Published : 07 Aug 2025, 08:05 PM
আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে রোজার আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের জন্য ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে তফসিল ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন।
এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার চিঠি পাওয়ার পর নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বৃহস্পতিবার তফসিলের সম্ভাব্য সময় সাংবাদিকদের জানান।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে এদিন নবম কমিশন সভা হয়। বেলা ১১টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আইন সংস্কার নিয়ে আলোচনা চলে।
পরে নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন নির্বাচন কমিশনার সানাউল্লাহ।
তিনি বলেন, ফেব্রুয়ারিতে ভোট করতে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে পাঠানো চিঠি নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে পৌঁছেছে। তবে কমিশন সভায় সেই চিঠি নিয়ে আলোচনা হয়নি।
“তবে আমরা অতি শিগগির আলোচনা করব। আর মাননীয় প্রধান নির্বাচন কমিশনার আপনাদেরকে যেটা বলেছেন, আমাদের পক্ষ থেকে ঘোষণাটা আসবে দুই মাস আগে।
“আপনারা ধরেই নিতে পারেন, এই শিডিউল ঘোষণার কাজটা আমাদের ডিসেম্বর মাসের প্রথমার্ধে (করব)।”
এ নির্বাচন কমিশনার বলেন, যেদিন নির্বাচন হবে, আনুমানিক তার ৬০ দিন আগে তফসিল ঘোষণা করা হবে।
"রোজার আগে নির্বাচন, রোজা যদি হয় ১৮ ফেব্রুয়ারি, তার আগে দুই চার দিন সময় দেবেন ফর নিউ গভার্নমেন্ট টু টেক ওভার, শপথ গ্রহণ ইত্যাদি। তার আগে নির্বাচন হবে। নির্বাচনের যে ডেটটা হবে, টেন্টেটিভলি তার থেকে ৬০ দিন আগে আপনারা হিসাব করবেন।”
বৃহস্পতিবারের কমিশন সভায় তিনটি বিষয় আলোচ্য ছিল। এর মধ্যে রাজনৈতিক দল ও আচরণ বিধিমালার খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে; আগামী সপ্তাহে তা চলবে বলে জানান এ নির্বাচন কমিশনার।
এছাড়া পোস্টাল ব্যালটের বিষয়ে প্রাথমিক কিছু সিদ্ধান্ত হয়েছে জানিয়ে সানাউল্লাহ বলেন, “প্রবাসীদের ভোটদানের জন্য পোস্টাল ব্যালট ও দেশের অভ্যন্তরে তিন ধরনের ভোটারের জন্য পোস্টাল ব্যালট ব্যবহারের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।”
৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ১৮ বছর হলে তালিকাভুক্ত হওয়া যাবে
বিদ্যমান ভোটার তালিকা সংশোধন হওয়ায় এবার নতুন ভোটারদের অক্টোবর পর্যন্ত ভোটার তালিকাভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বর্তমানে ১২ কোটি ৩৭ লাখের বেশি ভোটার রয়েছে তালিকায়; অতীতে বাদ পড়া আরও সাড়ে ৪৪ লাখের মত যুক্ত হবে এবং মৃতদের বাদ দেওয়া হবে। এটা চূড়ান্ত হবে ৩১ অগাস্ট।
ফেব্রুয়ারিতে ভোটের বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণার পর নতুনদের জন্য সুসংবাদ রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার সানাউল্লাহ বলেন, “২০২৫ সালের ৩১ অক্টোবরে পর্যন্ত যারা ১৮ বছর বা ভোটারযোগ্য হবেন তাদের ভোটার তালিকাভুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এসব নতুন ভোটার আগামী নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন।”
পোস্টাল ব্যালটের প্রচার সেপ্টেম্বরে, প্রবাসীদের ব্যালটে শুধু প্রতীক
দিনের আলোচনার কথা তুলে ধরে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, যে প্রস্তাব ধরে আলোচনা হচ্ছে, তাতে প্রবাসীরা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেবেন। তাদের ব্যালট পেপারে শুধু প্রতীক থাকবে। প্রার্থীর নাম থাকবে না।
কমিশন বৈঠকে পোস্টাল ব্যালটে ভোটের সার্বিক প্রক্রিয়া, নিবন্ধন প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পুরো বিষয়টি দেখভাল করবে ডাক বিভাগ।
ইসির অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে এ সংক্রান্ত অ্যাডহক কমিটিও করা হবে বলে জানান এ নির্বাচন কমিশনার।
তিনি বলেন, “প্রবাসীদের কাছে সিম্বল ব্যালট (প্রতীক সম্বলিত) যাবে৷ যাতে সময় কম লাগে। প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ার পরে সিম্বল ব্যালটে ভোট দেবেন। ইসিতে এসে পোস্ট অফিস ব্যালট নিয়ে যাবে। এক্ষেত্রে নিবন্ধন করে প্রার্থিতা চূড়ান্ত হওয়ার পর তারা অনলাইনে প্রার্থীর তালিকা দেখতে পারবেন। সে অনুযায়ী তারা পছন্দের প্রার্থী দেখে ব্যালটে থাকা সেই প্রার্থীর সিম্বলে ভোট দেবেন।”
