Published : 17 Aug 2025, 08:19 AM
দেশের ভেতরে তিন শ্রেণির ভোটারের পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ব্যবহার করা হবে পোস্টাল ব্যালট।
এক্ষেত্রে অনলাইন নিবন্ধনের সুযোগ দেবে নির্বাচন কমিশন। আর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আসনভিত্তিক ব্যালট পেপার আনা-নেওয়ার কাজটি করা হবে নির্বাচন কর্মকর্তার মাধ্যমে।
ডাক বিভাগ পুরো কাজের তত্ত্বাবধানে থাকলেও নিয়ন্ত্রণ থাকবে ইসির এডহক কমিটির হাতে, যেখানে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা ও বিভাগের প্রতিনিধি থাকবেন।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এএমএম নাসির উদ্দিন নেতৃত্বাধীন ইসি এরই মধ্যে পোস্টাল ব্যালটের প্রাথমিক কর্মপদ্ধতি সেরে ফেলেছেন। আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে আগামী সেপ্টেম্বর থেকে প্রচারণায় নামতে চায় ইসি।
কোটির বেশি প্রবাসী থাকলেও এবার নিবন্ধন করতে পারবেন কেবল ভোটার হিসেবে তালিকাভুক্ত ব্যক্তিরাই। আর নিবন্ধনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে তফসিল ঘোষণার আগেই।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “পোস্টাল ব্যালটে প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হবে। এ পদ্ধতি কীভাবে কার্যকর করা যায়, এর একটা খসড়া আমরা করেছি। এ নিয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালালে প্রবাসীরা আগ্রহী হবেন এবং উল্লেখযোগ্য প্রবাসী ভোটার পাব বলে আশা করছি।”
এ বিষয়ে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য আব্দুল আলীম বলছেন, এত অল্প সময়ে অনলাইন প্লাটফর্ম তৈরি, প্রচারণা, পোস্টাল ব্যালট আনা-নেওয়াসহ গণনা, ফল পর্যন্ত কাজটি বেশ চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। তবে নিঃসন্দেহে এটি ভালো উদ্যোগ।”
তিনি বলেন, “কারিগরি দিকটি যেমন দেখতে হবে, তেমনি পাইলটিং করে চ্যালেঞ্জগুলোও চিহ্নিত করা দরকার। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে এগোলে আশা করি ইসি সফল হব।”
যেভাবে ব্যবহার হবে পোস্টাল ব্যালট
প্রবাসীদের ভোট কীভাবে নেওয়া হবে, সেই প্রশ্নে অনলাইন, প্রক্সি ভোট ও পোস্টাল ব্যালট— তিন পদ্ধতিই আলোচনায় ছিল। শেষমেশ পোস্টাল ব্যালট বেছে নেয় কমিশন।
নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানান, বৃহস্পতিবার নবম কমিশন সভায় দেশে ও দেশের বাইরে পোস্টাল ব্যালটের ব্যবহার নিয়ে আলোচনা হয়।
“প্রবাসে আমাদের বাংলাদেশি ভোটার যারা আছেন, এবার তাদের ভোটাধিকার আমরা নিশ্চিত করতে চাই এবং মাধ্যমটা হবে পোস্টাল ব্যালট।”

অতীতে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার বিধান থাকলেও সময়ের অভাবে ভোটগ্রহণ সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি।
সানাউল্লাহ বলেন, “এমন অবস্থায় আমরা যেসব পদ্ধতি অবলম্বন করতে যাচ্ছি- প্রবাসীদের কাছে শুধু ‘সিম্বল’ ব্যালট (প্রার্থীর নাম ছাড়া প্রতীকসহ ব্যালট পেপার) যাবে। সেখানে যতগুলো প্রতীক থাকা দরকার, সেগুলো থাকবে।
“প্রবাসীরা ভোট দেবেন প্রতীক বরাদ্দ হওয়ার পরে। সেভাবে তাদেরকে নির্দেশনা দেওয়া থাকবে এবং উনিও সেভাবে ডিক্লারেশন দেবেন। ভোট দেওয়ার পরে এটা ফেরত আসবে।”
এ কমিশনার জানান, প্রতি আসনে প্রবাসীদের পোস্টাল ব্যালট দেখভালের দায়িত্বে থাকবেন একজন সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা। আর প্রবাসীদের কাছে ডাক বিভাগের মাধ্যমে পোস্টাল ব্যালট পাঠানো হবে ইসি সচিবালয় থেকে। সেই ব্যালট ফেরত আসার পর ইসি সচিবালয় থেকে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট আসনে নিয়ে যাবেন।
তফসিলের তিন সপ্তাহ আগে প্রবাসীদের নিবন্ধন
সানাউল্লাহ বলেন, “দেশের বাইরে থেকে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে নিবন্ধনের ব্যাপার আছে। এ নিবন্ধন প্রক্রিয়াটা আগে থেকেই শুরু করব; তফসিল ঘোষণার আগ থেকেই।”
