায় করে পার পেয়ে গেছেন বলে অন্যরাও ছাড় পাবেন’-এমন ভাবার সুযোগ নেই।
দেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে এ ঘটনার সম্পৃক্ততা তুলে ধরে এ নির্বাচন বিশেষজ্ঞ বলেন, “আমি যে অপরাধ করেছি সে বিচারটা থেকে যেমন আমি মওকুফ পেতে বা অব্যাহতি পেতে পারি না; তেমনি আরেকজন অন্যায় করছে বলে আমিতো বিচার থেকে অব্যাহতি পেতে পারি না।”
তিনি বলেন, এনসিপির ক্ষেত্রে যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, অন্যদের ক্ষেত্রে একই ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি রাজনৈতিক দল হিসাবে তারা কমিশনের কাছে জানাতে পারে।
“একজন জনগণ হিসেবে, দেশের নাগরিক হিসেবে এটাও তো চাওয়া থাকতে পারে, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন।”

প্রচার শুরুর আগেই প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি
নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরুর আগে গত মঙ্গলবার কড়াইল বস্তিতে গিয়ে বস্তিবাসীদের ফ্ল্যাট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
এদিকে জামায়াতে ইসলামীয় আমির ডা. শফিকুর রহমান একই দিনে প্রতিশ্রুতি দেন, তার দল ক্ষমতায় গেলে কয়েকটি বড় সরকারি কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করবেন।
নির্বাচন কমিশনের সাবেক কর্মকর্তা জেসমিন টুলী বলেন, প্রচার শুরুর আগে কোনো প্রার্থী সরাসরি ভোটের বিনিময়ে কোনো ভোটারকে কোনো কিছু দেওয়ার বা তার জন্য কিছু করার প্রতিশ্রুতি দিলে তা আচরণ বিধি লঙ্ঘন হিসাবে গণ্য হতে পারে।
জেসমিন টুলী বলেন, “তাদের তো দলীয় ইশতেহার ঘোষণা করতে হবে। দলীয় ইশতেহারের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর কিছু প্রতিশ্রুতি থাকতে পারে, যে ক্ষমতায় গেলে আমরা এই করব, আমার দল ক্ষমতায় গেলে সেই করব। এটা তাদের দলীয় ইশতেহার হওয়া কথা।
“আর যদি তারা এলাকার ভোটারদের কাছে যেয়ে এই প্রতিশ্রুতি দেয় ভোট চাওয়ার বিনিময়ে যে... আমাকে ভোট দিলে আমি এই এলাকায় এটা করব, তাহলে এটা আচরণবিধিমালা ভঙ্গ হবে।”

তিনি বলেন, বর্তমান আইনে ‘নির্বাচন পূর্ব সময়ের’ সংজ্ঞায় হিসাবে বলা আছে, তফসিল ঘোষণা থেকে নির্বাচনের ফল প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত সময়।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর থেকে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা পর্যন্ত ‘নির্বাচন পূর্ব সময়’ এবং তফসিল ঘোষণার পর থেকে থেকে ভোট গ্রহণের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ‘নির্বাচনকালীন সময়’ হিসাবে বিবেচনার সুপারিশ করলেও নির্বাচন কমিশন তা গ্রহণ করেনি বলে জানান সংস্কার কমিশনের এ সদস্য।
দাবির মুখে দল নিবন্ধন ‘দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ’
তফসিল ঘোষণা ও মনোনয়নপত্র জমার আগে ‘দাবির মুখে’ রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন দেওয়ার বিষয়ে ইসির ভূমিক নিয়েও কথা বলেছেন জেসমিন টুলী।
এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “আসলে কেউ অনশন করল বা কেউ দাবি করল তার প্রেক্ষিতে কোনো ব্যবস্থা নিলে সেখানে দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ হয়। আইনে বলে দেওয়া আছে যে, কোন কোন শর্ত পূরণ করলে কোনো রাজনৈতিক দল নিবন্ধন পাবে।
“সেই ক্ষেত্রে অনশন করার জন্য যদি কোনো দলকে নিবন্ধন দিয়ে থাকে তাহলে আমি বলব এটা এটা হলো দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। কারণ আইন ইলেকশন কমিশন শুধুমাত্র জবাবদিহিতা আইন এবং সংবিধানের কাছে। তা আইনের বাইরে কেউ আসলে যেতে পারে না।”

