Published : 04 Jul 2026, 12:47 PM
শুক্রবার সকালে এয়ার অ্যাস্ট্রার একটি ফ্লাইটে পরিবার নিয়ে এক যাত্রী যাচ্ছিলেন চট্টগ্রামে বিয়ের অনুষ্ঠানে। বে থেকে ফ্লাইটটি যখন যাত্রী তুলে ট্যাক্সিওয়ে দিয়ে গড়িয়ে রানওয়ের দিকে যাচ্ছিল তখন ওই যাত্রীর মনে পড়ে—তিনি বাসায় শেরওয়ানি ফেলে এসেছেন।
এয়ারক্রাফটি থামানোর জন্য তিনি কেবিন ক্রুদের অনুরোধ করেন। কেবিন ক্রুদের সঙ্গে তার কিছু বাদানুবাদও হয়। তখন তিনি নিজেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পাইলট (ফাস্ট অফিসার) হিসেবে পরিচয় দেন। একপর্যায়ে এয়ার অ্যাস্ট্রা ফ্লাইটের পাইলটের ঘোষণা আসে, ওই যাত্রীকে নামাতে তারা আবার বে তে ফিরে যাচ্ছেন। রানওয়ের মুখে এসে এয়ারক্রাফটি ঘুরে আবার বে তে চলে যায়।
ওই ফ্লাইটের দুইজন যাত্রীর বর্ণনায় এরকম অভিযোগ উঠে এসেছে।
তবে এয়ার অ্যাস্ট্রা কর্তৃপক্ষ বলছে, মূলত এয়ারক্রাফটির এয়ারকন্ডিশনিং ইউনিট কাজ না করায় সেটিকে বে তে ফিরে আনা হয়। তবে সেই সময়ই ফ্লাইট থামানো নিয়ে ওই যাত্রীর সঙ্গে কেবিন ক্রুদের বাদানুবাদ হয়েছিল। পাইলটও ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, সেই যাত্রীকে নামাতে তারা বেতে ফিরে যাচ্ছেন।
এয়ার অ্যাস্ট্রার দাবি, পাইলট যাত্রীদের তখন যান্ত্রিক ত্রুটির বিষয়টি না জানিয়ে ‘অসম্পূর্ণ’ ঘোষণা দেন; যার কারণে এই ‘ভুল বোঝাবুঝি’ তৈরি হয়।
আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশনের (আইকাও) বিধি অনুযায়ী খুব জরুরি পরিস্থিতি ছাড়া যাত্রী উঠিয়ে ফ্লাইট ছেড়ে যাওয়ার পর তা থামানোর কোনো সুযোগ নেই।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সদস্য ও এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলছেন, “যাত্রীর অনুরোধে এভাবে ফ্লাইট থামানোর কোনো সুযোগই নেই সিভিল এভিয়েশনের কোনো আইনে। ইমারজেন্সি মেডিকেল কন্ডিশন, সিকিউরিটি থ্রেট, কোনো রকমের যান্ত্রিক ত্রুটি বা কন্ট্রোল টাওয়ারের নির্দেশে এরকম পরিস্থিতিতে ফ্লাইট থামতে পারে।”
এই ধরনের ঘটনা নিরাপত্তা ও পেশাগত নৈতিকতা—দুই ক্ষেত্রেই গুরুতর প্রশ্ন তোলার সুযোগ তৈরি করে বলে মনে করেন কাজী ওয়াহেদুল আলম। এ ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন তিনি।
যা বলছে এয়ার অ্যাস্ট্রা
যোগাযোগ করা হলে এয়ার অ্যাস্ট্রার সিইও ইমরান আসিফ বলছেন, “ওই যাত্রী যখন ফ্লাইট থামানোর কথা বলছিলেন, তখনই একটু যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে পাইলট ওই এয়ারক্রাফটটি না চালানোর সিদ্ধান্ত নেন। তবে বিষয়টা অনেকটা কাকতালীয়ভাবে মিলে গেছে।
“যান্ত্রিক ত্রুটির বিষয়টি বিবেচনা করে পরে ওই এয়ারক্রাফটি আর চালানো হয়নি। পরে ইউএস-বাংলার একটি উড়োজাহাজে ওই যাত্রীদের চট্টগ্রামে পাঠানো হয়।”
