Published : 12 Dec 2025, 12:32 AM
অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পাল্টে যাওয়া বাংলাদেশে সংস্কারের মাধ্যমে আগের চেয়ে বেশি ক্ষমতা পাওয়া নির্বাচন কমিশন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আচরণবিধিতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।
তফসিল ঘোষণার পর থেকে সম্ভাব্য প্রার্থী ও দলকে এই আচরণবিধি প্রতিপালন করতে হবে।
আচরণবিধি লঙ্ঘনে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড ও দেড় লাখ জরিমানা এবং দলের জন্য দেড় লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে তদন্ত সাপেক্ষে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতাও রয়েছে ইসির।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তফসিল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন।
নির্বাচনে অংশগ্রহণে ইচ্ছুক প্রার্থী এবং দলসমূহের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “আসুন আমরা আচরণবিধি মেনে একটি শান্তিপূর্ণ ও উৎসব মুখর নিরবাচন নিশ্চিত করি। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা নিশ্চিত করে, ভোটারদের বিশ্বাস ও আস্থা অর্জনই হোক আপনাদের লক্ষ্য নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী।”
এছাড়া সিইসি বলেছেন, বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়ানো হয়ে থাকে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে অসত্য তথ্য ও অপতথ্যের বিস্তার দিনকে দিন বেড়ে চলেছে। প্রতিপক্ষ দল ও প্রার্থীকে হেয় করার পাশাপাশি নারীদের প্রতি বিদ্বেষমূলক প্রচারণা আমাদের ঐতিহ্যকে ক্ষুন্ন করে এবং নির্বাচনকে কলুষিত করে।
“দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আপনাদের প্রতি আমার বিশেষ অনুরোধ অসত্য এবং অসৎ উদ্দেশ্যে প্রচারিত কোনো তথ্যে কান দিবেন না, গ্রহণ করবেন না। মনে রাখবেন অসত্য তথ্য শেয়ার করাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।”
তার আগেও ১৩ নভেম্বর সিইসি সময়ের আগে লাগানো পোস্টার সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে সতর্ক করে বলেছেন, আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে ‘কোনো ছাড় দেওয়া হবে না’।
এবার ভোটের প্রচারে পোস্টার ব্যবহার, ড্রোন ওড়ানো ও বিদেশে প্রচারে নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে ২০টির বেশি বিলবোর্ডে মানা রয়েছে। সব প্রার্থীকে একমঞ্চে ইশতেহার ঘোষণার সুযোগ রাখা হয়েছে আচরণবিধিতে।
১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদের নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হবে। একই দিন একসঙ্গে গণভোটও হবে।
ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে ১২ থেকে ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত, তা বাছাই হবে ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২০ জানুয়ারি। তার তিন সপ্তাহ পর হবে ভোটগ্রহণ।
প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দ হবে। সেক্ষেত্রে মনোনয়নপত্র জমার জন্য ১৮ দিন সময় দেওয়া হয়েছে এবং প্রচারের জন্য ২০ দিন সময় রয়েছে।
তফসিল ঘোণার পর থেকে আচরণবিধি মানতে সব দল ও প্রার্থীসহ সবার সহযোগিতা চান সিইসি।
ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে গত বছরের ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে।
দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগ নিয়ে জুলাই সনদ প্রণয়ন করে, যা বাস্তবায়ন করা হবে কি না সে ব্যাপারে গণভোটে জনগণের রায় নেওয়া হবে। জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে একইদিনে এই গণভোট হচ্ছে।

ত্রয়োদশ নির্বাচনকে রেখে বেশ কিছু সংস্কার এনে ‘রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০২৫’ করেছে নাসির উদ্দিন কমিশন।
এছাড়া আরপিওতে পরিবর্তন আনা হয়, তাতে অনিয়মের কারণে পুরো আসনের ভোট বাতিলের বিধান, এআইয়ের অপব্যবহারকে নির্বাচনি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা এবং হলফনামায় অসত্য তথ্য (ভোটে অযোগ্য এমন) দিলে নির্বাচিত হওয়ার পরও নির্বাচন কমিশন ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান যুক্ত হয়েছে।
এছাড়া দল আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ দেড় লাখ অর্থদণ্ডের বিধান যুক্ত করা হয়েছে আরপিওতে।
সংশোধিত আরপিও ধরেই দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
নতুন এ আচরণবিধিতে অসৎ উদ্দেশ্যে এআই ব্যবহারে মানাসহ কী করা যাবে এবং কী করা যাবে না তা রয়েছে।
