Published : 08 Nov 2025, 01:53 AM
এবারও বছরের শেষ দিকে এসে নতুন বছরের পাঠ্যবই ছাপার কাজ শুরু হয়েছে।
প্রাথমিকের বই সময়মতো শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়ার আশার কথা শোনালেও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা আগামী বছরের শুরুতে নতুন পাঠ্যবই পাবে কিনা, তা নিয়ে ‘শঙ্কা’ তৈরি হয়েছে।
অভ্যুত্থানের পর পুরনো শিক্ষাক্রমে ফেরাসহ নানা প্রক্রিয়াগত কারণে গতবছরেও পাঠ্যবই ছাপার কাজ শুরু হয়েছিল ডিসেম্বরে। শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দিতে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত সময় লেগে যায়।
সেই অভিজ্ঞতা থেকে এবার সেপ্টেম্বরে মাধ্যমিকে বই ছাপার কাজ শুরুর করার পরিকল্পনা করেছিল পাঠ্যবই মুদ্রণ তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক মিলিয়ে এবার প্রায় ৩০ কোটি বই ছাপা হবে। এর মধ্যে মাধ্যমিক ও এবতেদায়ী শিক্ষার্থীদের জন্য ২১ কোটি ৪৩ লাখ বই ছাপার কাজ শুরু হয়েছে নভেম্বরের শুরুতে।
দরপত্র প্রক্রিয়া বাতিলের কারণে দেরি হওয়া ছাপার কাজসহ সব প্রক্রিয়া শেষ করে নতুন বছরের শুরুতে মাধ্যমিকের সব বই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া সম্ভব হবে কী-না তা নিয়ে শঙ্কার কথা বলছেন এনসিটিবির কর্মকর্তারাই।
যদিও প্রাথমিক পর্যায়ের বই ছাপার কাজ আগেই শুরু হয়েছে এবং অনেকটা এগিয়েছে। এনসিটিবির আশা, নভেম্বরেই উপজেলা পর্যায়ে প্রাথমিকের ৮ কোটি ৫৯ লাখ বইয়ের শতভাগ পৌঁছে যাবে।
এদিকে নতুন বছরের বেশ কিছু শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে যুক্ত হচ্ছে ‘জুলাই অভ্যুত্থানের’ ইতিহাস, আর বাদ পড়ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক সাতই মার্চের ভাষণ। একইসঙ্গে পাঠ্যবইয়ের শব্দচয়ন ও বাক্য গঠনে গুণগত পরিবর্তন আনার বার্তা দিয়েছে এনসিটিবি।
গতবারের মতই এবার দেশেই ছাপা হচ্ছে সব বই। বছরের শেষাংশে এসে এ বিপুল পরিমাণ বই ছাপার কর্মযঞ্জ যখন চলছে, তখন অবসরে গেছেন এনসিটিবি চেয়ারম্যানের অতিরিক্ত দায়িত্ব পাওয়া সদস্য অধ্যাপক রবিউল কবির চৌধুরী।
৮ নভেম্বর অবসরোত্তর ছুটি শুরু তিন দিন আগে বুধবার যোগাযোগ করা হলে বই ছাপা নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে চাননি অধ্যাপক রবিউল কবির চৌধুরী। তিনি আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের জন্য জনসংযোগ কর্মকর্তার দারস্থ হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে।
এনসিটিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা এস এম আসাদুজ্জামানের আশা, বছরের শুরুতেই সব শিক্ষার্থী সব নতুন বই হাতে পাবে।

মাধ্যমিকের বই ছাপানো পেছাল যে কারণে
গত বছরের শেষ দিকে এসে শিক্ষাক্রম বাতিল করে পুরনো শিক্ষাক্রমে ফেরা এবং বই পরিমার্জনে ‘সময় লাগায়’ চলতি বছর মাধ্যমিকের সব বই হাতে পেতে শিক্ষার্থীদের মার্চ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল।
সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত কমিটি প্রথম দফায় মাধ্যমিক পর্যায়ের ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির বইয়ের দরপত্র প্রক্রিয়া বাতিল করে দেওয়ায় মাধ্যমিক পর্যায়ের বই ছাপার কাজ শুরুতে ‘দুই মাস’ দেরি হয়েছে বলে বলছেন এনসিটিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা এস এম আসাদুজ্জামান।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মাধ্যমিকের বই ছাপার প্রক্রিয়া আগেভাগে শুরু হলেও সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত কমিটি বেশ কিছু দরপত্র বাতিল করে দিয়ে বিধিতে একটু সংশোধন আনে। ওই দরপত্র প্রক্রিয়া নতুন করে আবার শুরু হয়েছে।