“আমরা হিসাব করে দেখেছি, নিবন্ধনে সময় লাগবে। ফলে এটা আমরা আগে থেকে শুরু করব এবং এখানে আনুমানিক তিন সপ্তাহ সময় দেওয়া হবে।”
দেশেও তিন ধরনের ভোটার আছেন, যারা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে পারবেন। এর মধ্যে রয়েছে— সরকারি কর্মচারী, নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত ব্যক্তি এবং জেলখানার মতো আইনি হেফাজতে থাকা লোকজন।
নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল বলেন,“এদের নিবন্ধন পদ্ধতি চালু করব এবং একই ব্যালট পেপার তাদেরকেও সরবরাহ করা হবে। আশা করছি, এ পদ্ধতি অবলম্বন করার ফলে দেশের ভেতরে ও বাইরে একটা উল্লেখযোগ্য ভোট এবার আনতে পারব।”

কর্তৃত্ব থাকবে এডহক কমিটিতে
পোস্টাল ব্যালটে ভোট নেওয়ার পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার জন্য একটা এডহক কমিটি করা হবে।
এ কমিটির নেতৃত্বে থাকবেন ইসির অতিরিক্ত সচিব। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, দপ্তর কিংবা অধিদপ্তরের প্রতিনিধিরা এখানে থাকবেন।
এই এডহক কমিটি গঠনের পর থেকে ভোট সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত কাজ করবে।
আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলছেন, “সেপ্টেম্বর থেকে শুরু করে আমরা ধাপে ধাপে বিভিন্ন পর্যায়ে এবং বিভিন্ন পদ্ধতিতে প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার কাজটি করব।”
নির্বাচনের সময় কোনো কোনো আসনে দেখা যায়, একজন প্রার্থী শেষ সময়ে আদালতের আদেশে প্রার্থিতা ফিরে পান। তখন শেষ সময়ে গিয়ে ব্যালটে প্রতীক যোগ করতে হয়।
পোস্টাল ব্যালটের ক্ষেত্রে এ বিষয়টিকে বড় চ্যালেঞ্জ মনে করছে ইসি।
সানাউল্লাহ বলেন, “যেসব আসনে এ ধরনের অবস্থা তৈরি হবে, সেগুলোতে পোস্টাল ব্যালট নেওয়া যাবে না।
“এটা একটা বড় ধরনের সমস্যা ইসির সামনে। এটাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে, আইনিভাবে কোনোভাবে একটা কিছু করা যায় কিনা। যেমন, ন্যূনতম সময় আগেই আইনি প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করা যেতে পারে।”
লাগতে পারে ৫০ কোটি টাকা
প্রবাসীদের পোস্টাল ব্যালট আনা-নেওয়ায় প্রায় ৫০ কোটি টাকা লাগতে পারে, যেটা সরকারের কাছে চাইবে ইসি।
এ নির্বাচন কমিশনার বলেন, শুধু একটা পোস্টাল ব্যালট আনা-নেওয়া করতে গড়ে লাগবে আনুমানিক ৫০০ টাকা। এর বাইরেও ১০০ থেকে ২০০ টাকা খরচ হবে।
“প্রতি এক লাখ ভোটারের জন্য ছয় থেকে সাত কোটি টাকা লাগবে। আমরা একটা প্রাক্কলিত বাজেট সরকারের কাছে চাইব।”
প্রার্থীর নাম ছাড়া প্রতীকে ভোট
ডাক বিভাগ থেকে ইসিকে জানানো হয়েছে, পোস্টাল ব্যালট আনা- নেওয়া করতে ১৬ দিন থকে ২৮ দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
ইসি সানাউল্লাহ বলছেন, “ভোটের তিন বা চার সপ্তাহ আগে প্রতীক বরাদ্দ হয়। ততদিন পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করতে পারছি না।”
তিনি জানান, প্রবাসী ভোটাররা প্রার্থী দেখতে পাবেন অনলাইনে। তারপর তারা ব্যালটে থাকা পছন্দের প্রার্থীর প্রতীকে ভোট দেবেন।
স্বতন্ত্র প্রার্থীর বিষয়টিও ইসির বিবেচনায় রয়েছে। বর্তমানে ৫০ রাজনৈতিক দল আছে, যারা নিবন্ধিত। আরও কয়েকটি দল নিবন্ধন পেতে পারে।
ইসি সানাউল্লাহ বলেন, “আমরা হিসাব করে দেখেছি, প্রত্যেক আসনে যদি স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য ১০টা করেও প্রতীক রেখে দিই, তাতে সব প্রার্থীই চলে আসবে।”
প্রবাসীদের ভোটে ব্যয় হবে ৪৮ কোটি টাকা: ইসি
তফসিল ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে: ইসি
প্রবাসী ভোট: পোস্টাল ব্যালটেই ঝুঁকছে ইসি, নিবন্ধন অনলাইনে
প্রবাসীদের ভোট 'পোস্টাল ব্যালটে', সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত: ইসি সানাউল্লাহ