Published : 05 Sep 2025, 11:11 PM
প্রবাসীসহ ভোটের সময় যাদের নিজ এলাকার বাইরে থাকতে হয়, তাদের জন্য ‘তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা সূচক পোস্টাল ভোটিং ব্যবস্থা’ নিয়ে একগুচ্ছ কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে ইসি।
বিদ্যমান পোস্টাল ব্যালট ভোটিং ‘অকার্যকর’ হওয়ায় ব্যালট আবেদন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন এনে নতুন ব্যবস্থা সাজানো হচ্ছে। প্রচলিত পদ্ধতিতে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারের কাছে কাগুজে আবেদন করতে হলেও নতুন পদ্ধতিতে অনলাইনে নিবন্ধনের মাধ্যমে সেই প্রক্রিয়া সেরে ফেলার কথা ভাবা হচ্ছে। এর বাইরে ভোটদান প্রক্রিয়া আগের মতই থাকছে।
এ নতুন ব্যবস্থার জন্য গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) সংশোধনী এনে অনলাইন নিবন্ধন ও ভোটদান পদ্ধতি ঠিক করা হয়েছে।
আর তা বাস্তবায়নে ৪৯ কোটি ৪৩ লাখ ৫৬ হাজার টাকার পোস্টাল ব্যালটে প্রবাসীদের ভোটদান সিস্টেম উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন (ওসিভি-এসডিআই) প্রকল্প হাতে নিয়েছে ইসি। এখন বিপুল সংখ্যক প্রবাসীর পোস্টাল ব্যালট আনা-নেওয়া, মুদ্রণসহ প্রাসঙ্গিক ব্যয় ঠিক করা হচ্ছে।
প্রবাসীদের পোস্টাল ভোটিং সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্য ও পরামর্শক সালিম আহমাদ খান বলেন, “আউট অব কান্ট্রি ভোটিং-ওসিভি নিয়ে কাজ চলছে; মডিউল নিয়ে প্রচারণায় যাবে। প্রায় ১০ লাখ ভোটারের টার্গেট রয়েছে, চ্যালেঞ্জের বিষয়ও রয়েছে। ইতোমধ্যে প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে, প্রযুক্তিগত বিষয়েগুলো চূড়ান্ত হলে ধাপে ধাপে জানানো হবে।”
ইসি সচিবালয়ের নির্বাচন পরিচালনা শাখা এবং বাজেট ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ শাখার কর্মকর্তারা বলছেন, ইসি সচিবালয় খাতওয়ারি ব্যয় প্রাক্কলন করে দিলেই বরাদ্দের জন্য সরকারের কাছে তা পাঠানো হবে।
জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ মঙ্গলবার বলেন, “এখন পর্যন্ত প্রায় ৪৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। অনলাইন নিবন্ধনে অ্যাপ তৈরিসহ প্রাসঙ্গিক বিষয় রয়েছে এতে। 
“আর প্রবাসীদের ভোটিংয়ের ব্যালট আনা নেওয়া ও মুদ্রণসহ অন্যান্য বিষয় নিয়ে মাত্র আলোচনা শুরু হচ্ছে; সব মিলিয়ে কত ব্যয় হবে এমন ধারণা এখন দেওয়াও মুশকিল হবে।”
প্রবাসীদের (ওসিভি) পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে (আইসিপিভি) সরকারি কর্মকর্তা, নির্বাচনি দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি এবং জেলে বা আইনি হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের পোস্টাল ব্যালটে ভোটের বিধান রয়েছে।
রোজার আগে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে ভোটের লক্ষ্যে কাজ করছে ইসি। ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে তফসিল হতে পারে।
