Published : 01 Aug 2024, 09:33 PM
‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ চালানোর অভিযোগে নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ হওয়া জামায়াতে ইসলামীকে ‘অপরাধকারী সংগঠন’ হিসাবে বর্ণনা করে রায় দিয়েছিল আদালতও।
একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের পথ ধরে পরবর্তী সময়েও সংগঠনটির ‘দেশবিরোধী একই চেতনা’ বহন করার কথাও উঠে এসেছিল যুদ্ধাপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিভিন্ন রায়ের পর্যবেক্ষণে।
জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমের মামলার রায়ে ট্রাইব্যুনাল একাত্তরের ভূমিকার জন্য জামায়াতে ইসলামীকে ‘ক্রিমিনাল দল’ আখ্যায়িত করে স্পষ্ট করে বলেছিল, দেশের কোনো সংস্থার শীর্ষ পদে স্বাধীনতাবিরোধীদের থাকা উচিত নয়।
২০১৩ সালের ১৫ জুলাই বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবীর নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল ওই রায় দেয়। যুদ্ধকালীন বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের পরিকল্পনা, উসকানি ও সহযোগিতার দায়ে গোলাম আযমকে টানা ৯০ বছর অথবা আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয় আদালত।
একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী হয়ে বাঙালি হত্যাকাণ্ডে রাজাকার, আল বদর, আল শামসের মতো যে সব বাহিনী জড়িত ছিল, সে সব বাহিনীর ওপর গোলাম আযমের নিয়ন্ত্রণ প্রমাণিত হয় ওই মামলার বিচারে।
রায়ে ট্রাইব্যুনাল বলে, সাধারণ জ্ঞান ও দালিলিক প্রমাণাদি থেকে এটা স্পষ্ট যে, জামায়াত ও এর অধীনস্ত সংগঠনের প্রায় সবাই সক্রিয়ভাবে বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছেন।
“গোলাম আযমের নেতৃত্বে জামায়াতে ইসলামী একটি ক্রিমিনাল দল হিসাবে উদ্দেশ্যমূলকভাবে কাজ করেছে, বিশেষ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধকালে।”

১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের স্বাধীনতার সময় গোলাম আযমের ‘গুরু’ আবুল আলা মওদুদী তার বিরোধিতা করেছিলেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সময় সেই ধরনের ভূমিকা ছিল গোলাম আযমের।
জামায়াত দুই সময়েই সাধারণ মানুষের মন বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল মন্তব্য করে ট্রাইব্যুনাল দলটির দূরদৃষ্টির অভাবের পেছনে উগ্র মৌলবাদী চেতনাকে চিহ্নিত করে।
রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, “স্বাধীনতার ৪২ বছর পরও স্বাধীনতাবিরোধী কিছু মানুষ জামায়াতের হাল ধরে আছেন। যার ফলে জামায়াতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নতুন প্রজন্ম স্বাধীনতাবিরোধী চেতনা ও সাম্প্রদায়িক অনুভূতির মানসিকতায় বেড়ে উঠছে, যা দেশের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের বিষয়।”
গোলাম আযমের আগে জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, আব্দুল কাদের মোল্লা ও এ এইচ এম কামরুজ্জামানের মামলার রায়েও একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি উঠে আসে।
‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য’ জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করার মধ্য দিয়ে ট্রাইব্যুনালের অভিমতই বাস্তবায়িত হল বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত।
সরকার নির্বাহী আদেশে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সব অঙ্গ সংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ‘সন্ত্রাসী সত্তা’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করার পর বৃহস্পতিবার তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ট্রাইব্যুনালের যে রায়গুলো হয়েছিল, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির এবং নানান দণ্ডাদেশ, সেগুলো কার্যকর হয়েছিল ঠিক। কিন্তু ট্রাইব্যুনালের অভিমতগুলো বাস্তবায়িত হয়নি দীর্ঘকাল।
“অন্তত আজকের দিনে এসে যে ট্রাইব্যুনালের অভিমতগুলো বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং বাস্তবায়িত হল, আমি মনে করি যে, এর ফলে দেশকে প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক ধারায় এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এগিয়ে নেওয়ার পথ প্রশস্ত হল।”
গোলাম আযমের রায়ের পর্যবেক্ষণে ট্রাইব্যুনাল বলেছিল, একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধীরা শহীদদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে কিংবা অনুশোচনা প্রকাশ করে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছেন বলে কোনো প্রমাণ জাতির সামনে নেই।