“এনসিটিবির পরিকল্পনা ছিল সেপ্টেম্বরে মাধ্যমিকের বই ছাপানোর কাজ শুরু করা। কিন্তু ওই প্রক্রিয়া বাতিল হয়ে যাওয়ায় নভেম্বরের শুরুতে এসে বই ছাপার কাজ শুরু হচ্ছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি ছাপাখানা ছাপার কাজ শুরু করে দিয়েছে।”
নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত মাত্র চারটি প্রেস নবম শ্রেণির বই ছাপার কাজ শুরু করার কথা বলেছেন এনসিটিবির বিতরণ নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মতিউর রহমান খান পাঠান।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “নবম শ্রেণির বই ছাপাতে এখন প্রকাশনা সংস্থাগুলোর সঙ্গে চুক্তির কাজ চলছে। চারটি ছাপাখানা বই ছাপানোর কাজ শুরু করে দিয়েছে।
“তবে ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বই ছাপার অনুমতি আমরা পেয়েছি ৩ নভেম্বর। ই-গভার্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট-ইজিপিতে কিছু ত্রুটি থাকায় এ তিন শ্রেণির বইয়ের চুক্তির কাজ শুরু করতে পারিনি। আশা করছি, দু-একদিনেই সে কাজ শুরু হবে।”
মতিউর রহমান বলেন, “নবম শ্রেণির বই ছাপার জন্য প্রকাশকরা ৬০ দিন সময় পাবেন। আর অন্যান্য কাজের জন্য পাবেন ১০ দিন। ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির বই ছাপার জন্য তাদের ৪৫ দিন সময় দেওয়া হয়েছে, এটি আগে ৬০ দিন থাকলেও আমরা কিছুটা কমিয়ে দিয়েছি। এ তিন শ্রেণির বইয়ের অন্যান্য কাজ সারতে তারা আরও সাত দিন সময় পাবেন।”

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনসিটিবির এক কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বছরের শুরুতে এনসিটিবি বই সবার হাতে তুলে দেবে বলে আশা প্রকাশ করলেও সব বই মাধ্যমিকের সব শিক্ষার্থীর হাতে বছরের শুরুতেই দেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে হচ্ছে না।”
এদিকে এবতেদায়ী পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের বই ছাপার কাজ ৪০ শতাংশ হয়ে গেছে বলেছেন এনসিটিবির বিতরণ নিয়ন্ত্রক মতিউর রহমান।
১৯ অগাস্ট সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির ৩২তম সভায় নতুন শিক্ষাবর্ষের মাধ্যমিকের ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির বই ছাপানোর কার্যাদেশ অনুমোদন করেনি।
এ দরপত্রে ষষ্ঠ শ্রেণির ৯৭টি লটের ৪ কোটি ৩২ লাখ বইয়ের ক্রয়মূল্য ছিল ১৮০ কোটি ৪ লাখ টাকা। সপ্তম শ্রেণির ৯৪টি লটের ৩ কোটি ৯০ লাখ বইয়ের ক্রয়মূল্য ছিল ২০০ কোটি ২০ লাখ টাকা। আর অষ্টম শ্রেণির ৮৯টি লটে ৩ কোটি ৬৬ লাখ বইয়ের ক্রয়মূল্য ছিল ২২৩ কোটি ১২ লাখ টাকা। এ তিন শ্রেণির ২৮০টি লটের ৬০০ কোটির টাকার ক্রয় সংক্রান্ত সুপারিশ বাতিল করা হয়েছে।
দরপত্র বাতিলের কারণ জানতে চাইলে এনসিটিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা এস এম আসাদুজ্জামান বলেন, “সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত কমিটি কোনো কারণ না দেখিয়েই টেন্ডার প্রক্রিয়া বাতিল করতে পারে, তারা সেটাই করেছে। আর তার সঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে কাজ করার সুযোগ দিয়ে বিধি সংশোধন করেছে।”
প্রাথমিকের বই উপজেলায় যাবে নভেম্বরেই
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে বছরের প্রথম দিন স্কুলে স্কুলে উৎসব করে শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেওয়ার রেওয়াজের শুরুটা হয়েছিল ২০১০ সালে, যা দেখা গেছে ফেলে আসা বছরেও।