সেক্ষেত্রে ৫ জানুয়ারির মধ্যে কাজ গুছিয়ে এনে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত ওসিভি ও আইসিপিভি’র জন্য প্রচারণা, উদ্বুদ্ধকরণ ও ভোটার শিক্ষা কার্যক্রম সূচি রাখা হয়েছে।
ব্যয় হতে পারে ৪০০ কোটি টাকা
প্রবাসী ভোটারদের ব্যালট আনা-নেওয়ায় ডাক বিভাগ শেষ পর্যন্ত কত খরচের প্রস্তাব রাখছে, সেদিকেও তাকিয়ে রয়েছে ইসি। আর কতজন ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করছে, তার ভিত্তিতে ব্যয় ঠিক করা হবে।
৮-১০ লাখ প্রবাসীর সাড়া পাওয়া যাবে- এমন ধারণা দিয়ে অন্তত ৪০০ কোটি টাকার মতো ব্যয় হতে পারে বলে ধারণা করছেন ইসি কর্মকর্তারা।

জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “ডাক বিভাগ থেকে ফাইনাল চাহিদা ও আমাদের কারিগরি কমিটির আলোচনার পর একটা ব্যয় সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। এখনও অনেক সময় রয়েছে।
“প্রাথমিক যে ধারণা দেওয়া হয়েছিল, তার চেয়ে কম হতে পারে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় যেহেতু হবে, কেমন ভোটার নিবন্ধন করে তা দেখতে হবে। দেখা যাক।”
গেল জুন মাসে ডাক বিভাগ বলেছিল, ইএমএস/রেজিস্টার্ড সার্ভিসে একজন ভোটারের ব্যালট পেপার প্রবাসে পাঠানো এবং ফেরত আনতে ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা ব্যয় হতে পারে।
পরে ৭ অগাস্ট নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেছিলেন, “শুধু একটা পোস্টাল ব্যালট আনা-নেওয়া করতে গড়ে লাগবে আনুমানিক ৫০০ টাকা। এর বাইরেও ১০০ থেকে ২০০ টাকা খরচ হবে।
“প্রতি এক লাখ ভোটারের জন্য ছয় থেকে সাত কোটি টাকা লাগবে। আমরা একটা প্রাক্কলিত বাজেট সরকারের কাছে চাইব।”
নতুন পোস্টাল ভোটিং ব্যবস্থার যতো কাজ
ইসির কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের মধ্যে পোস্টাল ব্যালট সংক্রান্ত প্রকল্প অনুমোদন এবং সফটওয়্যার পরিকল্পনা ও ইসির অনুমোদন সম্পন্নের ভাবনা রয়েছে।
ওসিভি-আউট অব কান্ট্রি ভোটিং: মোবাইল অ্যাপের লোগো, খামের নকশা ও মুদ্রণের সংখ্যা, আইন, আরপিও সংস্কার। ভোটদান নিশ্চিতে সশস্ত্রবাহিনী বিভাগ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে।
আইসিপিভি-ইনকান্ট্রি পোস্টাল ভোটিং: ডিজিটাল নির্বাচনি প্রতীক, আইসিপিভি বিষয়ে প্রশিক্ষণ, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের ডেটাবেজে নিবন্ধন, ভোটার তালিকা প্রস্তুতি, খামের কাস্টমাইজেশন, ব্যালট পেপার সংযুক্তি, কারাবান্দিদের বিষয়ে কারা বিভাগের কাছে হস্তান্তর এবং সবশেষে ভোট দেওয়া ও ফেরত আনার বিষয়গুলো থাকবে। নির্বাচনের এক মাস আগে থেকে শুরু করে ভোটের এক সপ্তাহ আগে এসব প্রক্রিয়া শেষ করা হবে।
>> ৩০ সেপ্টেম্বর মধ্যে মোবাইল অ্যাপ তৈরি ও পরীক্ষামূলক (ওসিভি ও আইসিপিভি নিবন্ধন ও ট্রাকিং মডিউল) প্রতীক ও প্রার্থীদের সংযুক্ত করে চালাতে হবে।
>> ১ অক্টোবর থেকে ৩১ অক্টোবরের পর্যন্ত মোবাইল অ্যাপের ট্রায়াল, নিরীক্ষা, ত্রুটি সংশোধন ও ডেভেলপমেন্টের জন্য প্রস্তুত রাখতে হবে।