আইন না মানার ‘রাজনৈতিক সংস্কৃতি’
জেসমিন টুলী বলছেন, আইন ও বিধিবিধান না মানার ক্ষেত্রে দলগুলোর এক ধরনের ‘রাজনৈতিক সংস্কৃতি’ আছে, যা বদলানো প্রয়োজন।
তৃণমূলের সুপারিশ নিয়ে প্রার্থী মনোনয়নের বিধান আরপিওতে থাকলেও তার প্রয়োগ দলগুলোতে দেখা যায়নি।
সে প্রসঙ্গ ধরে তিনি বলেন, “আইনকে না মানার যে প্রবণতা আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে, সেটা খুবই প্রকট হয়ে দেখা দিচ্ছে। ইলেকশন কমিশনও এটা জানতে চায়নি, যে আইনে তৃণমূলের সুপারিশে প্রার্থী মনোনয়নের একটা বিধান আছে আরপিওতে, এই সুপারিশটা তৃণমূল পর্যায় থেকে কোনো দল নিয়েছে কি না।
“কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দলই তৃণমূল পর্যায়ে সুপারিশের প্রেক্ষিতে মনোনয়ন দিয়েছে, এমনটা দেখা যায়নি। এটাকে আসলে আমি বলব, আমাদের যে আইন না মানার প্রবণতা, তারই বহিঃপ্রকাশ। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিই এই যে, আইনকে ঠিক তারা তাদের নিজেদের মতন করেই আসলে দেখতে পছন্দ করে বেশি।”

পোস্টাল ব্যালটের প্রশংসা
পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে প্রবাসী ভোটারদের ভোটাধিকার প্রয়োগের যে ব্যবস্থা নির্বচন কমিশন করেছে তা ‘প্রশংসার দাবিদার’ বলে মনে করছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞ জেসমিন টুলী।
তিনি বলেন, “এই যে প্রবাসে আমাদের বিপুল সংখ্যক জনগণের বাস, কারো মতে পৌনে দুই কোটি, কারও মতে এক কোটির বেশি। তারা প্রবাসে কাজ করে রেমিট্যান্স পাঠান, কিন্তু তারা কীভাবে ভোট দেবেন এ চিন্তাটা কোনো সময় করা হয়নি।”
অথচ ২০১৩ সালই যে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে প্রবাসীদের ভোট দেওয়ার সুযোগ আরপিওতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল, সে কথা মনে করিয়ে দেন ইসির সাবেক এই কর্মকর্তা।
পোস্টাল ব্যালটে ভোটের বিষয়ে কিছু মহলে আপত্তি আসছে। তবে জেসমিন টুলীর ভাষ্য, “ইসি এবার প্রথমবারের মতন যেহেতু এই কাজটা করছে, আমার মনে হচ্ছে যে কিছু ভুল ত্রুটি বা বিচ্যুতি থাকতেই পারে। হয়ত এর পরের বার দেখা যাবে এই জিনিসগুলো আর থাকবে না।”
সাত থেকে আট লাখ প্রবাসী ভোটার পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করলেও তাদের ভোটগুলো পৌঁছে পুরো প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ প্রক্রিয়ার সফলতা-ব্যর্থতা নিয়ে মন্তব্য করতে চান না জেসমিন টুলী।
তবে পোস্টাল ব্যালট কেমন হবে, সে বিষয়ে একটি বিধান করা হলে অভিযোগ-আপত্তি কম আসত বলে তিনি মনে করেন।

নির্বাচন সুষ্ঠু হতে প্রয়োজন ‘সরকারের সদিচ্ছা’
২০১০ সালের আলোচিত চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন জেসমিন টুলী।
সে অভিজ্ঞতা ও স্মৃতির আলোকে তিনি বলেন, “নির্বাচন সুষ্ঠু করার জন্য কতগুলো টুলস লাগে। প্রথমত যে শুধু নির্বাচন কমিশনই কিন্তু কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু করতে পারে না। অথবা একজন রিটার্নিং অফিসারও কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু করতে পারে না। নির্বাচন সুষ্ঠু হতে হলে সরকারের একটা বড় সদিচ্ছার ব্যাপার থাকে।
“ওই সময় (২০১০ সালে) ওটা দলীয় সরকারের অধীনে ছিল। সরকারের সদিচ্ছা এবং রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীদের বাধ্য করা আইনগুলো মেনে চলতে। যদি এই জিনিসগুলোকে করা যায়, আমার মনে হয় নির্বাচনটাকে সুষ্ঠু করা সম্ভব হয়। কিন্তু ইলেকশন কমিশনের একার পক্ষে সম্ভব না।”
বিগত দিনের সংসদ নির্বাচনগুলোর জন্য জুলাই অভ্যুত্থানে তরুণরা প্রাণ দিয়েছ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “প্রতিবারই নির্বাচন নিয়ে যদি আমাদের এরকম দেশে সমস্যা হতেই থাকে, তাহলে তো আমরা কোনোদিন আগাতে পারব না। আমার কথা হচ্ছে গণতন্ত্রের জন্য শুধুমাত্র জাতীয় সংসদ নির্বাচন নয় এরপরই যে ধাপগুলো আসবে যেমন স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও প্রতিটা ধাপ মেনে চলা উচিত।
“যদি গণতন্ত্র পথে বাংলাদেশ হাঁটতে চায়, প্রথম ধাপ হিসাবে নির্বাচনকে সুষ্ঠু করা খুবই জরুরি। জাতীয় সংসদ যেমন জরুরি এবং ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে একদম সিটি কর্পোরেশন প্রত্যেকটা স্থানীয় সরকার নির্বাচন জরুরি।”