প্রবাসী, কারাবন্দি বা আইনি হেফাজতে যারা এবং ভোটের কাজে নিয়োজিত সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য পোস্টাল ব্যালটের সুযোগ থাকলেও তা ব্যবহার হয়নি।
প্রবাসী ও সরকারি কর্মকর্তাদের বাইরে কারাবন্দিদের বিষয়ে ইসির উদ্যোগের বিষয়ে ইসি সানাউল্লঅহ বলেন, “আমাদের টিম জেল কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করেছে; তারা আমাদেরকে বলেছেন যে তাদের জেলখানা সম্ভবত ৭১টা। সবখানে এক্সেস দিবেন এবং তাদেরকে সেনসিটাইজ করবেন এবং তাদেরকে এই ভোট দেওয়ার জন্য সাহায্য করবেন।”
এবার সবার জন্য আগাম অনলাইন নিবন্ধনের ব্যবস্থা নিচ্ছে ইসি। পাশাপাশি সংবাদকর্মী, হাসপাতালের রোগী, সরকারি সেবা কাজে যারা নিয়োজিত থাকেন, তাদের ক্ষেত্রেও পোস্টাল ব্যালট ব্যবহার করা যায় কিনা, সে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
প্রবাসীদের পোস্টাল ব্যলট আনা-নেওয়াসহ সার্বিক প্রক্রিয়া শেষ করতে প্রায় অর্ধ কোটি বাজেট বরাদ্দ থাকছে।
এআই নিয়ে ভাবনা
ভোট সামনে রেখে আচরণবিধিতে এআই-এর অপব্যবহার রোধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে বলে জানান নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো সানাউল্লাহ।
তিনি বলেন, “এআই মিসইউজের ব্যাপারে আমরা কঠোরভাবে এখানে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছি। এখানে মূলত ব্যাপারটা হচ্ছে… প্রবলেমটা হচ্ছে মিসইনফরমেশন, ডিসইনফরমেশন, ম্যাল ইনফরমেশন। এগুলো প্রতিহত করার জন্য আমরা আচরণবিধিতে ইনক্লুড করেছি।”
তিনি বলেন, আচরণবিধি শুধুমাত্র প্রার্থী এবং দলের জন্য। কিন্তু এআই এর ব্যবহার বাইরের লোকজনও করতে পারে।
“শুধু তো রাজনৈতিক দল আর প্রার্থীরা করবে না। দেশ থেকে করবে, দেশের বাইরে থেকে করবে। এ বিষয় দেখার জন্য একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি করা হচ্ছে।”
এই কমিটি ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে জানিয়ে নির্বাচন কমিশনার বলেন, “আমাদের প্রাথমিক উদ্দেশ্য হচ্ছে, যতটুক সম্ভব ব্যান্ডউইথ না কমিয়ে, কোনো ধরনের সেবাকে বিঘ্নিত না করে আমরা যাতে নির্বাচনটা করতে পারি। একান্তই যদি বাধ্য না হয় নির্বাচন কমিশন, তাহলে আমাদের ইচ্ছা নাই কোনো সেবা বা কোনো প্ল্যাটফর্মকে লিমিট করার।”
ড্রোন কেন নিষেধ
নির্বাচন সামনে রেখে কোনো ধরনের ড্রোন ব্যবহার করা যাবে না বলে জানান এ নির্বাচন কমিশনার।
এক প্রশ্নের জবাবে আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, “ড্রোন এবং কোয়াডকপ্টার–এ ধরনের কোনো কিছু কোনো প্রার্থী বা তার এজেন্ট বা কোনো কেউ ব্যবহার করতে পারবেন না। নির্বাচন কমিশনের ব্যবহার করার কোন প্রয়োজনীয়তা যদি আসে তখন সামনে আমরা আলোচনা করব। গণমাধ্যমও পারবে না।”
নির্বাচনে সিসি ক্যামেরার ব্যবহারকেও যৌক্তিক মনে করছে না ইসি।
তিনি বলেন, “সেটা নিয়েও আমরা কাজ করছি। চাইলেই তো হবে না। এটা নিয়ে অলরেডি আমরা তিন চারটা মিটিং করেছি। এক দিনের জন্য আউটসোর্স করেও পাওয়া যায় না ভাড়াতে। আবার কেনাও যৌক্তিক নয়।
“৪৫ হাজার কেন্দ্র, হিসাব করে দেখেন কতগুলো সিসি ক্যামেরা লাগবে। এটা কিনে আপনি রাখবেন কীভাবে? এটা জাস্টিফাই করবেন কীভাবে? অনেকগুলো প্রস্তাব এসছে।”
প্রধান উপদেষ্টার সারাংশ সভায় উপস্থাপন
ভোট নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার চিঠির বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে নির্বাচন কমিশনার মো. সানাউল্লাহ বলেন, “মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা যে বক্তব্যটা দিয়েছেন, সেই বক্তব্যটার সারাংশ এখানে তুলে ধরা হয়েছে, যে ফেব্রুয়ারি মাসে রমজান শুরুর আগে নির্বাচন করার ব্যাপারে আমাদেরকে প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে এবং কাজ করতে বলা হয়েছে।”
নির্বাচন কমিশনের নবম সভায় চার নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ, তাহমিদা আহমদ, মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার, আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ ও ইসি সচিব আখতার আহমেদসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।