আচরণবিধি মেনে চলার ব্যাপারে প্রার্থী ও দলের তরফে অঙ্গীকারনামা দিতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নির্বাচনি প্রচার
নতুন বিধিতে বলা হয়েছে, কোনো প্রার্থী বা তার নির্বাচনি এজেন্ট বা প্রার্থীর পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে নির্বাচনি প্রচার চালাতে পারবেন। তবে কিছু শর্ত যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে এতে। সেগুলো হল-
>> প্রার্থী বা তার নির্বাচনি এজেন্ট বা দলকে সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নাম, অ্যাকাউন্ট আইডি, ই-মেইল আইডিসহ অন্যান্য শনাক্তকরণ তথ্য যেভাবে বলা হয়েছে সেভাবে প্রচার শুরুর আগে রিটার্নিং অফিসারের কাছে দাখিল করতে হবে।
>> প্রচারসহ নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করা যাবে না।
>> ঘৃণাত্মক বক্তব্য, ভুল তথ্য, কারো চেহারা বিকৃত করা ও নির্বাচন সংক্রান্ত বানোয়াট তথ্যসহ সকল প্রকার ক্ষতিকর কনটেন্ট বানানো ও প্রচার করা যাবে না।
>> প্রতিপক্ষ, নারী, সংখ্যালঘু বা অন্য কোনো জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে ঘৃণাত্মক বক্তব্য, ব্যক্তিগত আক্রমণ বা উসকানিমূলক ভাষা ব্যবহার করা যাবে না।
>> নির্বাচনি স্বার্থ হাসিল করার জন্য ধর্মীয় বা জাতিগত অনুভূতির অপব্যবহার করা যাবে না।
>> সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নির্বাচন সংক্রান্ত সব কনটেন্ট শেয়ার ও প্রকাশ করার আগে সত্যতা যাচাই করতে হবে।
>> রাজনৈতিক দল, প্রার্থী বা প্রার্থীর পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি, ভোটারদের বিভ্রান্ত করার জন্য কিংবা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে কোনো প্রার্থী বা ব্যক্তির চরিত্র হনন কিংবা সুনাম নষ্ট করার উদ্দেশ্যে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা অন্য কোনো মাধ্যমে, সাধারণভাবে বা সম্পাদনা করে কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা কোনো মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর, পক্ষপাতমূলক, বিদ্বেষপূর্ণ, অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ এবং মানহানিকর কোনো আধেয় তৈরি, প্রকাশ, প্রচার ও শেয়ার করতে পারবেন না।
গুজব ও এআই এর অপব্যবহার বন্ধে নির্বাচনি অপরাধ বিবেচনায় শাস্তির বিধান রেখে আরপিওতে এবার নতুন ধারা যুক্ত করা হয়।
বিদেশে ভোটের প্রচারে মানা
>> কোনো দল বা প্রার্থী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিদেশে জনসভা, পথ সভা, সভা-সমাবেশ বা কোনো প্রচার করতে পারবে না।
>> ভোটের প্রচারে থাকছে না পোস্টারের ব্যবহার। একজন প্রার্থী তার সংসদীয় আসনে ২০টির বেশি বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবেন না; যার দৈর্ঘ্য হবে সর্বোচ্চ ১৬ ফুট আর প্রস্থ ৯ ফুট।
>> নির্বাচনের দিন ও প্রচারের সময় কোনো ধরনের ড্রোন, কোয়াডকপ্টার বা এ জাতীয় যন্ত্র ব্যবহার করা যাবে না।
>> প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বা তার পক্ষে অন্য কোনো প্রার্থী ও প্রতিষ্ঠান ভোটার স্লিপ বিতরণ করতে পারবে। তবে ভোটার স্লিপে প্রার্থীর নাম, ছবি, পদের নাম ও প্রতীক উল্লেখ করতে পারবে না।
>> বিলবোর্ডে শুধু যেগুলো ডিজিটাল বিলবোর্ড, সেগুলোতে আলোর ব্যবহার করা যাবে। বিদ্যুতের ব্যবহার করা যাবে। তাছাড়া আলোকসজ্জার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
>> ব্যানার, ফেস্টুন, লিফলেটে পলিথিনের আবরণ থাকতে পারবে না। ব্যবহার করা যাবে না প্লাস্টিক (পিভিসি) ব্যানার।
>> সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির তালিকায় অন্তবর্তীকালীন/তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদেরও যোগ করা হয়েছে। ফলে তারা প্রার্থীর হয়ে প্রচারে নামতে পারবেন না।
>> প্রচারে পরিবেশবান্ধব সামগ্রী ব্যবহারে জোর দেওয়া হয়েছে; প্রচার সামগ্রীতে পলিথিন, রেকসিনের ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
>> প্রচারের সময় শব্দের মাত্রা ৬০ ডেসিবেলে রাখতে হবে।
>> আচরণবিধির ‘গুরুতর’ অপরাধের ক্ষেত্রে আরপিওতে প্রার্থিতা বাতিলের বিধান রয়েছে। আগে আচরণবিধিতে আরপিও অনুচ্ছেদটি ছিল না, এবার যুক্ত করা হয়েছে। নির্বাচনি অপরাধে আরপিও ৯১ ধারা অনুযায়ী প্রার্থিতা বাতিল করে থাকে ইসি। এ বিষয়টি আচরণ বিধিমালায় স্পষ্ট করা হয়েছে।
>> গণমাধ্যমে সংলাপ ও সব প্রার্থীর এক মঞ্চে ইশতেহার ঘোষণার সুযোগ রাখা হয়েছে। রিটার্নিং কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট আসনে সব প্রার্থীকে নিয়ে একদিনে তাদের ইশতেহার বা ঘোষণাপত্রগুলো পাঠ করার ব্যবস্থা করবেন।