Published : 10 Apr 2026, 07:54 PM
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস, নিদর্শন ও দলিল সংরক্ষণ, গবেষণা এবং প্রদর্শনের জন্য জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল সংশোধিত আকারে পাস করেছে জাতীয় সংসদ।
সংসদে উত্থাপনের পর বিলটি অবিলম্বে বিবেচনার জন্য নেওয়া হয়। যদিও সংসদের বিশেষ কমিটি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা এই অধ্যাদেশসহ ৯৮টি অধ্যাদেশ হুবহু পাসের সুপারিশ করেছিল, পরে অধিবেশনে ৮ ধারায় তিনটি সংশোধনী এনে বিলটি সংশোধিত আকারে পাস হয়।
শুক্রবার সন্ধ্যায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশনে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায়চৌধুরী বিলটি উত্থাপন করেন।
বিল উত্থাপনের সময় তিনি বলেন, “২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসের গণঅভ্যুত্থান ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাস, নিদর্শন ও দলিলাদি সংরক্ষণ, গবেষণা ও প্রদর্শনের জন্য জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার উদ্দেশ্যেই এই বিল আনা হয়েছে।”
বিলের দফা বিবেচনার আগে মাদারীপুর-৩ আসনের সরকারদলীয় সংসদ সদস্য আনিছুর রহমান ৮ ধারার ওপর তিনটি সংশোধনী প্রস্তাব তোলেন। তার প্রধান প্রস্তাব ছিল, জাদুঘরের পর্ষদের সভাপতি হিসেবে বাইরে থেকে মনোনীত কোনো বিশেষজ্ঞের বদলে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী থাকবেন।
আরেকটি সংশোধনীতে ৮ ধারার ২ উপধারার প্রথম পংক্তিতে থাকা সংশ্লিষ্ট (ক) দফা বাদ দেওয়ার প্রস্তাব আসে।
তৃতীয় সংশোধন প্রস্তাবে বলা হয়, পর্ষদের কোনো সদস্য বা সভাপতি যে কোনো সময় সরকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রের মাধ্যমে পদত্যাগ করতে পারবেন, আর সরকার জনস্বার্থে যে কোনো সময় যেকোনো সদস্যের মনোনয়ন বাতিল করতে পারবে।
নিজের প্রস্তাবের পক্ষে আনিছুর রহমান বলেন, “এই জুলাই আন্দোলন এই জাতির মুক্তির আন্দোলন।”
নিজের গুলিবিদ্ধ হওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে এই সংসদ সদস্য বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি আমাদের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।”
সংশোধনী নিয়ে আপত্তি তোলেন বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিনকাসেম।
তিনি বলেন, সংশোধনীগুলো তাদের হাতে আগে দেওয়া হয়নি, তাই যাচাই-বাছাই ছাড়া এ বিষয়ে মত দেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
তার প্রস্তাব ছিল, বিলটি যেভাবে উত্থাপিত হয়েছে সেভাবেই পাস করা হোক; পরে জুলাই যোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে সংশোধিত আকারে আনা যেতে পারে।
এর জবাবে স্পিকার সংসদকে স্মরণ করিয়ে দেন, লিখিত সংশোধনী ছাড়া এই পর্যায়ে নতুন আপত্তি বিবেচনার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, আনিসুর রহমান লিখিত সংশোধনী দিয়েছেন, অন্য সদস্যরাও চাইলে তা করতে পারতেন।
পরে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি সংশোধন প্রস্তাবগুলোর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন, মন্ত্রণালয় যখন জাদুঘরের কাজ দেখভাল করবে, তখন সভাপতির দায়িত্বও দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর কাছেই থাকা উচিত।
“মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নেবে, কাজও মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে হবে, সে অবস্থায় বাইরে থেকে কাউকে সভাপতি করার যুক্তি নেই।”
কণ্ঠভোটে সংশোধনীগুলো গৃহীত হওয়ার পর বিলের বাকি ধারাগুলোও পাস হয়। শেষে সংসদে সংশোধিত আকারে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল, ২০২৬ পাস হওয়ার ঘোষণা দেন স্পিকার।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে চলে যান।
সেই খবর পেয়ে তখনকার প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবনের দখল নেয় জনতা। আনন্দ উৎসবের আমেজে সরকারপ্রধানের বাসভবনে ভাঙচুর, লুটপাট চলে।
পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গণভবনকে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ হিসেবে রূপান্তরের উদ্যোগ শুরু হয়। উপদেষ্টা পরিষদ ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর এ প্রস্তাবে অনুমোদন দেয়। পরে ২০২৫ সালের ১৫ জুলাই পূর্তকাজেরও অনুমোদন হয়।
এই জাদুঘরে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ৩৬ দিনের চূড়ান্ত পর্বের পাশাপাশি তার আগের দীর্ঘ ‘দুঃশাসনের’ নমুনাও তুলে ধরা হয়েছে।