>> চলতি মাস থেকে ওসিভি ও আইসিপিভির জন্য প্রচারণা, উদ্বুদ্ধকরণ ও ভোটার শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করবে ইসি, যা চলবে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত।
>> ১ অক্টোবর থেকে ১০ নভেম্বরে মধ্যে ব্যালট পেপার, নির্দেশিকা ও ঘোষণাপত্র মুদ্রণ করা হবে।
>> ওসিভি ও আইসিপিভির জন্য তালিকাভুক্তি নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হবে ১১ নভেম্বর, যা চলবে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত।
>> ডাকবিভাগ খামের কাস্টমাইজেশন করবে ১৫ নভেম্বর থেকে ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত।
>> ভোটারদের কাছে ব্যালট পেপার পাঠানো হবে ২০ নভেম্বর থেকে ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত।
>> ভোটার তালিকা মুদ্রণ হবে ১ ডিসেম্বর থেকে ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
>> প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ হলে ভোট দিতে পারবেন ওসিভি ও আইসিপিভির আওতাধীন ভোটাররা।
>> ভোট প্রদান ও ব্যালট পেপার বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে হবে নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে।
>> এরপর কমিশন প্রতিটি ব্যালট পেপার সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পাঠাবে- ফলাফল একীভূত হওয়ার আগে।
ভোট যেভাবে
নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানান, সরকারের কাছে পাঠানো সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) পোস্টাল ব্যালট ভোটিং যুক্ত করা হয়েছে। পোস্টাল ব্যালটে চার ধরনের ভোটার যারা আগেও ছিল- তারাই থাকবেন।
তিনি বলেন, “প্রবাসী বাংলাদেশিরা ভোট দিতে পারবেন। সরকারি কাজে কর্মরত যারা, ভোটের দিন তার সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি কনস্টিটিয়েন্সিতে থাকতে পারবেন না, তারা ভোট দিতে পারবেন। নির্বাচন কাজের সাথে যারা সম্পৃক্ত আছেন, তারা ভোট দিতে পারবেন এবং যারা যেকোনো নিরাপত্তা হেফাজতে আছেন, জেলে হোক বা অন্য কোথাও হোক- তারা ভোট দিতে পারবেন।
“আগের সমস্যা যেটা দেখেছিলাম, ভোটটা দিতে পারতেন না তারা- সময়ের অভাবে। আমরা একটা নতুন মোডালিটি এডপ্ট করেছি। তারা ভোট দিতে পারবেন এবং তাদের ব্যালটটা হবে সিম্বল ব্যালট। যেখানে নামগুলো থাকবে না। এই সিম্বল যাতে করে আগে থেকে ব্যালট- ভোটারের কাছে চলে যায় এবং তিনি অপেক্ষা করবেন ওইদিন পর্যন্ত যেদিন প্রার্থীদের তালিকা চূড়ান্ত করা হবে।”
ইসি সানাউল্লাহ বলেন, “চূড়ান্তভাবে যখন প্রতীক বরাদ্দ করা হবে এবং এ সংক্রান্ত ইন্স্ট্রাকশনে লেখা থাকবে। যারা অ্যাপের মাধ্যমে রেজিস্ট্রার করেছেন অথবা নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট থেকে দেখতে পাবেন যে তার সংসদীয় আসনে কারা কারা চূড়ান্ত প্রার্থী এবং কার প্রতীক কোনটা।
“তারপরে তিনি ব্যালটে ভোট দেবেন এবং ভোট দিয়ে সেটা ফেরত পাঠাবেন।”
রোডম্যাপ ঘোষণা: সংলাপ ও পোস্টাল ভোট নিয়ে যত পরিকল্পনা ইসির
প্রবাসী ভোট: কীভাবে পোস্টাল ব্যালট সামলাবে ইসি, চ্যালেঞ্জ কোথায়?