Published : 30 Jun 2025, 11:27 PM
রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধিতায় প্রবাসীদের জন্য প্রক্সি পদ্ধতি রেখে ‘তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা সূচক পোস্টাল ভোটিং ব্যবস্থার’ কথা ভাবছে নির্বাচন কমিশন।
প্রবাসীদের পাশাপাশি দেশেও যারা শারীরিকভাবে সরাসরি ভোটদানে অসমর্থ, তাদের জন্য এ পদ্ধতির ব্যবহারের ভাবনা রয়েছে।
বর্তমানে পোস্টাল ব্যালটে যে ভোটদানের সুযোগ রয়েছে, তার সঙ্গে প্রস্তাবিত পদ্ধতির পার্থক্য মূলত ব্যালট আবেদন প্রক্রিয়ায়। প্রচলিত পদ্ধতিতে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারের কাছে কাগুজে আবেদন করতে হলেও নতুন পদ্ধতিতে অনলাইনে নিবন্ধনের মাধ্যমে সেই প্রক্রিয়া সেরে ফেলার কথা ভাবা হচ্ছে। এর বাইরে ভোটদান প্রক্রিয়া আগের মতই থাকছে।
জাতীয় পরিচয়পত্র, ভোটার তালিকা এবং নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় তথ্যপ্রযুক্তির প্রয়োগ কমিটির সদস্য সচিব আব্দুল মমিন সরকার জানান, বর্তমানে প্রবাসী বাংলাদেশি ভোটার, নির্বাচনি দায়িত্বে নিয়োজিত ভোটার, সরকারি চাকরিজীবী- যিনি চাকরিসূত্রে নিজ এলাকার বাইরে বসবাস করেন এবং কারাবন্দিরা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে পারেন।
এজন্য তফসিল ঘোষণার পর ১৫ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারের কাছে আবেদন করতে হয়। আবেদন পাওয়ার পরপরই রিটার্নিং অফিসার সংশ্লিষ্ট ভোটারের কাছে একটি পোস্টাল ব্যালট পেপার ও একটি খাম পাঠিয়ে থাকেন। এখন ওই আবেদন অনলাইনে নিবন্ধনের মাধ্যমে সেরে ফেলার কথা ভাবা হচ্ছে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, প্রবাসীদের জন্য ইসি এখন আর প্রক্সি পদ্ধতি নিয়ে ভাবছে না। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা সূচক পোস্টাল ভোটিং ব্যবস্থাকে কীভাবে প্রচলিত পদ্ধতির চাইতে অধিক কার্যকর করা যায় তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
এর বাইরে অনলাইন পদ্ধতির পাইলটিংয়ের কথা ভাবা হচ্ছে বলে জানান মমিন সরকার।
দেশে মোট ভোটার যেখানে ১২ কোটি ৩৭ লাখ, সেখানে ভোটার হওয়ার যোগ্য প্রবাসীর সংখ্যা এক কোটির বেশি।
আর এই কোটি প্রবাসীকে ভোট দেওয়ার সুযোগ করে দিতে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের নির্দেশনা রয়েছে।

প্রবাসীদের ভোট নেওয়ার সম্ভাব্য তিন পদ্ধতির মধ্যে ‘প্রক্সি ভোটিং’ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ঝোঁক থাকলেও তাতে বেশ কিছু ‘ঝুঁকি’ বা ‘ত্রুটি’ থাকার কথা বলেছে রাজনৈতিক দলগুলো। এরপর নির্বাচন কমিশন ওই পদ্ধতি থেকে সরে এসেছে।
প্রক্সি ভোট হল, একজনের ভোট তার মনোনীত আরেকজন দেবেন। অর্থাৎ, প্রবাসী তার ভোটদানের ক্ষমতা আরেকজনের কাছে হস্তান্তর করবেন কোনো একটি নির্বাচনের জন্য।
প্রবাসীদের জন্য পদ্ধতি কোনটি?