ভালো নির্বাচন ছাড়া ‘বিকল্প নেই’
বাংলাদেশে একটি ‘ভালো’ নির্বাচন আয়োজনের পর যে একাধিক ‘খারাপ’ নির্বাচন আয়োজনের নজির রয়েছে, সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে জেসমিন টুলী বলেন, এভাবে দেশ এগোতে পারে না।
“আমাদের আসলে নির্বাচন ভালো করার ছাড়া কোনো বিকল্প নাই। এবারকার নির্বাচন আমাদের গ্রহণযোগ্যতা পেতে হবে। এবারও নির্বাচন নিয়ে যদি বড় প্রশ্ন দেখা দেয়, তাহলে ভবিষ্যতে কেয়ারটেকার সরকার হলে যে নির্বাচন ভালো হয়–সে ধারণাতেও মানুষ আস্থা রাখতে পারবে না।”
ভালো নির্বাচন আয়োজনে সরকারের প্রতিশ্রুতির রক্ষায় ভোটের আগে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো রাখার তাগিদ দিয়েছেন এই নির্বাচন বিশেষজ্ঞ।
তিনি বলেন, “ভালো নির্বাচন করবে সরকারের এটা কমিটমেন্ট। সেরা হবে কি না জানি না। কিন্তু নির্বাচন ভালো করার জন্য যা যা করা দরকার, তার প্রথম হল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সঠিক রাখা। সেই মাত্রায় কিন্তু এখনো আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সঠিক হয়নি।”
এমন পরিস্থিতিতে ভোটাধিকার প্রয়োগে ভোটাররা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে পারেন, সে কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “‘মব’ সংস্কৃতিও কিন্তু মানুষকে অনেক সময় সত্যি কথা বলা থেকে দূরে বিরত রাখছে। ঠিক কাজটা করা থেকে বিরত রাখছে।
“নির্বাচনের সময় কিন্তু অনেকগুলো বিশৃঙ্খলা থাকে। ব্যক্তিগত রেষারেষিও নির্বাচনের সময় দেখা যায়, যা অনেকে উসুল করার চেষ্টা করে। এই একটা জায়গায় রাজনৈতিক দলের সবচেয়ে বড় ভূমিকা থাকবে।… নিজেদের মধ্যে হানাহানি বা ভোটকেন্দ্র দখল বা কোনো ভোটারকে বাধা দেওয়া বা কোনো প্রার্থীকে বাধাগ্রস্ত করা বা তার প্রচারণায় বিঘ্ন সৃষ্টি করা–এ ধরনের ডিজাস্টার এড়িয়ে চলতে হবে।”

নির্বাচন কমিশনের অধীনে ভোটের সময় ১৬ থেকে ১৭ লাখ সরকারি কর্মচারী কাজ করেন, তাদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন জেসমিন টুলী।
সোশ্যাল মিডিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে অপতথ্য ও ভুল তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার আশঙ্কার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “শুধু আমাদের দেশে না, এটা পুরো পৃথিবীরই একটা বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। টেকনোলজিটার যেমন ভালো দিক আছে, কিন্তু মন্দ দিকটাই মানুষ সহজেই লুফে নেয়। আমাদের এবারের নির্বাচনও কিছুটা কিন্তু এই সমস্যায় পড়বে।”
কিন্তু এ ধরনের অপপ্রচার ও মিথ্যা প্রচারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্বাচন কমিশনের যে নিজস্ব কারিগরি সক্ষমতা নেই, সে কথাও স্বীকার করেন এই সাবেক কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, “ইলেকশন কমিশন, প্রার্থীরা ও জনগণ একটাই কাজ করতে পারেন যে, কোনো তথ্য বিশ্বাস করার আগে সেটা যাচাই করে দেখেন। আপনি ভালো করে যাচাই করে দেখেন, তারপর সেই তথ্যটা বিশ্বাস করেন। যা শুনবেন তাই বিশ্বাস না করে আপনি সেই তথ্যটাকে যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেন।”
এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য নির্বাচন কমিশনের প্রচার চালানো উচিত বলেও মনে করছেন জেসমিন টুলী।