“একটি গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়তে সরকারের নির্বাহী বিভাগ, সরকারি বেসরকারি সংগঠনসহ সামাজিক ও রাজনৈতিক দলের কর্ণধার হিসাবে এ ধরনের স্বাধীনতাবিরোধীরা থাকা উচিত নয়।”
এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ পদে স্বাধীনতাবিরোধীরা যাতে না আসতে পারে, সেজন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয় রায়ের পর্যবেক্ষণে।
পুরনো খবর
জামায়াত এখন 'সন্ত্রাসী সত্তা': এর মানে কী, আইন কী বলে
জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ, 'সন্ত্রাসী সত্তা' ঘোষণা
নিষিদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় যা বলল জামায়াত

ট্রাইব্যুনালের অন্য অনেক রায়েও জামায়াতের কর্মকাণ্ডের বিষয় উঠে আসার কথা তুলে ধরে রানা দাশগুপ্ত বলেন, “আমরা জানি যে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হয়েছিল, সেই বিচারে অধ্যাপক গোলাম আযমের যে মামলাটি হয়েছিল, সেই মামলার রায়ে ট্রাইব্যুনাল অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন যে, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্রশিবির- এইগুলো হচ্ছে ক্রিমিনাল অর্গানাইজেশন, অপরাধকারী সংগঠন। এবং এও বলা হয়েছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসীবাহিনী যে ভূমিকা পালন করেছিল, এরাও সেই একই ভূমিকা পালন করেছে।
“এবং অভিমতে আরও বলা হয়েছিল, বাংলাদেশকে যদি প্রকৃত অর্থে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যদি এগিয়ে নিতে হয়, রাজনীতি, প্রশাসন, রাষ্ট্র এবং সমাজ সব জায়গা থেকে জামায়াতে ইসলামী এবং তার চেতনাবাহী সমস্ত মানুষগুলোকে চিহ্নিত করে তাদেরকে বের করে দেওয়া প্রয়োজন। তাদেরকে সমাজ বিচ্ছিন্ন করা প্রয়োজন।”
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সংগঠন হিসাবে জামায়াতের বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হলেও তা শেষ পর্যন্ত না এগোনোয় হতাশা প্রকাশ করেন এ আইনজীবী।
তিনি বলেন, “আমাদের যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালস আইন, অর্গানাইজেশনের বিচারও কিন্তু করতে পারে এই আইনের আওতায়।
“এবং আমাদের যে তদন্তকারী সংস্থা, এই তদন্তকারী সংস্থা তদন্ত করে তার প্রধান প্রসিকিউটরের কাছে প্রায় ১০ হাজার পৃষ্ঠার একটা রিপোর্ট পাঠিয়েছিলেন। এই রিপোর্টকে সামনে রেখে যখন প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে আমরা অপরাধী সংগঠন হিসাবে মামলা প্রায় তৈরি করে ফেলেছি, আদালতে আনার মত প্রক্রিয়া চলছে, তখন হঠাৎ করে বলা হল- ধীরে আগাও।”
তিনি বলেন, “তখন আমরা বুঝতে পারলাম, এখানে আপাতত সংগঠনের বিচারটি হচ্ছে না। তখন আইনমন্ত্রীও বললেন যে, আইনে একটি সংশোধনী আনা প্রয়োজন। সে আজ থেকে কয়েক বছর আগের কথা। কিন্তু বাস্তব কথা হল, আজ পর্যন্ত ওই আইনেরও কোনো সংশোধনী আনা হয় নাই।”
একাত্তরের পাশাপাশি জামায়াতের পরবর্তী কর্মকাণ্ডের কথাও যে ট্রাইব্যুনালের বিভিন্ন রায়ে এসেছে, সে কথাও বলেন রানা দাশগুপ্ত।
“একটা হলো যুদ্ধাপরাধী সংগঠনের বিচার কাজ একাত্তরের অপরাধের জন্য, আরেকটি হল, ট্রাইব্যুনাল বলেছিল, এরা সেই সময়ে যে চেতনা নিয়ে কাজ করেছে, স্বাধীনতার পরবর্তী পর্যায়েও তাদের কাজগুলো দেখে মনে হয়েছে, ওই চেতনা থেকে তারা ফিরে আসে নাই এবং তারা বাংলাদেশের অস্তিত্বকেও মেনে নেয় নাই। এগুলো কিন্তু ট্রাইব্যুনালের অভিমতে এসেছে।
“অতএব, এক্ষেত্রে বলা হয়েছিল যে, এই রাষ্ট্র, প্রশাসন, রাজনীতি এবং সমাজ থেকে তাদের চিহ্নিত করে বিচ্ছিন্ন করার একটা দায়িত্ব রাষ্ট্রকে গ্রহণ করতে হবে। অন্তত যাই হোক, আজকে যে জামায়াত শিবিরকে নিষিদ্ধ করা হল, এর মধ্য দিয়ে ট্রাইব্যুনালের গোলাম আজম মামলার অভিমতের আলোকে এটা করা হয়েছে, সেটাও আমি মনে করতে পারি।”
দল হিসেবে জামায়াতের বিচার করতে পারলে ‘ভিন্ন আঙ্গিকে’ ব্যবস্থা নেওয়ারও সুযোগ হবে বলে মনে করেন ট্রাইব্যুনালের এই প্রসিকিউটর।
তিনি বলেন, “আমরা যদি বিচারটা করতাম, তাহলে বিচারের মধ্যে হয়ত ট্রাইব্যুনাল এটাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা, সম্পত্তিগুলো বাজেয়াপ্ত করা, ওই বাজেয়াপ্তকৃত সম্পদ থেকে যে অর্থটা আসবে, এই অর্থগুলো একাত্তরের ভুক্তভোগীদের মধ্যে বিলিবণ্টন করার রায় আসতে পারত। কিন্তু যখন এটা হয় নাই, তখন এ ব্যাপারে আর কিছু বলার নাই।
“এখন যে নিষিদ্ধটা হয়েছে, এখন দেখতে হবে যে নিষিদ্ধ করার পরে সেখানে কী পদক্ষেপগুলো এখন রাষ্ট্র-সরকার গ্রহণ করছে।”
পুরনো খবর