প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিতে সরকারপ্রধানের নির্দেশনার পরপর নাসির উদ্দিন কমিশন প্রক্সি, অনলাইন ও পোস্টাল ব্যালট পদ্ধতি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট ও এমআইএসটির প্রতিবেদন ও কারিগরি বিশেষজ্ঞদের মতামত নেন।
এসব পদ্ধতি নিয়ে কমিশন রাজনৈতিক দল ও অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে। তারই ধারাবাহিকতায় এ সংক্রান্ত অ্যাডভাইজরি কমিটি গঠন করা হয়। ইতোমধ্যে ৫-৬টি দল প্রক্সির পক্ষে, আর তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা সূচক পোস্টাল ব্যালট ও অনলাইন ভোটিংয়ের পক্ষে ১২-১৪টি দল মতামত দিয়েছে।
দলগুলোর মতামত নিয়ে পদ্ধতি চূড়ান্ত করতে কারিগরি পরামর্শক কমিটির প্রস্তাব নিয়ে একজন নির্বাচন কমিশনারের সভাপতিত্ব ইসির তথ্যপ্রযুক্তি প্রয়োগ কমিটি কাজ করে যাচ্ছে।
নির্বাচনি প্রস্তুতির মধ্যে প্রবাসীদের ভোট পদ্ধতি দ্রুত চূড়ান্ত করে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) প্রয়োজনীয় সংশোধন দরকার হলে তা সেরে পদ্ধতির পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরুও করতে চায় কমিশন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ রোববার বলেন, “প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য প্রক্সি পদ্ধতিটি সহজ ছিল; অর্থ সাশ্রয়ী ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো এর পক্ষে তেমন নেই।
“আবার অনলাইন পদ্ধতিটিও অনেক দেশ দীর্ঘদিন ধরে চালু করতে পারেনি। যাদের জন্য এ পদ্ধতি তাদেরই তো আগ্রহ কম, আমরা প্রক্সি পদ্ধতিটি নিয়ে আলোচনা যেভাবে রয়েছে, আপাতত সেভাবেই থাকছে। আর পোস্টাল ব্যালট পদ্ধতিটি এগিয়ে নিতে চাই আমরা।”

পোস্টাল ব্যালট পদ্ধতি নিয়ে যা আলোচনা
ইসির আগ্রহে থাকা প্রক্সি পদ্ধতি বাদ গেলেও অনলাইনে নিবন্ধনের মাধ্যমে কীভাবে পোস্টাল ব্যালট পদ্ধতিকে আরও কার্যকর করা যায় তা পর্যালোচনায় আছে।
বিদ্যমান আইনে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোটের সুযোগ থাকলেও তা কখনো জনপ্রিয় ও কার্যকর হয়নি। সবশেষ দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, সবশেষ ২৪ জুন নির্বাচন ভবনে নির্বাচন ব্যবস্থাপনা তথ্য প্রযুক্তি প্রয়োগ কমিটির সভা হয়েছে। এতে রাজনৈতিক দলগুলোর সুপারিশ অনুযায়ী, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা সূচক পোস্টাল ভোটিং ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়।
প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিকদের মধ্যে ভোট দিতে আগ্রহীদের পোস্টাল ব্যালট পাঠানো ও ভোট শেষে তা ফেরত আনার বিষয়ে ডাক বিভাগ এবং বহুজাতিক কুরিয়ার কোম্পানি ফেডএক্স ও ডিএইচএল প্রতিনিধিরা সভায় মতামত তুলে ধরে।
ইতোমধ্যে ডাক বিভাগ এবং বহুজাতিক কুরিয়ার কোম্পানি ফেডএক্স ও ডিএইচএল প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছে নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় তথ্যপ্রযুক্তির প্রয়োগ কমিটি।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, বেসরকারি কুরিয়ারে ব্যালট আনা-নেওয়ায় ভোটার প্রতি গড়ে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা এবং ডাক বিভাগের ইএমএস সার্ভিসে গড়ে পাঁচশ টাকা ব্যয় হতে পারে।
বেসরকারি প্রতিনিধিরা জানান, ১২ দিনের মধ্যে পোস্টাল ব্যালট প্রবাসে ভোটারের কাছে পাঠাতে ও ফেরত আনতে পারবেন। এক্ষেত্রে তাদের স্থানীয় প্রতিনিধি ভোটারের কাছে পোস্টাল ব্যালট পৌঁছাবে এবং ভোটার ভোট দেওয়ার পর তা ফেরত আনবে।
ইসির ওয়েবাইটে প্রকাশিত এক বার্তায় বলা হয়, প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য প্রচলিত পোস্টাল ব্যালট ভোটিং পদ্ধতি অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটদানের বিষয়ে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন দুটি পদ্ধতির প্রস্তাব করেছে। এর মধ্যে রয়েছে- তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা সূচক পোস্টাল ভোটিং ব্যবস্থা এবং অনলাইন ভোটিং ব্যবস্থা। নির্বাচন কমিশন পর্যালোচনা করে এই দুই পদ্ধতির পাশাপাশি প্রক্সি ভোটিং পদ্ধতিকেও আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করেছে।
তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা সূচক পোস্টাল ভোটিং ব্যবস্থাকে সহজ ও ব্যয় সাশ্রয়ী করতে কমিশন কাজ করে যাচ্ছে বলে জানান নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ।
তিনি বলেন, “এখন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে পোস্টাল ব্যালট পদ্ধতির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রবাসীদের জন্য পোস্টাল ব্যালট পদ্ধতিকে আরও সহজতর করার জন্য কাজ চলছে।”
ইসি মাছউদ জানান, অনলাইন ও প্রক্সি পদ্ধতি চালু সম্ভব না হলেও আগামীতে তিনটি পদ্ধতি ব্যবহারের সুযোগ আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হবে কি না তা নিয়ে পর্যালোচনা করা হবে কমিশনে।
আরও পড়ুন
প্রবাসী ভোট: সীমিত পরিসরে হলেও শুরু করতে চায় ইসি
প্রবাসীদের ভোট: অনলাইন পদ্ধতিতে সায় বেশিরভাগ দলের
রাষ্ট্রপতি ভোট দিলেন পোস্টাল ব্যালটে
পোস্টাল ব্যালটে কারা কীভাবে ভোট দেবেন
প্রবাসীদের ভোট: ৩ প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন জমা, অংশীজনের মতামত নেবে ইসি