তবে ক্ষমতার পালাবদলের পর সেই চক্র ভেঙেছে। চলতি বছরের শুরুর দিনে স্কুলগুলোতে সেই আয়োজন ছিল না। নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের হাতে সব নয়, কোনো কোনো বিষয়ের পাঠ্যপুস্তক তুলে দিতে পেরেছেন শিক্ষকরা।
এবার বছরের শুরুতে প্রাথমিকের সব শিক্ষার্থীর হাতে বই তুলে দেওয়ার প্রস্তুতি আগেভাগেই শুরু হয়েছে।
নভেম্বরের মধ্যে সব উপজেলা পর্যায়ে পাঠানো সম্ভব হবে বলেছেন, এনসিটিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান ও উৎপাদন নিয়ন্ত্রক আবু নাসের টুকু।
আবু নাসের বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিকের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির মোট বই ছাপা হবে ৮ কোটি ৫৯ লাখ ২৫ হাজার ৩৭৯ কপি। ৫ নভেম্বর পর্যন্ত বাঁধাই হয়েছে ৬ কোটি ৮১ লাখ ৩৫ হাজার ৬৬৩, যা মোট বইয়ের ৭৯ দশমিক ৩০ শতাংশ। বিতরণের ছাড়পত্র পেয়েছে মোট ৫ কোটি ৭২ লাখ ৯২ হাজার ৮২৩ বই, যা মোট সংখ্যার ৬৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ। আর সরবরাহ হয়েছে ৪ কোটি ৯৩ লাখ ৭৬ হাজার ১০৭ বই, যা মোট বইয়ের ৫৭ দশমিক ৪৬ শতাংশ।
“আমরা আশা করছি, চলতি নভেম্বর মাসের শেষ দিকেই আমরা প্রাথমিক ও প্রাক-প্রাথমিকের সব বই উপজেলা পর্যায়ে পাঠাতে পারবো।”

এবারও শতভাগ বই ছাপার কাজ দেশি প্রতিষ্ঠানে
সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত কমিটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বই ছাপার সুযোগ দিয়ে বিধি সংশোধন করলেও আগামী বছরের সব বই ছাপানোর কাজ দেশি প্রতিষ্ঠানগুলোই করছে।
এনসিটিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান এ তথ্য দিয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কোন বিদেশি সংস্থা অংশ নেয়নি, তাই এবারও শতভাগ বই ছাপানোর কাজ করছে দেশি প্রতিষ্ঠানগুলো।”
গতবছরও বই ছাপানোর কাজ দেশি প্রতিষ্ঠানগুলো পেয়েছিল বলে এনসিটিবির তরফে বলা হয়েছিল।
পাঠ্যবইয়ে আসছে ‘গুণগত পরিবর্তন’
আগামী বছরের পাঠ্যবইয়ে ‘গুণগত পরিবর্তন’ আসার কথা বলেছেন এনসিটিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, “এনসিটিবি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষক, শিক্ষাবিদসহ অংশীজনদের সঙ্গে সভা করে পাঠ্যবইয়ে বেশ কিছু গুণগত পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে। শব্দচয়ন ও বাক্য গঠন শ্রুতি মধুর করার সুপারিশ করেছিলেন অংশীজনরা, সেভাবেই বইগুলো পরিমার্জন করা হয়েছে।”

বাদ সাতই মার্চের ভাষণ, যুক্ত হচ্ছে জুলাই অভ্যুত্থান
আগামী বছরের তৃতীয় থেকে নবম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়’ বইয়ের ইতিহাস অংশে জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে একটি আলাদা অধ্যায় যুক্ত হচ্ছে।
এনসিটিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ওই বইগুলোর জুলাই অভ্যুত্থান অধ্যায়ে ইতিহাসের ধারাবাহিকতা রক্ষায় নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসও সংযুক্ত থাকছে। অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে জুলাই অভ্যুত্থানের ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”
এছাড়া অষ্টম শ্রেণির বাংলা বইতে থাকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাতই মার্চের ভাষণ বাদ দেওয়া হচ্ছে তুলে ধরে তিনি বলেন, “অংশীজনদের আপত্তি এবং পরে জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটি-এনসিসিসির সুপারিশের ভিত্তিতে সাতই মার্চের ভাষণের অংশটি বাদ দেওয়া হয়েছে।
“একইসঙ্গে একাদশ দ্বাদশ শ্রেণির ইংরেজি বইতে এনসিসিসির সুপারিশে ‘থ্রি স্পিচ’ অংশ থেকেও ওই ভাষণের অংশ বাদ দেওয়া হয়েছে।”