ইমরান আসিফ বলেন, শুক্রবার সকালের ওই ফ্লাইটটির যাত্রা শুরুর সময় এয়ারকন্ডিশনিং নিয়ে একটু সমস্যা হয়। ভেতরের গরম বেড়ে যাচ্ছিল। সেটার নিয়মিত চেকআপের পর তাপমাত্রা একটু সহনীয় হলে এয়ারক্রাফটি যাত্রী তুলে বে থেকে ট্যাক্সিওয়ের দিকে যাত্রা করে।
সেটি যখন রানওয়েতে লাইনআপ করছিল, তখন ওই যাত্রী ফ্লাইট থেকে নেমে যেতে চান। কেবিন ক্রুরা তাকে জানিয়ে দেন, কোনোরকম মেডিকেল ইমারজেন্সি ছাড়া এরকম সামান্য সম্ভব নয়।
ইমরান আসিফ বলেন, সেই সময়ই পাইলট ভেতরের তাপমাত্রা ‘ব্লাস্ট’ লেভেলে চলে যাওয়ার ইন্ডিকেশন পান। কিন্তু তিনি ইন-ফ্লাইট ঘোষণায় বলেন, ওই যাত্রীকে নামাতে বে তে ফিরে যাওয়া হচ্ছে।
এই ঘটনাকে ভুল বোঝাবুঝি বর্ণনা করে এর জন্য জন্য পাইলটের ঘোষণাকে দায়ী করছেন ইমরান আসিফ।
তিনি বলেন, “টাওয়ারের পারমিশন ছাড়া রানওয়ে লাইন আপের জন্য ক্লিয়ারেন্স পাওয়া একটা এয়ারক্রাফট কখনো বে তে ফিরতে পারে না। পাইলট টাওয়ারকে জানিয়েছেন, এয়ারকন্ডিশনিং ইউনিটের সমস্যার কারণে তারা বে তে ফিরছেন। এ রেকর্ড আমাদের কাছে রয়েছে। আবার যেহেতু এই এয়ারক্রাফটির চেকআপ প্রয়োজন ছিল।
“ভাই আমরা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স-কে মেইল করে বলি যে, তাদের এয়ারক্রাফ্ট দিয়ে আমাদের এই ফ্লাইটগুলো তারা চালাতে পারবে কি না। পরবর্তীতে এই ফ্লাইট চালাতে ইউএস-বাংলার এয়ারক্রাফ্ট ব্যবহার করা হয়। শুধু যাত্রীকে নামানোর বিষয় থাকলে তো আমরা ইউএস-বাংলা এয়ারক্রাফট ব্যবহার করতাম না।“
তবে ঘণ্টা তিনেক পর যখন ফ্লাইটটি ওড়ার জন্য প্রস্তুত হয়, তখন ওই যাত্রী আবার ফিরে আসেন।
এ বিষয়ে ইমরান আসিফ বলছেন, “ওই যাত্রীর বাসা মনে হয় এয়ারপোর্টের আশপাশেই। আমরা যখন ইউএস-বাংলার এয়ারক্রাফ্ট দিয়ে ফ্লাইটটি পরিচালনার প্রস্তুতি সম্পন্ন করি। সেই সময় ওই যাত্রী আবার তার বিয়ের জিনিসপত্র নিয়ে ফিরে আসেন।”
এই ঘটনায় ফ্লাইটের অন্য যাত্রীরা খুবই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা ও তার স্ত্রী ওই ফ্লাইটের যাত্রী ছিলেন।
নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে ওই কর্মকর্তা বলছেন, “এরকম ঘটনা শুধু বাংলাদেশই সম্ভব। ওই ফ্লাইটে আরো অনেক রকম পেশার যাত্রী ছিলেন। সবাইকে উপেক্ষা করে যখন পাইলট বে তে ফিরে যাওয়ার ঘোষণা দিল, তখন আমি আমার নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।”
এয়ার অ্যাস্ট্রার সিইও ইমরান আসিফ বলছেন, “পাইলটের ঘোষণাটি অসম্পূর্ণ ছিল। যার কারণে যাত্রীরা অনেক ক্ষুব্ধ হয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকেও আমাদের কাছে বিষয়টি জানতে চাওয়া হয়েছে।
“আমাদের কাছে নথি ও অন্যান্য প্রমাণক রয়েছে যে এয়ারক্রাফটিতে যান্ত্রিক ত্রুটি হয়েছিল। আমরা সেগুলো সরকারের কাছে উপস্থাপন করব।”