Published : 13 Jul 2026, 11:01 PM
ভারি বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও বন্যা পরিস্থিতির মধ্যে পরীক্ষাকেন্দ্রে যেতে হওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন অনেক এইচএসসি পরীক্ষার্থী। কোথাও কোমর পানি পেরিয়ে, কোথাও নৌকা ও ভ্যানে চড়ে কেন্দ্রে পৌঁছাতে হয়েছে তাদের।
সোমবার কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রের প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থীকে কোমর পানি ভেঙে হলে গিয়ে ভেজা কাপড়ে তিন ঘণ্টা পরীক্ষা দিতে হয়েছে। অনেকে সময়মত পৌঁছাতে পারেননি।
এমন প্রেক্ষাপটে সারাদেশের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা স্থগিতের দাবি উঠেছে পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের তরফে। কিছু ছাত্র সংগঠনও পরীক্ষা পেছানোর দাবি তুলেছে।
ভারি বৃষ্টিতে সড়কে তৈরি হওয়া দুর্ভোগ ও বন্যায় পরীক্ষা না পেছানোয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হকের সমালোচনায় সরব হন অনেকে।
এমন পরিস্থিতিতে বৈঠকে বসেন শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা। বৈঠক শেষে রাতে শিক্ষা বোর্ডগুলোর মোর্চা আন্ত:শিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি বিজ্ঞপ্তিতে পরীক্ষা স্থগিত না করার কথাই বলেছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “কোনো অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে পরীক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বা পরীক্ষা গ্রহণ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।”

একই সঙ্গে বিরূপ আবহাওয়ায় পরীক্ষাকেন্দ্রে যাতায়াতের ক্ষেত্রে পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের পর্যাপ্ত সময় হাতে নিয়ে সতর্কতার সঙ্গে রওনা হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সমন্বয় কমিটি।
পরীক্ষা না পেছানোর বিষয়ে কমিটি বলেছে, “১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন শিক্ষার্থীর পরীক্ষার প্রস্তুতি উপলব্ধি করে এবং পরীক্ষা বারবার স্থগিত করা হলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন, ফলাফল প্রকাশ, বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি কার্যক্রম এবং সামগ্রিক শিক্ষা ক্যালেন্ডার ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। একই সঙ্গে অভিন্ন প্রশ্নপত্র ব্যবস্থায় একটি বোর্ডের কারণে সকল বোর্ডের পরীক্ষা স্থগিত রাখাও বাস্তবসম্মত নয়।”
এর আগে বন্যা বাড়তে থাকলে চট্টগ্রাম বিভাগের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা আগামী ১৬ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত করা হয়।
সোমবার ছিল এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ষষ্ঠ দিন। পরীক্ষা ছিল পদার্থবিজ্ঞান, হিসাবিজ্ঞান, ও যুক্তিবিদ্যা প্রথম পত্র বিষয়ে।
সকালে পরীক্ষা শুরুর আগে থেকে বৃষ্টিতে দেশের কয়েকটি অঞ্চলের পরিস্থিতি ছিল অনেক বেশি দুর্বিষহ। কুমিল্লার একটি কেন্দ্রে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। রাজধানী ঢাকা, নরসিংদী, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতায় সড়কে পানি জমে যাওয়ায় বহু পরীক্ষার্থীর বিপাকে পড়ার খবর আসে।
পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্রে নিতে নৌকা-ভ্যান
কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রের প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থীকে কোমর পানি ভেঙে হলে গিয়ে ভেজা কাপড়ে তিন ঘণ্টা পরীক্ষা দিতে হয়েছে। অনেকে সময়মত পৌঁছাতে পারেননি।
কেন্দ্রের আশপাশে পানি জমে যাওয়ায় এ কেন্দ্রের পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্রে পৌঁছাতে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে দুটি নৌকা ও দুটি ভ্যানের ব্যবস্থা করা হয়।
পরীক্ষা শেষে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের পরীক্ষার্থী মাহিন আহমেদ বলেন, বাসা থেকে রিকশা নিয়ে এসে ঠিক কেন্দ্রের সামনে কোমর সমান পানিতে ভিজে গেছি। এই নিয়ে টানা তিন ঘণ্টা পরীক্ষা দিতে হয়েছে। জ্বর উঠে গেছে। অনেকেরই একই অবস্থা।”
একই কলেজের শিক্ষার্থী সামন্তর রহমান বলেন, “মেয়ে পরীক্ষার্থী যারা বোরকা পরে এসেছে, তাদের অবস্থা আরও বেশি খারাপ। সারাক্ষণ ভেজা জামা-কাপড় পরে থাকায় অনেকেরই শরীর খারাপ করেছে। এভাবে পরীক্ষা দিতে এসে মানসিক অবস্থা ঠিক থাকে না।”
সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত পরীক্ষাকেন্দ্রের সামনে শত শত অভিভাবককে দেখা গেছে, পানিতে দাঁড়িয়ে সন্তানদের জন্য অপেক্ষা করতে।
পরে পরীক্ষার্থীদের ভোগান্তির কথা বিবেচনা করে পরবর্তী পরীক্ষার জন্য এ কেন্দ্র নগরীর অজিত গুহ মহাবিদ্যালয় কেন্দ্রে স্থানান্তরিত করার কথা জানিয়েছেন কুমিল্লা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম।
এ কেন্দ্রের পরীক্ষার্থীদের বাড়তি ৩০ মিনিট সময় দেওয়া হয়েছে বলে জানান উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কাজী আপন তীবরানি।
শুধু কুমিল্লার এ কেন্দ্র নয় ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সড়কে পানি জমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন পরীক্ষার্থীরাও। অনেকে পানি মাড়িয়ে পরীক্ষা দিতে কেন্দ্রে পৌঁছেছেন।
উত্তরার একটি কলেজের পরীক্ষার্থী সোহা খাতুন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, “টানা বৃষ্টি, রাস্তায় জলাবদ্ধতা এবং বাসায় বিদ্যুৎ না থাকায় পড়াশোনা করা সম্ভব হচ্ছে না। এমন অবস্থায় পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষায় বসতে হয়েছে। বৈরী আবহাওয়ার বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবেচনায় নেওয়া উচিত।”
পরীক্ষা পেছানোর দাবি ছাত্র সংগঠনগুলোর
ভারি বৃষ্টি ও বন্যায় ভোগান্তি তৈরি হওয়ায় পরীক্ষা পেছানোর দাবি জানিয়েছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, ছাত্র ফেডারেশন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টসহ বেশ কয়েকটি সংগঠন।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে চলমান এইচএসসি ও সমমানের বোর্ড পরীক্ষা এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরীক্ষা সাময়িকভাবে স্থগিত করার দাবি জানিয়েছে ছাত্রদল।
পরীক্ষা স্থগিতের দাবি জানিয়ে বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে মানববন্ধন করেন ছাত্র ফেডারেশনের নেতারা।
বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশে একই দাবি জানায়।
কোমর পানি ঠেলে ভেজা কাপড়ে পরীক্ষা, কুমিল্লার সেই কেন্দ্র পরিবর্তন
৩ ঘণ্টার বৃষ্টিতে জলমগ্ন কুমিল্লা নগরী, নৌকায় চড়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে